বাংলাদেশ হবে ইনসাফের

Printed Edition

ড. মোজাফফর হোসেন

এ বছর বাংলাদেশের মানুষের প্রথম চাওয়া একটি অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কেননা, গত দুই দশক বাংলাদেশে একটিও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হযনি। এই দুই দশকে যে নির্বাচন হয়েছিল তা ছিল নির্বাচনের নামে প্রহসন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্তু একটানা বাংলাদেশের সরকারে ছিল। এর মধ্যে ২০১৪ সালে সালে নির্বাচন হলো ভোট ছাড়া। সেই নির্বাচন অন্য রাজনৈতিক দল বয়কট করলে বিনাভোটে ১৫৩ আসনে আওয়ামী লীগ নিজেদের লোকজনকে সংসদ সদস্য হিসেবে ঘোষণা করল। এর পরের নির্বাচনও হলো ২০১৮ সালে ভোটার ছাড়া। ভোট হলো নির্বাচনের আগের রাতে সঙ্গোপনে; অর্থাৎ- দিনের ভোট রাতে হলো। এরপর হলো ২০২৪ সালে ডামি নির্বাচন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এসব নির্বাচন ছিল একটি কলঙ্কের স্মারক। কাজেই দুই দশক ধরে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছাড়াই বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের দুঃশাসন চলেছে। গণতন্ত্রের জন্য এটি ভালো নজির ছিল না। মানুষ আশা করে এ বছর একটি ভালো নির্বাচন হবে।

গত দশকগুলোতে ভালো নির্বাচন না হওয়ার জন্য এককভাবে দায়ী ছিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আরো যেসব গুরুতর অভিযোগ ছিল তার মধ্যে একটি হলো- আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে ভারতীয় অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের মিশনে কাজ করেছে। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে রাজনৈতিক যে মতাদর্শ তৈরি করেছে, সেটি বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করে না। আর এই মতাদর্শকে এগিয়ে নিতে সাপ্লিমেন্ট হিসেবে তৈরি করা হয়েছে নানান কিসিমের সাংস্কৃতিক সংগঠন। আবার এসব সাংস্কৃতিক সংগঠনকে এস্টাবলিশ করতে সামনে রাখা হয়েছে রবীন্দ্রনাথকে। সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যে পত্র-পত্রিকাও রয়েছে। এসব পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করে এক শ্রেণীর সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবী তৈরি হয়েছে। এরা সবাই মিলে ইতিহাসের নামে তৈরি করেছে মুুুুক্তিযুদ্ধের মিথ। এই মিথের প্রচার প্রসার ঘটাতে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে ভারত। অনেকেই বলেন, ভারত এসবের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। কিন্তু আমাদের তা মনে হয়নি; বরং ভারত বুদ্ধি সরবরাহ করেছে; সেই বুদ্ধি খাটিয়ে কৈ এর তেলে কৈ ভেজেছে আওয়ামী লীগ। অর্থাৎ- রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে এদেশের জনগণের পকেট কেটে টাকা বের করে আনা হয়েছে; সেই টাকা দিয়ে চলেছে মিথের প্রচার; আর সেই টাকার আরেকটি অংশ পাচার হয়েছে বিদেশে।

২.

