সংরক্ষণ সঙ্কটে নওগঁাঁয় নষ্ট হচ্ছে ৪০০ কোটি টাকার আম

কম দাম ও ‘ঢলতা’র চাপে বিপাকে চাষিরা

Printed Edition

শাহ আলম নূর নওগঁাঁ থেকে ফিরে

দেশের আমের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত নওগাঁর সাপাহার। বরেন্দ্র অঞ্চলের এই সীমান্তবর্তী উপজেলায় এখন পুরোদমে চলছে আমের মৌসুম। সাপাহার জিরোপয়েন্ট থেকে নজিপুর আঞ্চলিক সড়কের দুইপাশে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে বসেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ আমের মোকাম। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শত শত ভ্যান, অটোরিকশা, পিকআপ ও ট্রাকে করে আম্রপালি, ল্যাংড়া, বারি-৪, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, হাঁড়িভাঙ্গাসহ বিভিন্ন জাতের আম যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

কিন্তু এই ব্যস্ত বাণিজ্যের আড়ালে বাড়ছে আমচাষিদের হতাশা। অস্বাভাবিক উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাক্সিক্ষত দাম না পাওয়া, ‘ঢলতা’ নামে অতিরিক্ত ওজনে আম বিক্রি এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার আম নষ্ট হচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান না হলে দেশের অন্যতম বৃহৎ আম উৎপাদনকারী এই অঞ্চলে চাষের আগ্রহ কমতে পারে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যে দেখা যায়, চলতি মৌসুমে নওগাঁ জেলায় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় চার লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে শুধু সাপাহার উপজেলায়ই প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। এখানে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন। যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একসময় বরেন্দ্র অঞ্চলের অনাবাদি ও উঁঁচু জমিতে ধান চাষ করে কৃষকরা খুব কম লাভ পেতেন। গত এক যুগে সেই চিত্র বদলে দিয়েছে আম। বর্তমানে অনেক কৃষক প্রতি বিঘায় সব খরচ বাদ দিয়ে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত মুনাফা করছেন। আমকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নতুন অর্থনীতি, বদলে গেছে সাপাহার ও আশপাশের এলাকার জীবনযাত্রা।

তবে এই সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সংরক্ষণ সঙ্কট। সাপাহার উপজেলা আম আড়তদার সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসেন রিফাত নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় আমের মোকামগুলোর একটি এখন সাপাহার। মৌসুমে এখানে প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার আম কেনাবেচা হয়। অথচ আধুনিক হিমাগার বা সংরক্ষণাগার না থাকায় উৎপাদিত আমের প্রায় ২০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা। একটি আধুনিক ম্যাংগো প্রসেসিং জোন বা শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়েই লাভবান হবেন।

এখানে আমচাষিদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ও বাগান পরিচর্যার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি আমের দাম। সাপাহারের কুচকুরিলিয়া গ্রামের চাষি সোহেল রানা নয়া দিগন্তকে বলেন, আম্রপালি পাকার পর ২৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে বিক্রি করতে হয়। গাছে ধরে রাখার সুযোগ নেই। এ সময় বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে বড় ব্যবসায়ীরা দাম কমিয়ে দেন। ফলে বাধ্য হয়ে আমাদের কম দামে আম বিক্রি করতে হয়।

তিনি বলেন, চলতি বছর মৌসুমের শুরু থেকেই আবহাওয়া অনুকূলে ছিল না। ফলে অনেক বাগানে ফলন কম হয়েছে। গত বছর যে আম্রপালি ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা মণ বিক্রি হয়েছে, এবার ৩ হাজার টাকার নিচে বিক্রি করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আম চাষিরা অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচই তুলতে হিমশিম খাচ্ছে।

এ দিকে দামের পাশাপাশি ‘ঢলতা’ও কৃষকদের বড় ভোগান্তি। সরকার কেজিভিত্তিক বিক্রির নির্দেশনা দিলেও অধিকাংশ মোকামে এখনও ৫০ থেকে ৫২ কেজিকে এক মণ ধরে আম কেনাবেচা হচ্ছে। এতে প্রতি মণে কৃষকদের ১০ থেকে ১২ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত আম দিতে হচ্ছে।

কুচিন্দা এলাকার চাষি আব্দুল জব্বার নয়া দিগন্তকে বলেন, ১০ বিঘার বাগান থেকে তিনি ৩৫ ক্যারেট আম বাজারে এনে দিলেন। কিন্তু গত বছরের তুলনায় দাম অনেক কম। তার ওপর ৫২ কেজিতে মণ ধরায় আরো ক্ষতির মুখে পড়ছেন। সরকার কেজিতে বিক্রির সিদ্ধান্ত দিলেও মাঠে তার বাস্তবায়ন নেই। শুধু নির্দেশনা দিলেই হবে না, প্রশাসনকে কঠোরভাবে তা কার্যকর করতে হবে।

একই এলাকার আমচাষি আকবর হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, আগে ৪৫ কেজিতে এক মণ ধরা হতো। এখন ৫২ থেকে ৫৩ কেজি পর্যন্ত দিতে হয়। নানা অজুহাতে আরো কয়েক কেজি বেশি নেয়া হয়। এতে ১৩ মণ আম দিয়ে ১০ মণের দাম পাওয়া যায়। উৎপাদন খরচ বাড়লেও আমের দাম কমেছে। তার ওপর অতিরিক্ত ওজন দিতে হচ্ছে। এভাবে কৃষকের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।

সাপাহার ডাকবাংলোর পাশে আড়তে বসে কথা হয় আম চাষি আতাউর রহমানের সাথে। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, এবার ভ্যাপসা গরমে প্রায় সব আম একসাথে পেকে গেছে। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় দ্রুত বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে আড়তদার যে দাম বলেন, সেই দামেই আম ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি বলেন, শুধু সাপাহারে কেজিভিত্তিক বিক্রি চালু করলে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন। রাজশাহী বিভাগের প্রায় সব মোকামেই একই ধরনের ওজন পদ্ধতি চালু রয়েছে। তাই সারা দেশে একযোগে ব্যবস্থা কার্যকর না হলে এককভাবে পরিবর্তন সম্ভব নয়।

চট্টগ্রাম থেকে আম কিনতে আসা ব্যবসায়ী আজাহার হোসেন বলেন, এবার দেশের বিভিন্ন বাজারে আমের চাহিদা তুলনামূলক কম। কম দামে কিনেও অনেক সময় লোকসান গুনতে হচ্ছে।

এ দিকে আমের এই বিশাল বাজারকে ঘিরে মৌসুমজুড়ে সাপাহার ও পোরশায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। দিন-রাত তারা পালাক্রমে আম বাগান, হাট, আড়ত ও পরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি যানজট নিরসনেও কাজ করছেন। তবে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এই মোকামকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, একটি বাইপাস সড়ক অথবা স্থায়ী আমের আড়ত নির্মাণ করা হলে যানজট কমবে এবং ব্যবসাও আরো সুশৃঙ্খল হবে। সাপাহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রোমানা রিয়াজ বলেন, প্রশাসন নিয়মিত বাজার তদারকি করছে। ওজন বা অন্য কোনো অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।