তেলআবিবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ঢেউ

Printed Edition
first-2
তেলআবিবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ঘটনাস্থলে ইসরাইলি জরুরি উদ্ধারকারী দল : ইন্টারনেট

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • ইরানের নতুন নিরাপত্তা প্রধান বাকের জোলঘাদর
  • মধ্যস্থতার চেষ্টায় তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তান
  • ট্রাম্পের আলোচনার দাবি বাতিল তেহরানের
  • যুদ্ধের দায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওপর চাপানোর চেষ্টা ট্রাম্পের

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সঙ্ঘাত নতুন মোড় নিয়েছে। ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় পরিবর্তন, তেলআবিবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, লেবাননে ইসরাইলি বিমান অভিযান এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে বৈশ্বিক উত্তেজনা- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত এবং বাস্তবতার মধ্যে অসঙ্গতি নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (এসএনএসসি) নতুন মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মোহাম্মদ বাকের জোলঘাদর। সম্প্রতি নিহত আলী লারিজানির স্থলাভিষিক্ত হয়ে দায়িত্ব নেয়া জোলঘাদর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অভিজ্ঞ কমান্ডার হিসেবে পরিচিত। বিচার বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। বিশ্লেষকদের মতে, এই নিয়োগ ইরানের “যুদ্ধকালীন কৌশলগত পুনর্গঠন”-এর ইঙ্গিত বহন করছে।

তেলআবিবে ও গালফে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : ইসরাইলের বাণিজ্যিক রাজধানী তেলআবিবে ইরানের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এতে অন্তত চারজন আহত হয়েছেন এবং বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, একটি ক্ষেপণাস্ত্রে প্রায় ১০০ কেজি বিস্ফোরক ছিল, যা বড় গর্ত তৈরি করে আশপাশের স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষতি করেছে।

তবে আগাম সতর্কতার কারণে বেশির ভাগ বাসিন্দা আশ্রয়য়কেন্দ্রে চলে যাওয়ায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর দাবি, ইরানের প্রায় ৪৭০টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্মের মধ্যে ৩৩০টির বেশি ইতোমধ্যে ধ্বংস বা অকার্যকর করা হয়েছে। তবুও হামলা অব্যাহত রয়েছে।

এ দিকে মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত ইসরাইলে পাঁচ দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ধ্বংস হলেও একটি বিয়ারশেবা শহরের বাইরে পড়েছে বলে দাবি করেছে ইসরাইল। এতে বড় ধরনের হতাহতের খবর না থাকলেও কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অন্য দিকে বাহরাইন বলছে, ইরানি হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক সেনা নিহত হয়েছেন। বাহরাইনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশটির ওপর চালানো হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের একজন সেনা নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাদের মতে এই হামলাগুলোর জন্য ইরান দায়ী।

মধ্যস্থতার চেষ্টা : উত্তেজনা কমাতে তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তান সক্রিয়ভাবে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ইসলামাবাদে সম্ভাব্য বৈঠকের প্রস্তুতিও চলছে। পাকিস্তান উভয় পক্ষের সাথে যোগাযোগ রেখে বার্তা আদান-প্রদান করছে। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আলোচনা অত্যন্ত নাজুক এবং যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।

দ্য গার্ডিয়ানের খবর অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা আলোচনার মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছে পাকিস্তানের সেনা নেতৃত্ব। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনীর এই সঙ্ঘাত নিয়ে আলোচনার জন্য গত রোববার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে ফোনে কথা বলেছেন বলে নিশ্চিত করেছে হোয়াইট হাউজ। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা আয়োজনের বিষয়ে ইসলামাবাদ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে কিছু বলেনি। দুই পক্ষের কেউই এখনো এ বিষয়ে রাজি হওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি।

লেবাননে নতুন ফ্রন্ট : দক্ষিণ লেবাননের টাইর শহরে ইসরাইলি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। একই সাথে চারটি এলাকায় জোরপূর্বক সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। হিজবুল্লাহর সংসদ সদস্য হাসান ফাদলাল্লাহ সতর্ক করে বলেছেন, দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইল যদি “নিরাপত্তা অঞ্চল” গঠন করতে চায়, তবে তা হবে লেবাননের অস্তিত্বের জন্য হুমকি এবং তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার লেবাননের ইরানি রাষ্ট্রদূত বহিষ্কারের সিদ্ধান্তকে “যৌক্তিক” বলে মন্তব্য করেছেন। এতে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরো বাড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা প্রশ্নের মুখে : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় পাঁচ দিনের জন্য হামলা স্থগিত থাকবে। তবে ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইস্পাহান ও খোররামশহরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলার খবর পাওয়া যায়। ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, এসব হামলায় বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে। এতে ট্রাম্পের ঘোষণার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল কেউই সরাসরি দায় স্বীকার করেনি।

একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, ইরানের সাথে “ফলপ্রসূ আলোচনা” চলছে। তবে ইরান এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষক হাসান আহমাদিয়ান বলেন, আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয় বরং বার্তা আদান-প্রদান চলছে। কাতারের বিশ্লেষক সুলতান বারাকাতের মতে, ট্রাম্প হয়তো কৌশলগতভাবে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ইসরাইলের হাতে।

আইআরজিসি ট্রাম্পের বক্তব্যকে “মনস্তাত্ত্বিক অভিযান” বলে উল্লেখ করেছে এবং নতুন হামলার ইঙ্গিত দিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সঙ্কট থেকে বের হতে ভুয়া খবর ছড়াচ্ছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা ট্রাম্পের : ইরান যুদ্ধের দায় নিজের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ওপর চাপানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি গত সোমবার বলেন, তার প্রশাসনের সদস্যদের মধ্যে হেগসেথই প্রথম তাকে ইরানে হামলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। টেনেসি অঙ্গরাজ্যের মেমফিসে সোমবার ‘সেফ টাস্ক ফোর্সের’ এক গোলটেবিল বৈঠকে ট্রাম্প এমনই ইঙ্গিত দেন। বৈঠকে দায় চাপানোর পাশাপাশি হেগসেথের প্রশংসাও করেন ট্রাম্প।

হরমুজ প্রণালি : বৈশ্বিক সঙ্কটের কেন্দ্র

হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে “সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা” নেয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রস্তাবটি গৃহীত হলে সঙ্ঘাত আরো বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে তাদের পূর্ণ সক্ষমতা রয়েছে এবং বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ মেনে নেয়া হবে না।

মার্কিন সামরিক উপস্থিতিতে পরিবর্তন : মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন বিশ্বের বৃহত্তম মার্কিন বিমানবাহী রণতরি “ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড” গ্রিসে ফিরে গেছে। এতে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিতে একটি বড় শূন্যতা সৃষ্টি হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। এর আগে “আব্রাহাম লিংকন”সহ একাধিক রণতরী ইরানবিরোধী অভিযানে অংশ নেয়।

আলোচনার সময় এখন : ইইউ

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন যুদ্ধ বন্ধ করে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এই সঙ্ঘাত বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ, অর্থনীতি ও সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি বেসামরিক জাহাজে হামলাকে অগ্রহণযোগ্য উল্লেখ করে দ্রুত সংলাপের আহ্বান জানান।

বর্তমান পরিস্থিতি তিনটি সমান্তরাল বাস্তবতা তুলে ধরছে- সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি, কূটনৈতিক বিভ্রান্তি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত কার্যকর কূটনৈতিক সমাধান না এলে এই সঙ্ঘাত “নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ” থেকে পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের এই সঙ্ঘাত এখন শুধু একটি আঞ্চলিক ইস্যু নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং কূটনীতির জটিল সমীকরণে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে পরবর্তী কয়েক দিনের দিকে, যা এই সঙ্কটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।