হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অভিযান ইরানের প্রতিরোধের ঘোষণা
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে মুক্ত করতে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামক এক বিশেষ অভিযানের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্য দিকে হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ আসার চেষ্টা করলে তা নস্যাৎ করে দিয়েছে ইরান। গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে ইরানের সেনাবাহিনীর জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর ও তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা জারির পর শত্রুপক্ষের ওই যুদ্ধজাহাজগুলো পিছু হটতে বাধ্য হয়।। খবর : এএফপি ও এনডিটিভির
এ দিকে ট্রাম্পের প্রজেক্ট ফ্রিডম পরিকল্পনাকে ‘হস্তক্ষেপ’ উল্লেখ করে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দিয়েছেন। পোস্ট করা এক বার্তায় তিনি লিখেছেন, হরমুজ প্রণালীর নতুন সামুদ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো হস্তক্ষেপকে চলমান যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে বিবেচনা করা হবে।
আরব উপসাগর ও পারস্য উপসাগরকে সংযুক্তকারী ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ হরমুজ প্রণালী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জলপথ। বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল-গ্যাস ও জ্বালানি পণ্য এ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ জারি করে ইরান। ফলে প্রণালী, আরব উপসাগর ও পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে শতাধিক জাহাজ। রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করা এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, হরমুজে আটকে পড়া এই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নৌবাহিনীর প্রহরার মাধ্যমে প্রণালী থেকে বের হতে সহযোগিতা করবে যুক্তরাষ্ট্র। এ প্রকল্পের নাম ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ দিয়েছেন তিনি।
ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, বিশ্বের অনেক দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজে আটকা পড়েছে। এসব দেশের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যে চলমান আঞ্চলিক সঙ্ঘাতের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট নয় এবং তারা আমাদের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে যে আমাদের নৌবাহিনী যেন আটকা পড়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে প্রণালী থেকে বের হতে সহযোগিতা করে। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় সোমবার সকাল থেকে হরমুজে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ শুরু হচ্ছে বলে ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। এ অভিযানে ১৫ হাজার মার্কিন সেনা, ডেস্ট্রয়ার জাহাজ, বহুমাত্রিক মানববিহীন প্ল্যাটফর্ম (ড্রোন) এবং ১০০’র বেশি যুদ্ধবিমান অংশ নেবে বলে জানায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে এ পোস্ট করার কিছুক্ষণ পর যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্কবার্তা দিয়ে এ পোস্ট দেন এব্রাহিম আজিজি। এ ছাড়াও এক বিবৃতিতে দেশটি স্পষ্ট করেছে, মার্কিন সেনারা সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করলেই কঠোর হামলার মুখে পড়বে। ইরানের কেন্দ্রীয় কমান্ড প্রধান আলী আবদুল্লাহি বলেন,‘এ জলপথের নিরাপত্তার দায়িত্ব ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের সামরিক বাহিনীর হাতে ন্যস্ত। তাই এখানে যেকোনো ধরনের নৌচলাচল বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্যোগ নিতে হলে অবশ্যই ইরানের সামরিক বাহিনীর সাথে সমন্বয় করতে হবে।’ ইরান জানিয়েছে, কোনো বিদেশী সেনাবাহিনী, বিশেষ করে মার্কিন বাহিনী, যদি হরমুজ প্রণালীর দিকে অগ্রসর হয় বা প্রবেশের চেষ্টা করে, তা হলে তাদের লক্ষ্য করে সরাসরি হামলা চালানো হবে।
হরমুজের নতুন নিয়ন্ত্রণ ঘোষণা ইরানের
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে নতুন করে ‘মেরিটাইম কন্ট্রোল জোন’ ঘোষণা করেছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। তাসনিম নিউজের খবর অনুসারে সোমবার সংস্থাটির পক্ষ থেকে দেয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এ ‘স্মার্ট কন্ট্রোল’ ব্যবস্থার সীমানা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। নতুন এ নিয়ন্ত্রণ জোনের দক্ষিণী সীমা ইরানের মাউন্ট মোবারক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরার দক্ষিণ পর্যন্ত এবং পশ্চিম সীমা ইরানের কেশম দ্বীপ থেকে আরব আমিরাতের উম্ম আল-কুওয়াইন পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়েছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা হবে।
মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলার দাবি
হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরানি নৌবাহিনীর হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করায় একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে দু’টি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে দাবি করেছে তেহরান। গতকাল সোমবার সকালে জাস্ক বন্দরের কাছে এ ঘটনা ঘটে বলে সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রোটোকল লঙ্ঘন করে হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করছিল। সে সময় ইরানের নৌবাহিনী জাহাজটিকে একাধিকবার সতর্ক সঙ্কেত পাঠালেও তা আমলে নেয়া হয়নি। ফলে ইরানি বাহিনী জাহাজটি লক্ষ্য করে হামলা চালায়। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মার্কিন জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পরবর্তীতে তা নির্ধারিত পথ ছেড়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। তবে এ ঘটনায় জাহাজের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন কোনো যুদ্ধ জাহাজে হামলা হয়নি বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর কোনো জাহাজে আঘাত হানা হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, মার্কিন বাহিনী ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ এবং ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ কার্যকর করছে।
আমিরাতের তেলের ট্যাংকারে হামলা
এ দিকে আলজাজিরা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের তেলের ট্যাংকারে হামলার শিকার হওয়ার কথা স্বীকার করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছে যে, হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
আমিরাতের পক্ষ থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে এ হামলাকে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২৮১৭ নম্বর রেজুলেশনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ওই রেজুলেশনে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু না করার বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আমিরাত দাবি করেছে, বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং হরমুজ প্রণালীকে অর্থনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ‘জলদস্যুতা’। এটি এ অঞ্চলের জনগণ ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি।
ইউএই অবিলম্বে ইরানকে এ ধরনের হামলা বন্ধ করার এবং দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে হরমুজ প্রণালী নিঃশর্তভাবে সম্পূর্ণ খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
জব্দ ইরানি জাহাজের ২২ নাবিক পাকিস্তানে
ওমান উপসাগর থেকে জব্দ করা ইরানের পতাকাবাহী জাহাজ এমভি তুসকার ২২ জন নাবিককে পাকিস্তানে পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেখান থেকে পরে তাদের নিজ দেশে ফেরার কথা রয়েছে। সোমবার ইরান যুদ্ধের দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) একজন মুখপাত্র এ কথা জানিয়েছেন। আলজাজিরার খবর অনুসারে গত মাসে এমভি তুসকা নামের ইরানি জাহাজটি জব্দ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, এমভি তুসকার ২২ জন নাবিককে পাকিস্তানে হস্তান্তরের কাজ শেষ করেছে মার্কিন বাহিনী। তাদের দেশে (ইরান) প্রত্যাবাসন করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র গত ২০ এপ্রিল ইরানের কনটেইনারবাহী জাহাজটি জব্দ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপ করা নৌ অবরোধ ভঙ্গ করায় জাহাজটিকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনাকে ‘জলদস্যুতা’ বলে চিহ্নিত করেছে তেহরান।
সেন্টকম জানায়, এমভি তুসকায় থাকা ছয়জনকে গত সপ্তাহে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য একটি আঞ্চলিক দেশের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, এ ছয়জন জাহাজটির নাবিকদের পরিবারের সদস্য।