চব্বিশের আকাক্সক্ষা ধারণ করে কতদূর এগোলো এনসিপি

হারুন ইসলাম
Printed Edition

  • বিচার, সংস্কার ও জবাবদিহিতার দাবিতে সরব থাকবে এনসিপি
  • সংসদে প্রবেশের পর বদলেছে রাজনৈতিক বাস্তবতা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পতন ঘটে দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের। এই অভ্যুত্থানের একেবারে অগ্রভাগে ছিলেন দেশের তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীরা। সেই গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা ও চেতনাকে ধারণ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে দেশের প্রথম ছাত্র-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলামকে আহ্বায়ক এবং আখতার হোসেনকে সদস্যসচিব করে যাত্রা শুরু হয় দলটির। শুরুতে ‘শাপলা’ প্রতীকের জোরালো দাবি থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা নির্বাচন কমিশন থেকে বরাদ্দ পায় ‘শাপলা কলি’। দলটির মূল অঙ্গীকার ছিল দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা দ্বিদলীয় বৃত্ত ভেঙে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করা। ২৬-এর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনসহ মোট আটটি আসন নিয়ে সংসদে বর্তমানে বিরোধীদলীয় জোটে অবস্থান করছে দলটি।

তবে রাজপথের আন্দোলন থেকে সংসদীয় রাজনীতিতে আসার পর এনসিপি এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন- চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের উত্তরাধিকার বহনে এনসিপি কতটা সফল? দলটি কি চব্বিশের চেতনার প্রকৃত ধারক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে, নাকি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রচলিত ব্যবস্থারই অংশ হয়ে গেছে?

ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের চিত্র

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি প্রথমে ২৪ দফা এবং পরে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ৩৬ দফার এক দূরদর্শী ইশতেহার ঘোষণা করে। দলটির উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল:

ক. নতুন সংবিধান প্রণয়ন ও ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ (দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র) প্রতিষ্ঠা। খ. জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল সংস্কার।

গ. এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ১০০ বিলিয়ন টাকার উদ্যোক্তা তহবিল গঠন। ঘ. ঘণ্টাপ্রতি ১০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ।

ঙ. দুর্নীতিবিরোধী স্বচ্ছতার প্ল্যাটফর্ম চালু।

তবে মাঠপর্যায়ে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চিত্র তুলনামূলকভাবে সীমিত। নির্বাচনে এনসিপি সরকার গঠন করতে না পারায় তাদের অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি সরাসরি বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়নি। দলটি সংসদ ও রাজপথে সংবিধান সংস্কার, ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন এবং গণঅভ্যুত্থানের বিচারের দাবি অব্যাহত রাখলেও, এসব বিষয়ে এখনো দৃশ্যমান নীতিগত পরিবর্তন বা প্রশাসনিক অগ্রগতি দেখা যায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির ইশতেহার তরুণ ভোটার ও সংস্কারপন্থী জনগোষ্ঠীর কাছে নতুন রাজনৈতিক ভাষ্য উপস্থাপন করলেও এর অনেক প্রতিশ্রুতির অর্থায়ন, বাস্তবায়ন কাঠামো ও সময়সূচি নিয়ে স্পষ্ট রূপরেখা অনুপস্থিত ছিল। ফলে দলটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন এই প্রতিশ্রুতিগুলোকে নীতিগত আলোচনার গণ্ডি থেকে বাস্তব রাজনৈতিক অর্জনে রূপান্তর করা।

রাজনৈতিক কার্যক্রম ও সাংগঠনিক বিস্তার

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এনসিপি দেশব্যাপী সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করার দিকে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়। ১৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি গঠন করা হয় ‘জাতীয় ছাত্র শক্তি’, ‘জাতীয় যুব শক্তি’, ‘জাতীয় নারী শক্তি’ এবং ‘জাতীয় শ্রমিক শক্তি’র মতো চারাট সহযোগী সংগঠন।

দলটির সবচেয়ে আলোচিত কর্মসূচি ছিল ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’। ২০২৫ সালের ৩০ জুন দেশের ৬৪ জেলায় মাসব্যাপী এই পদযাত্রা শুরু করে তারা। এর উদ্দেশ্য ছিল গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে তৃণমূলে ছড়িয়ে দেয়া এবং সাধারণ মানুষের কাছে বিকল্প রাজনীতির বয়ান তুলে ধরা। পদযাত্রাগুলোতে হাজারো তরুণের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দেখা গেলেও এই সাঙ্গঠনিক যাত্রাপথ পুরোপুরি মসৃণ ছিল না। জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে গোপালগঞ্জে তাদের একটি সমাবেশকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের সঙ্ঘাতের ঘটনা ঘটে, যা জাতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২৬ জুলাই তারা সংস্কারের রূপরেখা বাস্তবায়নের জন্য ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যখন সংস্কারের একটি রাষ্ট্রীয় ঐকমত্যের দলিলে স্বাক্ষর করে, তখন এনসিপি সেখান থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। তাদের যুক্তি ছিল, ওই দলিলের কোনো সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি নেই।

বর্তমানে দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, দেশের সবচেয়ে জরুরি তিনটি জনস্বার্থের ইস্যু হলো, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, তীব্র জ্বালানি সঙ্কট ও নাগরিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক হয়রানি। এর পাশাপাশি শ্রমজীবী ও পেশাজীবী মানুষের অধিকার রক্ষা এবং স্থানীয় প্রশাসনের অনিয়মকে সামনে রেখে মাঠমুখী কর্মসূচির রূপরেখা তৈরি করছে তারা। বর্তমান বাস্তবতায় আগামী ছয় মাসের মধ্যে এনসিপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লক্ষ্য হলো- নিজেদের একটি একক, স্বাধীন ও শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মাঠে প্রতিষ্ঠা করা এবং জোটের অভ্যন্তরীণ চাপ কাটিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট করা।

নতুন মুখের আগমন ও অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন

সম্প্রতি নতুন বেশ কিছু আলোচিত মুখ এনসিপিতে যোগ দেয়ায় দলটির রাজনীতিতে নতুন এক হাওয়া লেগেছে। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন :

ইসহাক সরকার : ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুবদলের সাবেক নেতা।

ড. মোহাম্মদ নাদিমুর রহমান (মীর নাদিম) : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছোট ছেলে।

ফেরসামিন হক ইকবাল (ফ্লোরা) : অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি।

মহিউদ্দিন রনি : রেলের অনিয়ম নিয়ে আন্দোলন করে আলোচনায় আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী।

নুরুজ্জামান কাফি : পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বিভিন্ন দল ও প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্তত ৪৫ জন নেতা ও সংগঠক আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপিতে যোগ দেন। এর পাশাপাশি, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কয়েকজন সাবেক নেতার উদ্যোগে গঠিত প্ল্যাটফর্ম ‘আপ বাংলাদেশ’ নিজেদের বিলুপ্ত করে সম্প্রতি এনসিপিতে একীভূত হয়েছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক কৌতূহল ও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।

তবে এই দ্রুত সাংগঠনিক সম্প্রসারণের পাশাপাশি দলটি অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য ও আদর্শিক সঙ্কটের মুখেও পড়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনী জোটের প্রশ্নে একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করেছেন। যদিও এনসিপি নেতৃত্বের ভাষ্য, যারা পদত্যাগ করেছেন তাদের পুনরায় ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা একটি মধ্যপন্থী ধারার রাজনীতি চালু করতে চান, যা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলবে।

শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া ও শহীদ পরিবারের মূল্যায়ন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষার্থী, যারা জুলাই বিপ্লবে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, তাদের মধ্যে এনসিপি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। আন্দোলনে অংশ নেয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিদ বলেন, ‘আমরা যখন রাস্তায় ছিলাম, তখন সবার লক্ষ্য ছিল এক। কিন্তু দল গঠনের পর অনেকেই ছিটকে পড়েছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত প্ল্যাটফর্মটি এখন নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে চলে গেছে।’

শহীদ পরিবার ও আহতদের মধ্যেও দলটির ভূমিকা নিয়ে নানা মত রয়েছে। তাদের মূল প্রত্যাশা ছিল, দল গঠনের চেয়ে জুলাই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং আহতদের পুনর্বাসনের দিকে বেশি জোর দেয়া হবে।

এনসিপি দাবি করছে তারা বিচারের দাবিতে সংসদে সোচ্চার, তবে মাঠপর্যায়ের অনেকেই মনে করেন, সংসদীয় রাজনীতির হিসাব-নিকাশ ও জোটগত মেরুকরণে মূল দাবিগুলো কিছুটা হলেও আড়ালে চলে যাচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের সময়ের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সাথে এনসিপির বর্তমান সম্পর্কও আগের মতো উষ্ণ নেই।

জোটবদ্ধ রাজনীতি ও সমালোচকদের দৃষ্টি

নির্বাচনের আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে এনসিপি একটি বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়। তারা নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান সংহত করতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটে যোগ দেয়। এই সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।

যারা এনসিপিকে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও ‘তৃতীয় বিকল্প শক্তি’ হিসেবে দেখেছিলেন, তারা এই জোটবদ্ধতাকে প্রথাগত রাজনীতির সাথে অ্যাপস হিসেবে আখ্যা দেন। দলের এই সিদ্ধান্তে প্রতিবাদ জানিয়ে প্রগতিশীল নেত্রী তাজিনুভা জাবিন দল থেকে পদত্যাগ করেন এবং গণমাধ্যমে একে চব্বিশের চেতনার সাথে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে মন্তব্য করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপি প্রচলিত রাজনীতির বাইরে নতুন ধারা তৈরির দাবি করলেও নির্বাচনে টিকে থাকার জন্য ডানপন্থী দলগুলোর সাথে জোটবদ্ধ হওয়া প্রমাণ করে, তারা প্রচলিত রাজনীতির ছকেই হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে দলটির নতুন ‘ঢ়ড়ষরঃরপধষ ংবঃঃষবসবহঃ’ বা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের বয়ান বাস্তবতার চাপে অনেকটাই মøান হয়ে গেছে। তবে এনসিপি নেতৃত্বের দাবি, রাজপথের সেøাগানকে আইনে পরিণত করতে হলে সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকা জরুরি এবং তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠস্বর পৌঁছে দিতেই এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত।

শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য ও আগামী দিনের পরিকল্পনা

নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে এনসিপির লক্ষ্য প্রধানত দু’টি ধাপে বিভক্ত :

১. সাংগঠনিক ভিত্তি ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন : আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে অংশ নেয়ার জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সংগঠন গোছানো এবং তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনা।

২. নতুন প্ল্যাটফর্ম ও গণভোট : সুশীল সমাজ ও নাগরিক সংগঠনগুলোর সাথে কার্যকর জোট তৈরি এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের জন্য একটি গণভোট বা রেফারেন্ডামের দাবি তোলা।

দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে এনসিপি একটি ‘সংবিধান সভা’ (ঈড়হংঃরঃঁবহঃ অংংবসনষু) নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন করে ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

সংসদীয় সীমাবদ্ধতা নিয়ে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের জন্য জনমত গঠনের চেষ্টা করছি। কিন্তু সংসদে মাত্র আটটি আসন নিয়ে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে আমাদের অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়। তবুও আমরা জনগণের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছি।’

দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র সংস্কার প্রসঙ্গে বলেন, ‘অনেকে আমাদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখতে চান, কিন্তু এনসিপিতে বহুমত প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। আমরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইলেক্টোরাল কলেজ ও দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ এবং কমিশন প্রস্তাবিত ৬৪টি জেলা কাউন্সিলের ভোটের ব্যবস্থার সাথে নীতিগতভাবে একমত হয়েছি। এর পরিধি আরো বাড়াতে সিটি কর্পোরেশনসহ অন্যান্য স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদেরও এর আওতায় আনার মতামত দিয়েছি।’

সদস্যসচিব আখতার হোসেন শ্রমিক অধিকার ও বিচারের প্রশ্নে অনড় অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, ‘২৪-এর অভ্যুত্থানের পর কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের মতো ফ্যাসিবাদী শক্তির পুনর্বাসন মেনে নেয়া হবে না। দল হিসেবে তাদের সঙ্ঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। একই সাথে, অভ্যুত্থানের পরেও শ্রমিকের অধিকার ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি, যা দ্রুত সমাধান করা জরুরি।’

বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘একটি গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে তরুণদের রাজনীতিতে আসাটা ইতিবাচক ছিল। কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রথাগত বড় দলগুলোর সাথে নির্বাচনী আসন ভাগাভাগি বা জোটের রাজনীতিতে জড়ানোয় তাদের সেই স্বাতন্ত্র্য কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে। রাজপথের বিপ্লবী আকাক্সক্ষা আর সংসদের সমীকরণ; দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। তবে এই ধারাটি যদি কেবল ক্ষমতার রাজনীতির ছকে আটকে না গিয়ে নিজেদের স্বচ্ছতা ধরে রাখতে পারে, তবেই তারা দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প হিসেবে টিকবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী মন্তব্য করেন, ‘এনসিপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে তাদের আদর্শিক অবস্থান ধরে রাখা। তারা সংসদে যাওয়ার যে কৌশলগত যুক্তি দিচ্ছে, তা এক অর্থে বাস্তবসম্মত। কিন্তু মনে রাখতে হবে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মূল দাবি ছিল রাষ্ট্র ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। এনসিপি যদি জোটের রাজনীতি বা সংসদীয় হিসাব-নিকাশের চোরাবালিতে পড়ে সেই মূল অ্যাজেন্ডা থেকে দূরে সরে যায়, তবে সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখা কঠিন হবে।’