নতুন বছরের রাজনীতি : আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
অন্তর্বর্তী সরকার শেষ পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও অজানা শঙ্কার মাঝে এই সময়ে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ আশার আলো আবারও ছড়িয়ে পড়েছে। সারা দেশে এখন নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের
Printed Edition
এক উক উর্দু কবি বলেছেন : ‘রাত চাহে কিতনি ভি আন্ধেরি হো/সুবাহ কা সুরজ জরুর নিকালতা হ্যায়/মুসকিলে চাহে কিতনি ভি বড়ি হো/ হোসলা রাখ, হর রাস্তা মিলতা হ্যায়।’ (রাত যত অন্ধকার হোক না কেন/ভোরের সূর্য অবশ্যই উদিত হবে/সমস্যা যত কঠিনই হোক না কেন/সাহস রাখো, তোমার সামনে প্রতিটি রাস্তা খুলে যাবে।)
জুলাই বিপ্লবের পর আমাদের সামনে সম্ভাবনার যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, নানা জটিলতা, চক্রান্ত এবং ভাঙনের বীজ অঙ্কুরিত হয়ে দেড় বছরের মাথায় তা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। বহু বছর পর্যন্ত আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক একচেটিয়াবাদ ও প্রভুত্বের দম্ভের অবসান ঘটার সাথে যাতনাক্লিষ্ট জনগণ ভেবেছিল তাদের দুঃখ-দুর্দশারও চির অবসান ঘটেছে। কিন্তু তা যে ঘটেনি বর্তমানে দেশে উদ্ভূত পরিস্থিতি জনগণকে আবারও নতুন করে অনিশ্চয়তার ঘূর্ণাবর্তে ফেলতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে নতুন একটি বছরের আগমন কী বার্তা নিয়ে আসছে?
এ আশঙ্কা কী আমাদের বার বার ঘাত-প্রতিঘাতের অভিজ্ঞতার কারণে? আমরা যুগের পর যুগ সম্মানজনক ও আত্মমর্যাদার বোধে অনুপ্রাণিত হয়ে নিঃস্বার্থভাবে দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করার পরিবর্তে সম্পূর্ণ নিজ স্বার্থ হাসিলের কাজে নিজেদের নিয়োজিত রেখে শ্রেণী-বিভাজন সৃষ্টি করার কারণেই কী আমরা ‘যা ঘটে ঘটুক, আমাদের তো কোনো অসুবিধা হচ্ছে না’ ভেবে নির্লিপ্ত মনোভাব পোষণ করছি? আমি কিছু পরিমাণে গ্রিক ‘সিনিসিজম’ বা ‘নিন্দবাদ’ তত্ত্বের অনুরাগী, যা প্রথম দিকে হেলেনীয় যুগ বা আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর থেকে রোমান রাজকীয় যুগ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল, তখন মানুষকে বিবেচনা করা হতো যৌক্তিক প্রাণী হিসেবে, যাদের জীবনের একটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকবে এবং সামাজিক বাধাগুলো থেকে মুক্ত হয়ে নিজের মাঝে সদগুণের সমাবেশ ঘটিয়ে সুখ অর্জন করবে। তারা সম্পদ, ক্ষমতা, ঐশ্বর্য, সামাজিক স্বীকৃতি ইত্যাদি জাগতিক আকাক্সক্ষা পরিহার করে আত্মসুখকেই বড় করে দেখবে।
এই নিন্দাবাদ কার্যত সুখের জন্য ব্যক্তিকে কৃচ্ছ্রসাধনে অনুপ্রাণিত করতো। থেবসের ক্রেটস তার বিপুল সম্পদ জনগণের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে এথেন্সের পথে পথে দারিদ্র্যের মাঝে কাটাতেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ‘সিনিসিজম’ বিকৃত হতে সন্দেহবাদে রূপান্তরিত হয় এবং এই সন্দেহবাদী দর্শন এক নেতিবাচক মোড় নেয়। সন্দেহবাদীরা মানুষের আন্তরিকতা এবং তাদের সততাপূর্ণ উদ্দেশ্য ও কাজকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। পরবর্তীকালের সন্দেহবাদীরা মানুষের প্রতি তাদের সনিগ্ধতার যে কারণগুলো চিহ্নিত করেছিল, সেগুলোর অন্যতম জীবন নিয়ে তারা নির্বিকার ছিল; তারা নির্লজ্জভাবে নিজেদের সব কিছুর ঊর্ধ্বে ভাবত; তাদের মতবাদের সেরা আর কোনো মতবাদ থাকতে পারে বলে তারা বিশ্বাস করত না; এবং তারা তাদের বন্ধু ও শত্রুর মধ্যে লক্ষণ রেখা টেনে দিতো। কুকুর যেমন তার প্রতিপক্ষ কুকুর দেখলেই ঘেউ ঘেউ করে তাড়া করে, সেরা মতবাদের দাবিদাররাও একইভাবে তাদের মতবাদ বিরুদ্ধ যে কাউকে দূরে রাখতে তাই করে।
আওয়ামী লীগ জন্মাবধি এই সন্দেহবাদী রাজনীতি করেছে এবং কাউকে তাদের ধারে কাছে ভিড়তে দেয়নি। ক্ষমতার বাইরেও তারা প্রতিপক্ষকে তাদের পথ থেকে দূর করতে তাদের কুকুরদের লেলিয়ে দিয়েছে, যখনই ক্ষমতায় গেছে, তখন তাদের কল্পিত শত্রুকে হত্যা, গুম করাসহ নানাভাবে নির্মূল করতে কখনো দ্বিধা করেনি বা পাপবোধে ভোগেনি। ব্যতিক্রম ছিল কেবল ২০২৪ এর জুলাই আগস্ট। ক্ষমতার দম্ভ এবং তাদের চিরাচরিত আচরণে তারা জুলাই-আগস্টের আন্দোলনকে আমলেই নেয়নি। তারা ভেবেছিল দু’চারটাকে গুলি করে মেরে ফেললে বা আন্দোলনকারীদের ধাওয়া দিতে তাদের ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীকে নিয়োগ করলেই সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। আবারো তারা উপদ্রবহীনভাবে তাদের তথাকথিত রাম-রাজত্ব চালাতে পারবে। কিন্তু তারা ভাবেনি যে একে একে দেড় হাজার শিশু-তরুণ এবং বিভিন্ন বয়সী মানুষকে হত্যার পর আন্দোলন বিপ্লবের রূপ ধারণ করবে এবং প্রাণে রক্ষা পেতে তাদের লেজ গুটিয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে হবে। কিন্তু যা অভাবিতপূর্ণ, তাই ঘটেছিল। এটা ছিল অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার সাফল্য। দুঃখে ভরা অন্ধকার রাতের অবসান ঘটেছিল।
বিপ্লবোত্তর প্রথম নতুন বছর ২০২৫-এ মানুষের মন নতুন আশায় পূর্ণ ছিল। কিন্তু বিপ্লবীদের চেতনায় প্রভাবিত অন্তর্বর্তী সরকারের অনভিজ্ঞ উপদেষ্টাবৃন্দ, বিপ্লবী চেতনার বিপরীত মেরুতে থাকা বেসামরিক প্রশাসন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও অহেতুক বিলম্ব, সাবেক সরকারের যারা হত্যাকাণ্ড ও লুণ্ঠনে অভিযুক্ত, তাদের বিচারে অহেতুক তালবাহানা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যর্থতা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রেখে মূল্য বৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরতে না পারা এবং জুলাই বিপ্লবের চেতনা অনুযায়ী সংস্কার অনুযায়ী সংবিধানের সংশোধন সম্পন্ন করে যথাসম্ভব স্বল্প সময়ের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে না পারার মধ্যে বিপ্লবের মূল সুর এরই মধ্যে ক্ষীণ হয়ে গেছে। সব জরুরি রাষ্ট্রীয় বিষয়ে যখন তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত ছিল, তখন সব কিছুতে ছাড় দিয়ে ও ঢিলেমি করে অন্তর্বর্তী সরকার তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। রাজনৈতিক সরকারের অনুপস্থিতি যত প্রলম্বিত হয়, রাষ্ট্রে জটিলতা তত বৃদ্ধি পায়, এই বোধটুকু অন্তর্বর্তী সরকারের কারো মধ্যে না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক ছিল। তারা কী রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অনভিজ্ঞতার কারণে, অথবা উপদেষ্টা হিসেবে মন্ত্রী পর্যায়ের সুযোগ-সুবিধার রাজকীয়তা উপভোগ করার আশায় তাদের মেয়াদ প্রলম্বিত করাকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন, অথবা তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিতাড়িত সরকারের প্রক্সি হিসেবে দায়িত্বে থেকে বিদেশে পলাতক প্রভুদের দেশের ভেতর আত্মগোপনে থাকা অনুসারীদের দ্বারা দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির সুযোগ দেয়ার জন্য অপেক্ষা করেছেন?
পরিস্থিতি যেমন হোক, অন্তর্বর্তী সরকার শেষ পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও অজানা শঙ্কার মাঝে এই সময়ে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ আশার আলো আবারও ছড়িয়ে পড়েছে। সারা দেশে এখন নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে ব্যতিব্যস্ত। প্রত্যেকে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় জনগণের কাছে যাচ্ছেন ভোট প্রার্থনা করতে। রাজনৈতিক দলগুলোতে নতুন মেরুকরণ চলছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দুটি বড় দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সাথে ছোট ছোট কিছু দল যোগ দিয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল যেমন হোক এবং যে দল বা দলসমষ্টি ক্ষমতায় আসুক, নতুন বছরের শুরুতেই দেশ পরিচালনার দায়িত্বে একটি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য হয়ে পড়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের সাড়ে পাঁচ দশকে রাষ্ট্র পরিচালনায় বার বার বিঘœ ঘটেছে দীর্ঘকালের জন্য ক্ষমতায় চেপে বসা অরাজনৈতিক সরকারের কারণে। কারণ, অরাজনৈতিক সরকার নির্বাচিত নয়, কারো কাছে তাদের দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহিতা থাকে না, তারা কেবল কিছু রুটিন দায়িত্ব পালনের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে, দেশের উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখে না। বরং প্রায় প্রতিটি অরাজনৈতিক, অনির্বাচিত সরকার তাদের অনির্দিষ্ট মেয়াদকালে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ এবং স্বজনপ্রীতি, কিছু ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদের অবাধ লুণ্ঠনের সুযোগ করে দেয় ও দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করে। এমনকি তাদের মেয়াদকালে তাদের দ্বারা সংঘটিত অবৈধ ও বেআইনি কাজের কারণে তাদেরকে যাতে অভিযুক্ত না করা হয়, সে জন্য তারা পরবর্তী সরকারের কাছে দায়মুক্তির আইন তৈরি করিয়ে নেয়া হয়। প্রতিটি অনির্বাচিত সরকারের ক্ষেত্রে এ ঘটনাই ঘটেছে।
ফেলে আসা বছরটি নিঃসন্দেহে জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থমকে দাঁড়ালেও প্রবাসী বাংলাদেশীদের কল্যাণে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাবেক সরকারের পলায়নের সময় যে তলানিতে পৌঁছে গিয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠে একটা দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ভোগ্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সরকারের ব্যবস্থাপনার শৈথিল্য বা বাজার নিয়ন্ত্রণে অদক্ষতার কারণে পণ্যমূল্য অনেক বেড়ে স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর অবহেলা বা অনিচ্ছায় পরিস্থিতির এত অবনতি ঘটেছে এবং বিশেষ করে উচ্ছৃঙ্খল জনতা বা মবের কবলে পড়ে নিহতের ঘটনা ১৯৭৪ পরবর্তী সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ ছিল। সন্দেহ করা হয় যে, সাবেক সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্তরাই এখনো আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী বাহিনীর সর্বস্তরে বিরাজ করছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যাপারে তাদের মধ্যে পেশাদারিত্বের ঘাটতি পড়েছে। কারণ তারা সাবেক সরকারের প্রতি রাজনৈতিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। বর্তমান সরকার যেহেতু অনির্বাচিত ও অরাজনৈতিক, সে জন্য এমন একটি সরকারের মেয়াদে তারা কারো বিরাগভাজন না হয়ে দিনগুলো কোনোমতে কাটিয়ে দেয়ার চিন্তাভাবনার মধ্যে রয়েছে।
সব কিছু সত্ত্বেও বাংলাদেশের জনগণ আগামীর পানে তাকিয়ে আছে, তারা ভস্ম থেকে ফিনিক্সের মতো কিছু উঠে আসবে বলে। তারা জানে, সব ধ্বংসই ধ্বংস নয়, বরং নতুন সৃষ্টির অমিত সম্ভাবনা। ইতোমধ্যে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা জাতীয় রাজনীতি ও অর্থনীতির পাশাপাশি দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক রাজনীতি, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়ন এবং বিগত সরকার টানা চার মেয়াদে অনেক দেশের নীতির সাথে একগুঁয়েমি ভাব দেখিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যেভাবে ক্ষুণœ করেছে, তা থেকে বাংলাদেশে বের করে পুনরায় দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে দেশকে উন্নয়নের সিঁড়িতে উপরে উঠানোর প্রচেষ্টার আবশ্যকতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করছেন। তারা বৈশ্বিক বাজারে শুল্ক এবং বাণিজ্য নীতির প্রভাব সম্পর্কে উদ্বিগ্ন, পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উন্নয়নের সম্ভাবনার সব সুযোগ গ্রহণ করে ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে নির্বাচিত সরকার দ্রুততার সাথে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে বলেও আশাবাদী।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচন নয়, একই দিনে নির্বাচনের সাথে যুক্ত হবে জুলাই সনদের ওপর গণভোট। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বলে আসছেন যে, ‘আগামী নির্বাচন উৎসবমুখর করে তুলতে হবে। ইতিহাসে স্মরণীয় করে তুলতে হবে, যে নির্বাচন জাতির জন্য এবং বিশ্বের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশের ইতিহাসের সুন্দর নির্বাচন হবে।’ পলাতক আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত তিনটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা জাতির জন্য সুখকর ছিল না। ওই নির্বাচনগুলোতে ভোটবিহীনতার সংস্কৃতি চালু করেছিল সরকার। ভোটাররা নির্বাচনকেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোটাধিকার করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কাছে ভোটারের ভোটের এবং ব্যাপক অর্থে জনগণেরই প্রয়োজন ছিল না। তারা তাদের দলের প্রার্থী ভিন্ন অন্য দলের কাউকে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেয়নি, কেউ প্রার্থী হলেও তাদের পরাজিত করতে তাদের সমর্থকরা যাতে ভোটকেন্দ্রে না আসতে পারে, সেজন্য ভয়ভীতি দেখিয়েছে, মৃত্যুর হুমকি দিয়েছে। অতএব ২০১৪ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনই ছিল ভোটবিহীন নির্বাচন। কোনো বিচারেই নির্বাচনগুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনগণের অংশগ্রহণমূলক ছিল না।
নির্বাচনের ভোটহীনতার সংস্কৃতি কাটিয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণমূলক হবে, এটা জনগণের বড় প্রাপ্তি। গণভোটের মধ্য দিয়ে জনগণ জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সংবিধানের নতুন অবয়ব দেখতে পাবে, এটাও এক ধাপ অগ্রগতি। কিন্তু নির্বাচিত দলীয় সরকার যদি অতীতের সরকারের অনুসরণে সংবিধানের বিধিবিধান কার্যকর বা গণতান্ত্রিক আচরণ করার পরিবর্তে দলীয় একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা আবারো মুখ থুবড়ে পড়বে। এমন আশঙ্কা জনগণ যে এখনই মুছে ফেলতে পেরেছে এমন ধারণা করলে ভুল হবে। ‘ঘরপোড়া গরু আকাশে সিঁদুরে মেঘ দেখলেও ভয় পায়’ প্রবাদের প্রতিফলন বাংলাদেশের জনগণ বারবার প্রত্যক্ষ করেছে। তারা এর পুনরাবৃত্তি আর দেখতে চায় না। বহুকাল দেশবাসী তাদের ওপর পরিচালিত অন্যায়ের সুবিচার পায়নি। হত্যা, গুম, অপহরণ এবং বিনাবিচারে কারাগারে আটকে রাখার ভীতি এখনো তাদের চিত্তে জাগরূক। রাজনৈতিক মাস্তানদের চাঁদাবাজির দাপট এখনো অব্যাহত। এখনো মানুষ বেঘোরে প্রাণ যাওয়ার ভয়ে ভীত। নির্বাচনে যে দল ক্ষমতায় আসবে, তারা কি জনগণকে তাদের নিজ বাড়িতে, রাস্তায় ও কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে? তারা পণ্যমূল্য সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে পারবে, অথবা সাবেক সরকারের মতো ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের হাতে যখন খুশি মূল্যবৃদ্ধির স্বাধীনতা দিয়ে মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস তুলে ছাড়বে?
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে আসার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট সহসাই পাল্টে গেছে। তার উপস্থিতিতে এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের অস্তিত্বও অনেকটা ম্লান হয়ে গেছে। বিএনপি তো দল হিসেবে তাকে অবশ্যই বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায়। জনগণ এখনই তাকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী বলে বিবেচনা করতে শুরু করেছে। সরকার যেভাবে তার নিরাপত্তা ও প্রটোকলের ব্যবস্থা করেছে, তা একজন সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানকে দেয়া নিরাপত্তা ও প্রটোকলের সমান। দেড় মাসের কম সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তারেক তার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারলে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সে ক্ষেত্রে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হিসেবে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের পদে একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবেন। তারেক রহমান হয়তো নিজেও তা বিশ্বাস করেন। কিন্তু এরই মধ্যে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে যে সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে তাকে ঝামেলায় পড়তে হতে পারে তার নিজের দলের মধ্য থেকেই, যারা বিরোধী দলে থাকবে, তাদের পক্ষ থেকে নয়। এ অবস্থা তিনি কিভাবে দূর করবেন, তা নির্ভর করবে তার ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তার ওপর।
আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় জেঁকে বসার পর থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তার ছেলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সব কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে, বিনাবিচারে কারাগারে বছরের পর বছর আটক রেখে এবং বিএনপি নেতাকর্মীদের হত্যা করে বিএনপিকে কার্যত নেতৃত্বশূন্য করে ফেলেছে। প্রায় দেড় যুগ স্থবির হয়ে থাকা দলটিতে নতুন বা বিকল্প কোনো নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়নি। ফলে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরে বিএনপির পক্ষে আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে, এমনকি খালেদা জিয়াকে তার বাড়ি থেকে বের করে দেয়া ও তাকে নানাভাবে হেনস্তা করার প্রতিবাদে একটি কার্যকর আন্দোলন পর্যন্ত করতে পারেনি। জুলাইবিপ্লবের পর নেতৃত্বহীন বিএনপির মাঝারি নেতা ও মাঠপর্যায়ের কর্মীরা দেশজুড়ে যেভাবে চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্যে নিয়োজিত হয়েছিলেন, সেই ধারাবাহিকতা এখনো বন্ধ হয়নি।
বিএনপির ২০০১-০২ মেয়াদে বনানীর ‘হাওয়া ভবন’ সরকারের বিকল্প ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এবং সরকারের কোনো দায়িত্বে না থাকা সত্ত্বেও তারেক রহমান সেখান থেকে সরকার নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে যে অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আছে, তিনি এবার সরকারে যাওয়ার পর দলের অন্য কোনো প্রভাবশালী যাতে অনুরূপ ধরনের পৃথক কোনো অস্তিত্ব গড়ে উঠার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে দিকে তার যতœবান হতে হবে। ইন্দিরা গান্ধীর ছেলে সঞ্জয় গান্ধীর বিরুদ্ধে তিনি কোনো সরকারি পদাধিকারী না হওয়া সত্ত্বেও একইভাবে তার বিরুদ্ধে সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছিল। এ জন্য বিরোধী দল রাস্তায় সঞ্জয়ের বিরুদ্ধে স্লোগান দিত। দিল্লির রাজপথের দু’পাশের দেয়ালগুলো ‘গলি গলি মে শোর হ্যায়, সঞ্জয় গান্ধী চোর হ্যায়’ লেখায় ছেয়ে গিয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের জন্য এর পরিণতি ছিল ভয়াবহ। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাকে ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়েছিল। জরুরি অবস্থা চলাকালে সরকার ও সঞ্জয় গান্ধীর বাড়াবাড়ির অভিযোগ এতটাই প্রবল ছিল যে ১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধী নিজেও নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন। তা ছাড়া এ সময়েই কংগ্রেসে ভাঙন ধরেছিল এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা দল কংগ্রেস আর কখনো তার সাবেক সৌভাগ্যের দিনগুলোতে ফিরে আসতে পারেনি। ১৯৮০ সালে ইন্দিরা গান্ধী সরকার গঠন করলেও বিদ্রোহ দমানোর অজুহাতে শিখদের পবিত্র স্থান স্বর্ণমন্দিরে হামলা চালিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালানোর কারণে তিনি তার শিখ প্রহরীদের গুলিতে নিহত হন। ১৯৯১ সালে নিহত হন তার উত্তরাধিকারী ছেলে রাজীব গান্ধী। অতএব, নতুন বছরের শুরু থেকে বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানকে চোখ কান খোলা রেখে, দলের কেউ যদি অন্যায়, অপকর্মে লিপ্ত থাকে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে নির্মোহ হবে, যাতে দলীয় সুযোগসন্ধানীরা তার বা তার সম্ভাব্য সরকারের প্রশ্রয় লাভ না করতে পারে।
১৭ বছর আগের চেয়ে তারেক রহমান নিঃসন্দেহে রাজনীতিতে যথেষ্ট পরিপক্ব হয়েছেন বলে বিশ্বাস করি। তিনি ২৫ ডিসেম্বর তাকে অভ্যর্থনা জানাতে আগত জনতার উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের বিখ্যাত ওই ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’ উদ্ধৃত করে তার আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান-এর কথা বলেছেন। এটিও একটি বড় স্বপ্ন। তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে তাকে প্রথমেই দলের জঞ্জাল সাফ করার কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউর মতো তাকে প্রথমেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে গ্রহণ করতে হবে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। লি কুয়ান বিশ্বাস করতেন যে দুর্নীতি শুরু হয় উচ্চপর্যায় থেকে। দায়িত্ব গ্রহণ করার দুই বছরের মধ্যে দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তিনি তিনজন মন্ত্রী ও একজন পার্লামেন্ট সদস্যসহ উচ্চপর্যায়ের বহু ব্যক্তিকে পদচ্যুত করেছিলেন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ানের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারেন। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতাও তাকে অবশ্যই শিখিয়েছে যে রাষ্ট্র পরিচালনায় কতটা কুশলী হওয়া আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে সততা ও স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থাকার দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী তার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক পাথেয় হতে পারে।
তারেক রহমান যদি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সত্যিই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেন তাহলে ফরাসি রাজনৈতিক দার্শনিক রুশোর রাষ্ট্রচিন্তা মাথায় রাখা সঙ্গত হবে। রুশো বলেছেন : ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণে সর্বোচ্চ নেতাকে জনগণের অবিভাজ্য ও যৌথ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে হবে এবং নিজেকে ও তার মন্ত্রীদের জনগণের শাসক নয়, সেবক বিবেচনা করতে হবে। তাতে জনগণ উপলব্ধি করবে যে তাদের সম্মতিই রাষ্ট্র ও সরকারের কর্তৃত্বের একমাত্র উৎস।’ কূটবুদ্ধির রাজনৈতিক দার্শনিক হিসেবে খ্যাত মেকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তা থেকেও কিছু ভালো বিষয় তিনি গ্রহণ করতে পারেন, তা হলো : ‘একজন নেতার প্রাথমিক দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রকে নিরাপদ ও শক্তিশালী করার জন্য কঠোর হওয়া। শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য রাষ্ট্রে আইনের শাসন থাকতে হবে, কিন্তু হুমকি মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করতে হবে।’