ইরান পরমাণু নীতির পরিবর্তন করবে না : আরাকচি
Printed Edition
আলজাজিরা
পরমাণু অস্ত্র তৈরির বিরুদ্ধে ইরানের দীর্ঘ দিনের অবস্থান ও নীতিতে আপাতত বড় ধরনের কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তেহরানের বর্তমান অবস্থান বজায় থাকার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আরাকচি একই সাথে সতর্ক করে দিয়েছেন, ইরানের নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা এ বিষয়ে এখনো তার চূড়ান্ত মতামত বা দৃষ্টিভঙ্গি জনসমক্ষে প্রকাশ করেননি।
মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে চলমান যুদ্ধের এই সঙ্কটময় মুহূর্তে ইরানের পরমাণু সক্ষমতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে জল্পনা তৈরি হয়েছে, তারই পরিপ্রেক্ষিতে আরাকচি এই মন্তব্য করেন। উল্লেখ্য, ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দুই দশকেরও বেশি সময় আগে একটি ধর্মীয় ফতোয়া জারি করেছিলেন, যেখানে গণবিধ্বংসী এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা ব্যবহারকে ইসলামী বিধান অনুযায়ী নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি যৌথ বাহিনীর বিমান হামলায় আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার সেই ফতোয়া বা নীতি বহাল থাকবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দীর্ঘ বছর ধরে তেহরানের বিরুদ্ধে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার অভিযোগ করে আসলেও ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক প্রয়োজনে পরিচালিত হচ্ছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি তার সাক্ষাৎকারে আরো স্পষ্ট করেন, ইসলামী আইন অনুযায়ী ফতোয়া বা ধর্মীয় ডিক্রি মূলত প্রদানকারী ফকিহ বা আইনবিদের নিজস্ব ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে। এই প্রসঙ্গে তিনি ইরানের বর্তমান ও নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির কথা উল্লেখ করেন।
আরাকচি জানান, নতুন সর্বোচ্চ নেতার বিচারবিভাগীয় বা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করার মতো অবস্থানে তিনি এখনো পৌঁছাননি। ফলে মোজতবা খামেনি তার পূর্বসূরির পরমাণু বিরোধী ফতোয়াটি হুবহু বজায় রাখবেন নাকি যুদ্ধের এই বিশেষ পরিস্থিতিতে নীতিতে কোনো নমনীয়তা আনবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বর্তমানে ইরানের ওপর চলমান সামরিক চাপ ও শীর্ষ নেতৃত্বের পরিবর্তনের ফলে দেশটির কৌশলগত নীতিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরানের পরমাণু কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রমের ওপর তীক্ষè নজর রাখছে, কারণ যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে ইরান তাদের আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে পরমাণু সক্ষমতাকে ব্যবহার করতে পারে বলে অনেকের ধারণা। তবে আরাকচির এই বক্তব্য এটিই ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেহরান আপাতত তাদের পুরোনো ও প্রকাশ্য অবস্থানেই অনড় থাকতে চায়। সামনের দিনগুলোতে নতুন সর্বোচ্চ নেতার আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমেই ইরানের ভবিষ্যৎ পরমাণু ভাবনার চূড়ান্ত চিত্রটি ফুটে উঠবে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের বিশ্বব্যাপী নেতিবাচক প্রভাব সবার ওপর পড়বে
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি গতকল বুধবার যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে এই বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যে, চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের বৈশ্বিক পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ হবে এবং এর প্রভাব থেকে কেউ রেহাই পাবে না। তিনি বলেছেন, এই যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়ার ঢেউ কেবল শুরু হয়েছে এবং এটি সম্পদ, ধর্ম বা বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেকের ওপর আঘাত হানবে। আরাকচি পশ্চিমা দেশগুলোর কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা এই ধ্বংসাত্মক ফঙ্ঘাত বন্ধে আরো জোরালো ভূমিকা পালন করেন। তার এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরাইলি হামলাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার এই বার্তার সাথে মার্কিন ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের পরিচালক জো কেন্টের পদত্যাগপত্রের একটি কপিও সংযুক্ত করেছেন। মঙ্গলবার পদত্যাগ করা জো কেন্ট তার চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, তিনি ‘বিবেকের তাড়নায়’ ইরানের বিরুদ্ধে এই চলমান যুদ্ধকে সমর্থন করতে পারছেন না। কেন্ট বরেছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কোনো ‘আসন্ন হুমকি’ ছিল না। একজন উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তার এমন স্বীকারোক্তিকে আরাকচি তার যুক্তির সপক্ষে একটি বড় প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং এই যুদ্ধকে অন্যায্য হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আব্বাস আরাকচি তার পোস্টে আরো বলেন, বর্তমানে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক সরকারি কর্মকর্তার মধ্যেই এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর জোরালো হচ্ছে। তিনি মনে করেন, ইরানের ওপর এই আক্রমণ যে কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত নয়, তা এখন বিশ্ব সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ বুঝতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরো অনেক সদস্যের উচিত জো কেন্টের মতো সাহসী পদক্ষেপ অনুসরণ করে এই অন্যায্য যুদ্ধের বিরোধিতা করা। আরাকচির মতে, যুদ্ধের এই বিস্তার রোধ করা না গেলে এর আর্থ-সামাজিক প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে।
বর্তমান সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতিতে ইরানের এই কূটনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ অভিযানে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, তখন তেহরান বিশ্ব জনমতকে নিজের পক্ষে টানার চেষ্টা করছে।