দ্বিতীয় দিনের মতো পুঁজিবাজার সূচকের বড় উন্নতি

সূচক এগিয়ে নিচ্ছে বড় মূলধনী কোম্পানিগুলো

Printed Edition
artho-1
দ্বিতীয় দিনের মতো পুঁজিবাজার সূচকের বড় উন্নতি

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সাহসে ভর করে পুঁজিবাজারের সাথেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তাইতো যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও সূচকের উন্নতি অব্যাহত রয়েছে পুঁজিবাজারে। গতকাল টানা দ্বিতীয় দিনের মতো দেশের দুই পুঁজিবাজারের সবগুলো সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটে। লেনদেনের শুরু থেকে ঊর্ধ্বমুখী সূচকগুলো এক পর্যায়ে মৃদু বিক্রয়চাপের শিকার হলেও পরবর্তীতে তা কাটিয়ে ওঠে। আর এভাবে দিনশেষে উভয় বাজারই সূচকের বড় উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীরা এবার অনেকটা আতঙ্কমুক্ত থেকে বাজারের সাথে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যার ফলশ্রুতিতে উন্নতি ঘটেছে পুঁজিবাজার আচরণের।

সোমবার সূচকের বড় উন্নতির পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গতকাল ছিল সংশোধেন শঙ্কা। একেতো সারা বিশে^ চলছে এখন যুদ্ধের ডামাডোল। তার ওপর একদিন আগে সূচকের এত বড় উন্নতি। সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীরা লেনদেনের শুরুতে বেশ দ্বিধান্বিত ছিলেন। কিন্তু লেনদেন শুরু হলে অবসান ঘটে সব দ্বিধাদ্বন্দ্বের। মাত্র বিশ মিনিটের মাথায় দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটির উন্নতি ঘটে ১১৩ পয়েন্ট। লেনদেনের এ পর্যায়ে মৃদু বিক্রয়চাপের মুখে পড়লে সাময়িকভাবে নি¤œমুখী আচরণ করে সূচকটি। পরবর্তী ১৫ মিনিটে সূচকটি আবার ৪০ পয়েন্ট হারায়। কিন্তু সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ফের ঊর্ধ্বমুখী হয় বাজার সূচক যা লেনদেনের শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে। একই আচরণ ছিল দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১৪৮ দশমিক ২৮ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। পাঁচ হাজার ১৪১ দশমিক ৪১ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি মঙ্গলবার দিনশেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ২৮৯ দশমিক ৬৯ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৬২ দশমিক ৯৭ ও ২৩ দশমিক ২৪ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৩৩৩ দশমিক ৬১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। এ সময় বাজারটির বিশেষায়িত দুই সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৩৮২ দশমিক ৫২ ও ২০৮ দশমিক ৫৪ পয়েন্ট।

সূচকের উন্নতির ফলে গতকাল পুঁজিবাজারগুলোতে লেনদেনেরও উন্নতি ঘটে। ডিএসই গতকাল ৫৯৩ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিনের চাইতে ১৭৭ কোটি টাকা বেশি। সোমবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৪১৬ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে ৪৭ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছে যার একটি বড় অংশ ছিল পূবালী ব্যাংকের। এখানে ৩৭ কোটি টাকা এককভাবে পূবালী ব্যাংকের শেয়ার বেচাকেনা হয়েছে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিনিয়োগকারীরা এখন কিছুটা পরিপক্ব আচরণ করছেন। আগে সামান্যতেই যেখানে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তেন সেখানে এ যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও তারা বাজারের সাথে রয়েছেন। এর ফলে কিছুটা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে তা ঠিক। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে লোকসান দিতে থাকা বিনিয়োগকারীরা এবার বাজারের সাথে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকাটি রাখছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। তারা তাদের সক্ষমতাকে ব্যবহার করে বাজারকে এগিয়ে নিচ্ছে। কারণ ঈদকে সামনে রেখে এসব প্রতিষ্ঠানকে অনেক বাড়তি ব্যয় মোকাবেলা করতে হয় যেটি পুঁজিবাজার থেকেই আয় করে নিতে হয়। তাই মরিয়া হয়েই প্রতিষ্ঠানগুলো এই ঝুঁকি নিচ্ছে। আর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা তাদের অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখছেন।

এদিকে গতকাল সূচকের বড় ধরনের উন্নতির পেছনে ভূমিকা পালন করেছে বড় মূলধনের কোম্পানিগুলো। এদের মধ্যে ব্যাংকিং কোম্পানিগুলো যেমন ছিল তেমনি ছিল টেলিযোগায়োগ খাতের দুই বহুজাতিক কোম্পানি গ্রামীণফোন ও রবি অজিয়াটা। এ ছাড়া ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানও বীমা খাতের অবদানও ছিল যথেষ্ট। গতকাল ব্যাংকিং খাতে শতভাগ কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। একই আচরণ দেখা গেছে বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও টেলিযোগায়োগ খাতের। এর বাইরে ওষুধ ও রসায়ন খাতের বড় মূলধনের কোম্পানি স্কয়ার ফার্মা ও বেক্সিমকো ফার্মার মূল্যবৃদ্ধিও দিনের বাজার সূচককে বড় রকম প্রভাবিত করে। ডিএসইতে গতকাল মূল্যবৃদ্ধি ঘটে লেনদেন হওয়া কোম্পানির প্রায় ৮৮ শতাংশের। এখানে লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৮৯টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় ছিল ৩৩৯টি। ১৩টি কোম্পানির দরপতন ঘটে। এ ছাড়া দর অপরিবর্তিত ছিল ৩৭টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের।

ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে ছিল ব্যাংকিং খাতের কোম্পানি সিটি ব্যাংক। ৩৭ কোটি ১৩ লাখ টাকায় কোম্পানিটির এক কোটি ১৯ লাখ ২০ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২১ কোটি ৭৪ লাখ টাকায় ২৭ লাখ ৯৬ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে একই খাতের ব্র্যাক ব্যাংক ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ওরিয়ন ইনফিউশন, রবি অজিয়াটা, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, যমুনা ব্যাংক, ইনটেক অনলাইন, ব্যাংক এশিয়া, লাভেলো আইসক্রিম ও উত্তরা ব্যাংক।

গতকাল ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল জীবন বীমা কোম্পানি প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স। গতকাল কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল সাধারণ বীমা কোম্পানি এশিয়া ইন্স্যুরেন্স। ডিএসই্র মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে নাহি অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট, ফার্স্ট জনতা ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড, এশিয়া প্যাসিফিক ইন্স্যুরেন্স, ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড, এল আর গ্লোবাল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, হাইডেলবার্গ ম্যাটেলিয়ালস, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স ও সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স।

ডিএসইতে গতকাল দরপতনের তালিক্যয় ছিল মাত্র ১৩টি কোম্পানি ও ফান্ড। এগুলোর দরপতনের হারও ছিল নিতান্তই কম। দিনের সর্বোচ্চ দরপতনের শিকার ছিল টেক্সটাইল খাতের মেট্রো স্পিনিং। ২ দশমিক ০৬ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। এ তালিকায় থাকা অন্য কোম্পানি ও ফান্ডগুলো ছিল যথাক্রমে প্রিমিয়ার সিমেন্ট, নিউলাইন ক্লদিং, ডেল্টা স্পিনিং, জাহিন টেক্সটাইল, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড, বসুন্ধরা পেপার মিলস, আরামিট সিমেন্ট, প্রগ্রেসিভ লাইফ ও ন্যাশনাল ফিড মিলস।