যুদ্ধের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারছে না পুঁজিবাজার
পুঁজিবাজার উন্নয়নে সিইএবি-ডিএসই একসাথে কাজ করবে
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারছে না পুঁজিবাজার। গত শনিবার পাকিস্তান সরকারের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টাও শেষপর্যন্ত কার্যকর হয়নি। ফলে রোববার সকালে লেনদেনের শুরুতেই এর প্রভাব পড়ে দেশের দুই পুঁজিবাজারে। দেশের প্রধান শেয়ারবাজারটি শুরুতেই ৩০ পয়েন্ট হারায়। পরবর্তীতে পতনের এ ধাকা সামলে নিলেও দিনভর বাজার আচরণের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেনি। তবে দিনশেষে দুই পুঁজিাবাজারেই সূচকের নামমাত্র উন্নতি হওয়ার পাশাপাশি লেনদেনের উন্নতি ঘটেছে।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১৩ দশমিক ৬৯ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। ৫ হাজার ২৫৭ দশমিক ৭০ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করে দিনশেষে সূচকটি পৌঁছে যায় ৫ হাজার ২৭১ দশমিক ৪০ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ দশমিক ১৪ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখলেও ডিএসই শরিয়াহ সূচকের অবনতি ঘটে ২ দশমিক ০৯ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ০ দশমিক ৯৩ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৩৭ দশমিক ৮৫ ও ৯ দশমিক ৭৯ পয়েন্ট।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এমনিতেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নাজুক; তাই মধ্যপ্রাচ্যের এ যুদ্ধ না থামলে তা আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এক্ষেত্রে সবার আগেই এর প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে। আর আমাদের বিনিয়োগকারীরাও বছরের পর বছর লোকসান গুনতে গুনতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিজেদের ঝুঁকিমুক্ত রাখতে চান। ফলে বাজারে বিক্রয়চাপ বেড়ে যায়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে যে ধরনের ধৈর্য দরকার আমাদের পুঁজিবাজারের বাস্তবতায় তা আশা করা যায় না। কারণ ২০২০ সাল থেকে একের পর এক বিপর্যয় পুঁজিবাজারকে স্বাভাবিক হতে দেয়নি। গত ৫ বছরের বেশি সময় ধরে কিছু লুটেরা ছাড়া প্রকৃত বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার থেকে খুব একটা লাভবান হতে পারেননি।
এদিকে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও দেশের অভ্যন্তরে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা চীনা কোম্পানিগুলোর সংগঠন চাইনিজ এন্টারপ্রাইজেস অ্যাসোসিয়েশন ইন বাংলাদেশ (সিইএবি) যৌথভাবে পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে কৌশল প্রণয়নে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন। ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার। তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ায় সিইএবির সহযোগিতায় নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে আরো বিনিয়োগবান্ধব করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
শনিবার (১১ এপ্রিল) ডিএসইর পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান হয়েছে, বাংলাদেশে কার্যরত চীনা কোম্পানিগুলোর অন্যতম শীর্ষ সংগঠন চাইনিজ এন্টারপ্রাইজেস অ্যাসোসিয়েশন ইন বাংলাদেশ এর ১৯ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণে সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)-এর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিনিধিদলটির নেতৃত্ব দেন সংগঠনটির ভাইস প্রেসিডেন্ট মা বেন।
বৈঠকের শুরুতে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, দেশের পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও কার্যকর রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার হবে এবং আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা প্রণয়নে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া ডিএসই আগ্রহী কোম্পানিগুলোর সাথে পৃথকভাবে আলোচনা করে তাদের বিনিয়োগ ও তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়ায় সহায়তা প্রদান করবে।
সভাটিকে উভয় পক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে উল্লেখ করে সিইএবির ভাইস প্রেসিডেন্ট মা বেন বলেন, এর মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং ভবিষ্যতে চীনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা আরো গভীর হবে। তিনি আরো জানান, সময়ের সাথে সাথে সিইএবির পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ২৫০-এর বেশি, যারা বাণিজ্য, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি, লজিস্টিকসসহ বিভিন্ন খাতে সক্রিয়। বাংলাদেশে কার্যরত প্রায় সব বড় চীনা কোম্পানিই এই সংগঠনের সদস্য। তিনি বিদ্যুৎ উৎপাদন, টানেল, সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে, পয়ঃশোধনাগার এবং যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে চীনা কোম্পানিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথাও তুলে ধরেন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২৬ সালে সিইএবি বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো জোরদারে কাজ করে যাবে এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বৈঠকে সিইএবির অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ডিএসইর সহকারী জেনারেল ম্যানেজার কামরুন নাহার সংস্থাটির বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য উপস্থাপন করেন। ডিএসইর পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুর রহমান, প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ড. মো: আসিফুর রহমান, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মো: আদিব হোসেন খানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বৈঠক শেষে প্রতিনিধিদল ডিএসই টাওয়ারের মাল্টিপারপাস হল ও ট্রেনিং একাডেমি পরিদর্শন করেন।
অনেকটা মন্দাভাব নিয়ে পার করলেও গতকাল দুই পুঁজিবাজারেই মূল্যবৃদ্ধিতে আধিপত্য ধরে রাখে বীমা খাত। এ খাতে প্রায় শতভাগ কোম্পানিরই মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। তবে এগিয়ে ছিল সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলো। গতকাল ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির প্রথম চারটিই ছিল সাধারণ বীমা কোম্পানি। আর এসব কোম্পানির সবক’টিরই দিনের সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে।