বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন ও সার্ক পুনরুজ্জীবন চায় ভারত
পিটিআই, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দি ট্রিবিউনসহ একাধিক ভারতীয় মিডিয়ার সূত্র অনুসারে, বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেয়ার পাশাপাশি সার্কের পুনরুজ্জীবন সম্পর্কে দিল্লিকে উদ্যোগ নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন।
Printed Edition
ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পাকিস্তান ও চীনের সাথে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা এবং ভারতের টানাপড়েনের প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পিটিআই, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দি ট্রিবিউনসহ একাধিক ভারতীয় মিডিয়ার সূত্র অনুসারে, বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা পরিষদ সার্কের পুনরুজ্জীবন সম্পর্কে দিল্লিকে উদ্যোগ নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন।
নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, গত শুক্রবার ওই বৈঠকে ভারতের প্রাক্তন পররাষ্ট্রসচিব এবং প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল সৈয়দ আতা হাসনাইন, বাংলাদেশে ভারতের প্রাক্তন হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাস এবং শিক্ষাবিদ অমিতাভ মাট্টু উপস্থিত ছিলেন। ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ’ বিষয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সাথে সম্পর্কিত এসব বিশেষজ্ঞ এবং বেসরকারি সাক্ষীদের সাক্ষ্য রেকর্ড করা হয়। ভারতের সংসদীয় প্যানেলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন কংগ্রেস সংসদ সদস্য শশী থারুর। সূত্র জানায়, কিছু সংসদ সদস্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়ছে, যা ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংসদ সদস্যরা এও বলেন, পাকিস্তান বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করছে।
একজন সংসদ সদস্য পরামর্শ দিয়ে বলেন যে, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা পরিষদ (ঝঅঅজঈ) কে পুনরুজ্জীবিত করে এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বৃদ্ধির প্রচেষ্টা মোকাবেলা করা যায়। তিনি আরো পরামর্শ দেন যে, সাংবাদিকদের আদান-প্রদান বাংলাদেশের সাথে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি করবে। হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসার পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদুল ইসলাম সার্ককে সক্রিয় করে তোলার জন্য দিল্লিকে উদ্যোগ ও সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব দেয় ঢাকা। কিন্তু দিল্লি তাতে তেমন সাড়া দেয়নি।
ভারতের একজন সংসদ সদস্য ওই বৈঠকে বলেন যে, ইউনূস সরকারের অধীনে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের অবনতি নিয়ে কিছু সদস্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের সাথে দীর্ঘ সীমান্ত ভাগ করে নেয়া ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রভাবও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সংসদ সদস্যরা উত্থাপন করেছেন। সন্দেহভাজন বৃহৎ আকারের অনুপ্রবেশের ফলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান ওই সংসদ সদস্য। তবে বৈঠকের পর গণমাধ্যমের সাথে কথা বলতে গিয়ে থারুর বলেন, বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ এখন কমে গেছে।
এ দিকে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, যা ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে, বৈঠকে এ বিষয়টিও আলোচনার জন্য উঠে আসে। ভারতীয় সংসদ সদস্যরা ২০২৬ সালে চুক্তি নবায়নের সময় গঙ্গার পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভারতের পক্ষে আরো বেশি মতামত চেয়েছেন। ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম মেয়াদ শুরু করেছিলেন, আর এইচ ডি দেবগৌড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ৩০ বছরের চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে এবং নবায়নের জন্য দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্মতির প্রয়োজন হবে। চুক্তিটি প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শুষ্ক সময়ের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা ব্যারাজে গঙ্গার পানি বণ্টনের জন্য একটি কাঠামো তৈরি করেছিল।
শশী থারুর বৈঠকের পর সাংবাদিকদের আরো জানান, চারজন প্রথম শ্রেণীর বিশেষজ্ঞ আমাদের দুর্দান্ত অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছেন আমরা (ভারতে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের বিষয়টি) নিয়ে আলোচনা করিনি, তবে এমন একটি পরিসংখ্যান সম্পর্কে বলা হয়েছিল যে আমাদের দেশে আসা বাংলাদেশীদের সংখ্যা এখন কমে গেছে।
বাংলাদেশের ক্ষমতার করিডোর পাকিস্তানের পক্ষে কৌশলগতভাবে প্রবাহিত হওয়ার বিষয়ে ভারতের কেন সতর্ক থাকা উচিত, চীন যদিও পাকিস্তান, চীন এবং বাংলাদেশের একটি চক্র প্রস্তাবিত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপকে অনুমোদন দিতে সম্মত হয়নি, তবুও যথেষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে ঢাকা এ বিষয়ে একটি কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের দিকে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে ইউনানের কুনমিংয়ে চীন, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সংলাপ একটি প্রতীকী পরিবর্তনের বিন্দু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল- যা এই অঞ্চলের কৌশলগত সারিবদ্ধতার সূক্ষ্ম পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। চীনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সান ওয়েইডং, বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রসচিব রুহুল আলম সিদ্দিক এবং পাকিস্তানের অতিরিক্ত পররাষ্ট্রসচিব ইমরান আহমেদ সিদ্দিকীকে একত্রিত করে এই বৈঠকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্থাপত্য পুনর্বিন্যাস করার জন্য বেইজিংয়ের উচ্চাকাক্সক্ষা তুলে ধরা হয়েছিল এবং ঢাকাকে তার ক্রমবর্ধমান প্রভাব বলয়ের কাছাকাছি আনার জন্য তার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল।
ভারতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া ছিল সংযম। প্রস্তাবিত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (ঔডএ) পূর্ণ অনুমোদন উল্লেখযোগ্যভাবে স্থগিত রাখা হয়েছিল, যা একটি বৃহত্তর ত্রিপক্ষীয় এজেন্ডা কার্যকর করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল। আরো উচ্চস্তরের পরামর্শের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে, ঢাকা এই উদ্যোগের বিস্তৃত পরিধি সম্পর্কে আপত্তি প্রকাশ করেছে- যা সরাসরি বিরোধিতার পরিবর্তে একটি পরিমিত সতর্কতা প্রতিফলিত করে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান টানাপড়েনের পটভূমিতে জল্পনা চলছে যে, ত্রিপক্ষীয় বৈঠকটি ভারতকে কূটনৈতিকভাবে দূরে সরিয়ে দেয়ার একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ ছিল। গত ২৬ জুন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো: তৌহিদ হোসেন বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করে চীন ও পাকিস্তানের সাথে কোনো নতুন জোট গঠনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে নাকচ করেন। এই আলোচনার অনানুষ্ঠানিক এবং অরাজনৈতিক প্রকৃতির ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো জোট গঠন করছি না। এটি সরকারি পর্যায়ে একটি বৈঠক ছিল, রাজনৈতিক পর্যায়ে নয় কোনো জোট গঠনের কোনো উপাদান ছিল না।’ তিনি আরো জোর দিয়ে বলেন যে, বৈঠকটি কোনো প্রতিবেশী দেশকে লক্ষ্য করে নয়, পরোক্ষভাবে নয়াদিল্লির উদ্বেগ প্রশমিত করার উদ্দেশ্যে।
ভারতীয় মিডিয়াগুলো বলছে, ঢাকার এই সংযম একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যমূলক পদক্ষেপের প্রতিফলন ঘটায় যার মাধ্যমে নয়াদিল্লির সাথে অকাল বিচ্ছেদ এড়ানোর পাশাপাশি উদীয়মান অংশীদারিত্ব অন্বেষণ করার চেষ্টা করা হয়। সম্ভবত বাংলাদেশ তার দীর্ঘ দিনের কৌশলগত মিত্র নয়াদিল্লির সাথে অকাল বিচ্ছেদ এড়াতে চায়। তবুও ভারতের জন্য, বৃহত্তর সঙ্কেতগুলো ক্রমশ উদ্বেগজনক। এই ত্রিপক্ষীয় সম্পৃক্ততা এমন এক সময়ে সংঘটিত হচ্ছে যখন নয়াদিল্লি থেকে ঢাকার কৌশলগত বিচ্যুতি ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ঔডএ-এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের বিরোধিতা সত্ত্বেও, বাংলাদেশ, চীন এবং পাকিস্তান সম্মিলিতভাবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ থেকে শুরু করে ডিজিটাল অর্থনীতি, সমুদ্রবিষয়ক, শিক্ষা এবং জনস্বাস্থ্য পর্যন্ত বিস্তৃত ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা আরো গভীর করতে সম্মত হয়েছে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের প্রতি পাকিস্তানের অব্যাহত সমর্থনের কারণে ঝঅঅজঈ থেকে সরে আসা এবং আরো বাস্তববাদী এবং সহযোগিতামূলক ইওগঝঞঊঈ-এর দিকে মনোনিবেশ করার পর, বিলুপ্ত আঞ্চলিক ব্লকটিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য ঢাকার প্রচেষ্টা আরো গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে। যখন বিমসটেক প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, তখন সার্কের ওপর ইউনূসের জোর বৈদেশিক নীতির একটি ইচ্ছাকৃত পুনর্বিন্যাসের দিকে ইঙ্গিত করে যা নয়াদিল্লির সাথে কম সংযুক্ত অংশীদারদের আকর্ষণ করার চেষ্টা করে, যা তার পূর্বসূরিদের দ্বারা নির্ধারিত কৌশলগত পথ থেকে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতির ইঙ্গিত দেয়।
একজন ভারতীয় এমপি জানান, দেশটির সংসদীয় কমিটির ওই বৈঠকে শেখ হাসিনাকে গত বছর ক্ষমতাচ্যুত করার পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে কিছু সদস্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, বাংলাদেশ, চীন এবং পাকিস্তানের মধ্যে একটি নতুন জোটকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে ঢাকার বর্তমান অনিচ্ছা কূটনৈতিক সতর্কতার ইঙ্গিত দেয়। এখন আমাদের দেশটির নতুন সরকারের অধীনে জনগণের সাথে জনগণের সম্পর্কসহ বিভিন্ন স্তরে ভারতের বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ করা উচিত। তারা আরো বলেন, একটি বন্ধুত্বপূর্ণ ভারত বাংলাদেশের স্বার্থেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (ঝঅঅজঈ) পুনরুজ্জীবিত করার জন্য বাংলাদেশের আহ্বানে ভারতের সমর্থন করার সম্ভাবনা কম; কারণ এই আঞ্চলিক গোষ্ঠীটি প্রায়শই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যায় জর্জরিত থাকে। মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশের সার্ক পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তাব এবং ভারতের সমর্থনের আহ্বান এমন এক সময়ে এসেছে যখন পাকিস্তানের সাথে গভীর উত্তেজনা সংগঠনটির ওপর দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে।