অভিযোগপত্রের তিনগুণ চূড়ান্ত প্রতিবেদন, বিচারে ধীরগতি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মোট মামলা ১,৮৬২টি
Printed Edition
জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে রাজধানীসহ সারাদেশে দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় এক জটিল ও ধীরগতির বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সম্পর্কিত মোট ৭৮৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৭৯টি হত্যা মামলা এবং ৩১০টি অন্যান্য অপরাধসংক্রান্ত। এসব মামলার মধ্যে ডিএমপি এককভাবে ৫৯৯টি এবং পুলিশের অন্যান্য ইউনিট অবশিষ্ট ১৫৫টি মামলার তদন্ত পরিচালনা করছে। ডিএমপি সদর দফতরের তদন্ত পর্যালোচনা থেকে দেখা যায়, রাজধানীতে তদন্ত শেষ হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে আসামি অভিযুক্ত করার চেয়ে মামলা থেকে অব্যাহতির জন্য ‘চূড়ান্ত প্রতিবেদন’ (ফাইন্যাল রিপোর্ট) দাখিল করার প্রবণতা প্রায় তিন গুণ বেশি।
এ পর্যন্ত ডিএমপি মাত্র আটটি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে, যার মধ্যে চারটি হত্যা ও চারটি অন্যান্য মামলা। অন্য দিকে ২৭টি মামলায় আসামিদের অব্যাহতির আবেদন জানিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে, যার মধ্যে ২২টিই হত্যা মামলা। অর্থাৎ, আইনি তদন্ত শেষে আদালতে উত্থাপিত প্রতিবেদনের বিচারে অভিযোগপত্রের তুলনায় চূড়ান্ত প্রতিবেদনের হার তিন গুণেরও বেশি।
তদন্ত প্রক্রিয়ার এহেন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ এক হাজার ৪০০ জনের সবার পরিচয় শনাক্ত করে তাদের হত্যকারীদের বিচার নিশ্চিত করা হবে। তিনি আরো জানান, তদন্তে উঠে এসেছে আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর একটি হাসপাতাল থেকে কিছু লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল, যে বিষয়ে এখন গভীর তদন্ত চলছে। এ ছাড়া ঢাকার মাতুয়াইল, জুরাইন, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে জুলাইয়ে নিহতদের একাধিক গণকবরের সন্ধান পেয়েছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। চিফ প্রসিকিউটর দাবি করেন, জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত তালিকার চেয়েও প্রকৃত নিহতের সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে এবং প্রতিটি ঘটনা উদ্ঘাটনে সংস্থাটি কাজ করে যাচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞ ও পুলিশ প্রশাসনের মতে, আন্দোলনপরবর্তী সময়ে অতি-উৎসাহী হয়ে দায়ের করা অনেক মামলায় অজ্ঞাতনামা বা ব্যক্তিগত শত্রুতাবশত সাধারণ মানুষকে আসামি করা হয়েছিল, যার ফলে তদন্তে অসঙ্গতি বেরিয়ে আসছে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান জানান, অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে বাদির সন্ধান মিলছে না কিংবা ঘটনাস্থলের ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে। বাণিজ্য ও হয়রানির উদ্দেশ্যে দায়ের করা এসব মামলায় পুলিশ সরেজমিন তদন্ত ও তথ্যপ্রমাণ যাচাই করে সঠিক তথ্য উপস্থাপন করছে, যে কারণে বিপুলসংখ্যক মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে হচ্ছে। ডিএমপির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র এবং ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রতিটি মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত, ফরেনসিক তথ্য এবং সাক্ষীদের জবানবন্দী যাচাই-বাছাই করেই আইন অনুযায়ী প্রতিবেদন দেয়া হচ্ছে। কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন এবং মিথ্যা মামলাকারীদের বিরুদ্ধে যেন আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যায়, সে লক্ষ্যে প্রতি ১৫ দিন পরপর উচ্চপর্যায়ে পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
একই চিত্র ফুটে উঠেছে সারা দেশে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর সামগ্রিক পরিসংখ্যানেও। পুলিশ সদর দফতরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে জুলাই অভ্যুত্থান ঘিরে মোট এক হাজার ৮৬২টি মামলা নিবন্ধিত হলেও এখন পর্যন্ত তদন্ত শেষ হয়েছে মাত্র ২৫৪টির, যা মোট মামলার মাত্র ১৩ শতাংশ। সারা দেশে দায়ের হওয়া ৭৯৯টি হত্যা মামলার মধ্যে ১০০টির তদন্ত সম্পন্ন করতে পেরেছে পুলিশ, যার মধ্যে ৬৩টিতে অভিযোগপত্র এবং ৩৭টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। অন্য দিকে হত্যা ব্যতীত অন্যান্য এক হাজার ৬৩টি মামলার মধ্যে ১৩৬টিতে অভিযোগপত্র এবং ১৮টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা পড়েছে, যা অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রে মাত্র ১৪ শতাংশ নিষ্পত্তির হার নির্দেশ করে।
এ দিকে তদন্তের এই ধীরগতি ও অব্যাহতির পরিসংখ্যানের পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তোষ ও গভীর আক্ষেপ তৈরি হয়েছে শহীদ পরিবারের মধ্যে। গত ২৩ জুন জাতীয় সংসদে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও গণহত্যার বিচার’ শীর্ষক আলোচনা এবং বাজেট বিতর্কে অংশ নিয়ে শহীদ জাবির ইব্রাহিমের স্মৃতিচারণ করে তার মা ও সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম বিচারিক প্রক্রিয়ার বিলম্ব নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ৫ আগস্ট অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শাহাদতবরণকারী নিজের সন্তানের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘একজন বাবা অথবা মা সবধরনের সুযোগ-সুবিধার আগে যেটা চায়, সেটি হলো তার সন্তানের হত্যার বিচার। দৃশ্যমান বিচার ছাড়া কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলুপ্তি সম্ভব নয়।’ তিনি সংসদে তুলে ধরেন, ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া ৮০টি মামলার মধ্যে মাত্র সাতটির রায় হয়েছে, ২২টির সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে এবং ৪৬৩ জন আসামির মধ্যে এখনো ২৮৮ জন পলাতক। এই ২৮৮ জনকে গ্রেফতারের অগ্রগতি কী তা প্রশ্ন তুলে প্রতি অধিবেশনে শহীদদের বিচারিক কার্যক্রমের হালনাগাদ তথ্য সংসদে উপস্থাপনের দাবি জানান তিনি। একই সাথে, হাজারেরও বেশি শহীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত গেজেটে মাত্র ৮৩৪ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে উল্লেখ করে বাদ পড়া প্রায় ৫০ জন শহীদ ও আহতদের আইনি ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দের আহ্বান জানান তিনি।
শহীদ মাতার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ বিধিতে সংসদ অধিবেশনে দেয়া বিবৃতিতে আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বলেন, ‘যিনি শহীদ মাতা বক্তৃতা দিয়েছেন, তার প্রতিটি বক্তব্যই আমাদের চেতনায়, আমাদের রক্তে, আমাদের বিপ্লবে, আমাদের সংগ্রামের প্রেরণার মূল চেতনা।’ সরকার জুলাইযোদ্ধাদের আইনি ও রাজনৈতিক সুরক্ষা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী জানান, ট্রাইব্যুনালে জমা পড়া ৫৯০টি অভিযোগের মধ্যে ১০৯টি মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়েছে, ছয়টি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং চারটি মামলার রায় অপেক্ষমাণ রয়েছে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ ৩৫ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। বিদেশে বসে যারা আত্মসমর্পণের হুমকি দিচ্ছে, আইনের বিধান অনুযায়ী তাদের কোনো সুযোগ নেই উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান সরকার জুলাই চেতনার সরকার এবং আইনি কাঠামোর মধ্যেই সরকার প্রতিটি শহীদ পরিবারের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রস্তুত রয়েছে।
এ দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা থেকে নতুন করে আরো ১২টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন তাদের হাতে এসেছে। এসব প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফর্মাল চার্জ) গঠন করা হবে। নতুন জমা হওয়া এসব তদন্ত প্রতিবেদনের মধ্যে ২০১৩ সালের মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের বহুল আলোচিত মামলাটিও রয়েছে। শাপলা চত্বরের ওই ঘটনায় জমা পড়া তদন্ত প্রতিবেদনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব:) আজিজ আহমেদসহ মোট ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে।