পানি সঙ্কটে নাকাল সিলেট নগরবাসী

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো
Printed Edition
  • ৭০ ভাগ মানুষ সিসিকের পানির বাইরে
  • ওয়াসা এখনো কাগজে-কলমে

সিলেট নগরের ২০ লাখ বাসিন্দার অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক পানি সঙ্কটে ভুগছেন। সিটি করপোরেশনের (সিসিক) একমাত্র পুরনো কুশিঘাট পানি শোধনাগার ও ৪৫টি প্রোডাকশন পাম্প মিলিয়ে দৈনিক মাত্র চার কোটি লিটার পানি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। অথচ প্রতিদিনের চাহিদা প্রায় ১৩ কোটি লিটার। ফলে প্রায় ৭০ ভাগ বাসিন্দা সরাসরি পানি সেবার বাইরে রয়েছেন।

নগরের ৪২টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টিতেই কোনো পানির লাইন নেই। যেসব এলাকায় লাইন আছে, সেখানেও সরবরাহ কম, অনেক ক্ষেত্রে পানির সাথে ময়লা মিশে যায় বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও দ্রুত নিচে নামছে, কোথাও কোথাও তা ৪০-৪৫ ফুট নেমে যাওয়ায় নলকূপে পানি মিলছে না।

বাইশটিলা প্রকল্প ১১ বছরেও ফাইলবন্দী

পানি সঙ্কট নিরসনে ২০১৪ সালে সারি নদীর চেঙ্গেরখাল থেকে পানি আনার মাধ্যমে ‘বাইশটিলা পানি শোধনাগার’ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় সিসিক। প্রায় ১২০০ কোটি টাকার ওই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দৈনিক পাঁচ কোটি লিটার পানি উৎপাদন সম্ভব হতো। তবে একনেক অনুমোদন না মেলায় এক যুগ পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি এখনো ফাইলবন্দী।

সাবেক প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরের পানি সঙ্কটের ৭৫ শতাংশ কেটে যেত। আশা করছি শিগগিরই একনেকে ওঠবে।’

কিন্তু নগরবাসীর অভিযোগ- সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে এই প্রকল্প অবহেলা করছে। উন্নয়ন বঞ্চিত করে সিলেটবাসীর সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হচ্ছে বলে তারা মনে করেন।

‘কাগজে-কলমে’ সিলেট ওয়াসা

২০২২ সালের মার্চে দেশের পঞ্চম ওয়াসা হিসেবে সিলেট ওয়াসা গঠন করা হয়। কিন্তু তিন বছর পার হলেও কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। বোর্ড ও চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হলেও বাজেট, জনবল কাঠামো, ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ- কোনো কিছুই হয়নি। ফলে ওয়াসা এখনো কেবল আইনে সীমাবদ্ধ, বাস্তবে নেই কোনো অস্তিত্ব।

সিলেট নগরে পানির চিত্র

দৈনিক চাহিদা: ১২.৫ থেকে ১৩ কোটি লিটার

সরবরাহ: ৪ কোটি লিটার

ঘাটতি: ৭০%

সিসিকের পানি প্লান্ট: ১টি (কুশিঘাট)

গভীর নলকূপ: ৪৫টি

পানি লাইনবিহীন ওয়ার্ড: ১৮টি

বাইশটিলা প্রকল্প ব্যয়: ১২০০ কোটি টাকা (ফাইলবন্দী ১১ বছর)

ওয়াসা: প্রতিষ্ঠিত ২০২২, কার্যক্রম শূন্য

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকেও এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য মিলছে না। সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার বলেন, ‘ওয়াসা চালু হওয়া খুব জরুরি। আমরাও চাই দ্রুত কার্যক্রম শুরু হোক।’

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মিসবাহ উদ্দিন বলেন, ‘সিলেটে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে দূষণ ও আরো ভয়াবহ সঙ্কট দেখা দেবে। সমাধান একটাই- প্রাকৃতিক পানি ব্যবহার।’

তিনি মনে করেন, নদীর পানি শোধন করে ব্যবহার করাই হচ্ছে টেকসই সমাধান। তাই দ্রুত বাইশটিলা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ওয়াসা কার্যক্রম শুরু করার ওপর জোর দেন বিশেষজ্ঞরা।

নাগরিক দুর্ভোগ অব্যাহত

নগরীর জালালাবাদ আবাসিকসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনে অনেক সময়ই পানি মেলে না। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, একাধিকবার সিসিককে জানানোর পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

সিসিক কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা অনেক কম। তার ওপর ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে পানি তোলায় বিঘœ ঘটছে। সমাধানে নাগরিকদের বাড়িতে রিজার্ভ ট্যাংক স্থাপনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

২০ লাখ মানুষের নগর সিলেটে পানি সঙ্কট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। এক দিকে বাইশটিলা প্রকল্প বছরের পর বছর ফাইলবন্দী, অন্য দিকে ওয়াসা কার্যক্রম কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। ফলে নগরবাসীর প্রশ্ন- কবে মিলবে তাদের মৌলিক অধিকার, নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা?