‘শিবগঞ্জ মডেল’ এর আড়ালে বৈষম্য ও স্বজনপ্রীতির অভিনব রূপ
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর গঠিত বিএনপি সরকারের প্রথম চার মাসেই উন্নয়নের নামে আঞ্চলিক বৈষম্য ও স্বজনপ্রীতির এক অভিনব রূপ দেখল দেশ। নির্বাচনী প্রচারণায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, সরকার গঠন করলে কেবল নিজের এলাকার কথা ভাবা চলবে না, সুষম উন্নয়ন করা হবে। কিন্তু স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নির্বাচনী এলাকা বগুড়ার শিবগঞ্জে যা ঘটছে, তা এই প্রতিশ্রুতির সম্পূর্ণ বিপরীত। একে স্থানীয়রা এখন বলছেন উন্নয়নের ‘শিবগঞ্জ মডেল’- যেখানে অপ্রয়োজনীয় রাস্তাঘাটের হিড়িক লেগেছে, আর বরাদ্দের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে প্রতিমন্ত্রীর ছেলে ও দলীয় নেতাকর্মীদের পকেটে।
অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘নেত্র নিউজ’-এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের খতিয়ান নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে।
বরাদ্দের মহোৎসবে দেশসেরা শিবগঞ্জ
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গত চার মাসের বরাদ্দ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সারা দেশে রাস্তা ও সেতু নির্মাণের জন্য বরাদ্দকৃত এক হাজার ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে কেবল শিবগঞ্জ একাই পেয়েছে ৭৪ কোটি টাকা। দেশের অন্য কোনো উপজেলা এর ধারের কাছেও নেই। দ্বিতীয় স্থানে থাকা গাজীপুরের কালীগঞ্জ পেয়েছে ৩২ কোটি টাকা- যা শিবগঞ্জের অর্ধেকেরও কম।
দেশের প্রায় ১০০টি উপজেলা যেখানে একটি টাকাও পায়নি, সেখানে শিবগঞ্জ একাই ২০টি উপজেলার সমান বরাদ্দ কুক্ষিগত করেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেভাবে গোপালগঞ্জকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হতো, ঠিক একই ধারায় এখন বগুড়া ও বিশেষ করে শিবগঞ্জকে ঢেলে দেয়া হচ্ছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর পৈতৃক নিবাস গাবতলী উপজেলার চেয়েও চার গুণ বেশি বরাদ্দ পেয়েছে প্রতিমন্ত্রীর এই নিজস্ব এলাকা।
ছেলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও স্বার্থের সঙ্ঘাত
শিবগঞ্জের এই উন্নয়ন উৎসবের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী প্রতিমন্ত্রীর নিজের পরিবার। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে হওয়া এই কাজগুলোর মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বড় অঙ্কের কাজ পেয়েছে প্রতিমন্ত্রীর ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্তর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘মীর সীমান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং’। সীমান্ত নিজে শিবগঞ্জ থানা বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক। তার প্রতিষ্ঠান একাই ১৩.৫ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছে, যা উপজেলার মোট বরাদ্দের ১৮ শতাংশ।
আইনি ফাঁকি ও প্রতিমন্ত্রীর দাবি : এই স্বার্থের সঙ্ঘাত নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম হোয়াটসঅ্যাপে এক লিখিত বার্তায় দাবি করেন, সংসদ সদস্য হওয়ার অনেক আগেই তার ছেলে এই লাইসেন্সের মালিকানা ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’-র মাধ্যমে হস্তান্তর করেছেন। বর্তমানে এর দেখভাল করছেন শিবগঞ্জ পৌর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসান টমাল।
তবে আইন বিশেষজ্ঞরা এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। তাদের মতে, পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানের আইনি মালিকানা বা লভ্যাংশ হস্তান্তর করা যায় না, এটি কেবল প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার অনুমতি দেয়। তাছাড়া, প্রতিমন্ত্রীর পাঠানো সেই পাওয়ার অব অ্যাটর্নির দলিলটি ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট’ অনুযায়ী নিবন্ধিতও ছিল না। এমনকি বিভিন্ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তরে এখনো মীর সীমান্তকেই প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী হিসেবে উল্লেখ করা আছে।
এলটিএম পদ্ধতির অপব্যবহার ও দলীয় ভাগ-বাঁটোয়ারা
উন্মুক্ত দরপত্রের নিয়ম নীতি এড়াতে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে ‘লিমিটেড টেন্ডার মেথড’ বা এলটিএম পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে কোনো উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়াই আগে থেকে নির্ধারিত কিছু ঠিকাদারকে কাজ দেয়া হয়। শিবগঞ্জের ৭৪ কোটি টাকার কাজের মধ্যে ৫২.৬ কোটি টাকার কাজই এই পদ্ধতিতে দেয়া হয়েছে।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন অনুযায়ী, পাঁচ কোটি টাকার নিচের কাজের ক্ষেত্রে এলটিএম ব্যবহার করা যায়। আইনকে ফাঁকি দিতে ৪২ কোটি টাকার একটি বড় নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পকে কৃত্রিমভাবে ১৬টি ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে পাঁচটি প্যাকেজ পায় প্রতিমন্ত্রীর ছেলের প্রতিষ্ঠান। বাকি ১১টি প্যাকেজের মধ্যে অন্তত আটটি দেয়া হয় স্থানীয় বিএনপি নেতাদের।
মীর সীমান্ত ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ কাজ পেয়েছেন শিবগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি বুলবুল ইসলাম। তৃতীয় সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ কাজ পেয়েছেন সোহানী খাতুন, যিনি শিবগঞ্জ উপজেলা যুবদলের সভাপতি খালিদ হাসান আরমানের বোন। আরমানের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স আরমান ট্রেডার্স’ও এই ভাগ-বাঁটোয়ারায় অংশ পেয়েছে। সব মিলিয়ে শিবগঞ্জের অর্ধেকেরও বেশি কাজ (৫৩ শতাংশ) পেয়েছেন বিএনপি ঘরানার অন্তত সাতটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
অপ্রয়োজনীয় রাস্তা ও ভিত্তিপ্রস্তর
ক্ষমতার এই যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে শিবগঞ্জে এখন অপ্রয়োজনীয় রাস্তা পাকা করার হিড়িক পড়েছে। যেমন পৌর সভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গরিবপুর এলাকায় এমন একটি সরু রাস্তায় কোটি টাকার প্রকল্প দেয়া হয়েছে, যেখানে গাড়ি তো দূরের কথা, একটি মোটরসাইকেল চলতেই হিমশিম খেতে হয়। সেই রাস্তার মাথায় মাটির কাঁচা রাস্তার ওপরও শোভা পাচ্ছে প্রতিমন্ত্রীর চকচকে ভিত্তিপ্রস্তর, যেখানে ঠিকাদার হিসেবে খোদাই করা আছে তার ছেলের কোম্পানির নাম।
নব্বইয়ের দশকে একজন সাধারণ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান থেকে শুরু করা মীর শাহে আলমকে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী প্রতিমন্ত্রী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই ক্ষমতার মন্ত্র যে শেষ পর্যন্ত সুশাসনের পরিপন্থী এবং দলীয় ও পারিবারিক পকেট ভরার পুরোনো ‘মডেল’-কে পুনরুজ্জীবিত করছে, শিবগঞ্জের বর্তমান চিত্র তারই এক বড় প্রমাণ।