আওয়মী লীগের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ ছিল পিলখানা হত্যাকাণ্ড; শাপলা চত্বরের গণহত্যাসহ অসংখ্য হত্যা ও গুম করে দেশে একটি আতঙ্কের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা। যে রাজত্বে অর্থ পাচার থেকে শুরু করে খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্বসহ নানান ধরনের অপরাধের সাথে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা ছিল। মানুষ যখন দেখল, আওয়ামী নেতাকর্মীদের মাধ্যমে দেশে নৈরাজ্য বেড়ে চলেছে তখন মানুষ আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিয়ে গভীর পর্যালোচনা করতে থাকল এবং খুঁজে পেল ভারতীয় ‘র’-কে পৃষ্ঠপোষকতা করার নানান দৃষ্টান্ত। দেশের সাধারণ মানুষ এই বিষয়টি চূড়ান্তভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে দেশে নির্বাচনহীনতার সংস্কৃতি দেখে। এরপরই মানুষের কাছে আওয়ামী লীগের সব দুরভিসন্ধি প্রকাশ হতে থাকে। মানুষ ভাবতে থাকে, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা তাহলে কি সঠিক ছিল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতকে সংযুক্ত করা কি ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল? ২৫ মার্চ শেখ মুজিব কেন আত্মসমর্পণ করল? ১৪ ডিসেম্বর ভারত কেন বুদ্ধিজীবী হত্যা করল? এসবের সাথে মুক্তিসংগ্রাম বিষয়ে নানান বিতর্কিত ইস্যু নতুন প্রজন্মের কাছে নতুনভাবে উত্থাপিত হতে থাকল। ধীরে ধীরে আসল সত্য উন্মোচিত হয়ে পড়ল এবং আওয়ামী লীগ থেকে নতুন প্রজন্ম মুখ ফিরিয়ে নিলো। শুরু হলো আওয়ামী লীগ প্রতিরোধের আন্দোলন। এর মধ্যে ছিল নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ও কোটা সংস্কার আন্দোলন। এসব আন্দোলনে যুক্ত ছিল স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। অথচ আওয়ামী লীগ ২০৪১ সাল পর্যন্তু সরকারে টিকে থাকার জন্য দেশের শিক্ষা কারিকুলামকে এমনভাবে সাজালো, যাতে নতুন প্রজন্ম আওয়ামী লীগ, শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা ব্যতীত আর কোনো বিকল্প খুঁজতে না চায়। কিন্তু দিন শেষে দেখা গেল, আওয়ামী লীগ এখানেও ব্যর্থ হলো এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের অগ্রভাগে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়পড়–য়া ছেলেমেয়েদেরই দেখা গেল।

৩.

কোটা ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সেই উত্তাল সময়গুলোতে ভিপি নুরুল হক নুর ছিলেন সম্মুখকাতারে। আওয়ামী লীগ হঠাও আন্দোলনের শুরুর দিকে নুরুল হক নুর ছিলেন সংগ্রামী ও খুব পরিচিত মুখ। আওয়ামী লীগ ভারতীয় আধিপত্যবাদের রাজনীতির সাথে যে ঘনিষ্ঠ, সে কথা জামায়াতে ইসলামী এবং নুরুল হক নুর ব্যতীত অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতার মুখে উচ্চারণ হতে দেখা যায়নি। এ জন্য নুরকে বিভিন্ন সময় নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে এবং ফাঁসিতে ঝুলতে হয়েছে জামায়াত নেতাদেরকে।

৪.

বলা যায় কোটা সংস্কারের যে আন্দোলন বাংলাদেশে সংঘটিত হয়েছিল তার পেট থেকে বেরিয়ে আসে আজকের তরুণ নেতৃত্ব- ওসমান হাদি, হাসনাত আবদুল্লাহ, নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, আসিফ মাহমুদ, মাহফুজ আলমসহ এনসিপি ও গণ অধিকার পরিষদ ও শিবির নেতৃবৃন্দ। কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নেয় সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনে। রাজাকার, আল বদর, জঙ্গি, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শব্দ দিয়ে ট্যাগ লাগানো কৌশল ছিল আওয়ামী লীগের ক্ষমতার উৎস। সেই শক্তি আর কাজে লাগল না। ছাত্র-জনতা এবার নিজেদের গায়ে রাজাকারের তকমা মেখে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলল। প্রবল প্রতিরোধের মুখে টিকতে না পেরে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর আগে দেশে গণহত্যা চালাল। নতুন বছরের প্রথম প্রহরেই এই গণহত্যার রায় কার্যকর দেখতে চায় বাংলাদেশের মানুষ।

৫.

জুলাই বিপ্লবের পর নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে একটি সরকার গঠিত হলো। নাম দেয়া হলো ইন্টেরিম বা অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকার আধাবিপ্লবী আধাসাংবিধানিক। সম্পূর্ণ বিপ্লবী সরকার গঠনের দাবি ছিল তরুণ নেতাদের। কিন্তু বৃদ্ধরা বাধা হয়ে দাঁড়ালেন সংবিধানের দোহাই নিয়ে। তরুণরা সংবিধান নতুন করে প্রণয়নের দাবি করলে সেই দাবিকেও কিছু বুদ্ধিজীবী জাতীয় সংসদের প্রসঙ্গ টেনে বললেন, সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতা রাখে কেবলমাত্র নির্বাচিত জাতীয় সংসদ। এসব যুক্তি তুলে ধরে বিপ্লবীদের স্বপ্ন পূরণকে বাধাগ্রস্ত করা হলো। আসল ব্যাপার হলো- বিপ্লবের তোড়ে কেবল শেখ হাসিনা ও তার সংসদ সদস্যরা পালিয়েছে ঠিক; কিন্তু ফ্যাসিস্ট রেজিমের সহযোগী সদস্য বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিক্ষক, উকিল, বিচারক, আমলা কেউ-ই তো পালায়নি। এরা বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজে লাগিয়ে ফ্যাসিজমকে টিকে রাখতে গোপনে নানা কৌশলে ভূমিকা রেখে চলেছে। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ কথাও তো ঠিক, গত ৫৩ বছর ভারতীয় আধিপত্যবাদের শিকড় এ মাটিতে এমনভাবে প্রোথিত যে, এটিকে সমূলে নষ্ট করতে সময় লাগবে। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বড় দু’টি দল ভারতের গোলামিতে অভ্যস্ত হয়েছিল। তার মধ্যে একটা দল পালিয়েছে আরেকটি এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। এই দলের সদস্য লোকজনই বলছে, দল আর শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শে পরিচালিত হচ্ছে না। বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যের কথা শহীদ জিয়া এবং খালেদা জিয়ার বক্তব্যে শোনা যেত; কিন্তু বর্তমানে এই দলের নেতাদের মুখে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কোনো কথাই শোনা যায় না; বরং জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ দফাগুলোতে তারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রেখেছে।

৬.

দেশ যখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে তার মধ্যেই দু’টি বড় ঘটনা ঘটে গেল। একটি শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড; আরেকটি তারেক জিয়ার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। প্রথম ঘটনা অর্থাৎ- ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে বুদ্ধিদীপ্ত তরুণ জুলাইযোদ্ধারা শঙ্কিত হয়েছে। আর দ্বিতীয় ঘটনায় ওসমান হাদি হত্যার শুটার ফয়সাল মাসুদকে জামিনে বের করে দেয়া আইনজীবীরা উজ্জীবিত হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, ‘ভারত নমস্য’ শর্তে না কি তারেক জিয়া দেশে ফিরেছে। এই কথার সত্য-মিথ্যা ভারতীয় গণমাধ্যম বাংলাবাজার পত্রিকার সাংবাদিকরা জানে। কিন্তু দেখা গেল গত ২৫ তারিখ গণসংবর্ধনা সমাবেশে তারেক জিয়া, আগত নেতাকর্মীদের স্মরণ করিয়ে দেয়ার প্রয়োজনবোধ করলেন না যে, ভারতীয় আধিপত্যবাদকে টিকিয়ে রাখার রাজনীতি বাংলাদেশে আছে এবং এটিকে প্রতিহত করা জরুরি। তবে তারেক জিয়া তার বক্তব্যে বলেছেন, বাংলাদেশকে নিয়ে তার একটি পরিকল্পনা রয়েছে। তারেক জিয়ার কী সে পরিকল্পনা সেটি তিনি পরিষ্কার করেননি। কিন্তু তিনি বলেছেন, নবী করিম সা:-এর দেখানো পথ ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চান। ওসমান হাদিসহ জুলাইযোদ্ধারাও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেন। তারেক জিয়ার এই ন্যায়পরায়ণতা যদি ঠিক থাকে তাহলে বাংলাদেশের মানুষ চাইবে বিএনপি জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ ধারাতে যে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে সেটি প্রত্যাহার করবে।

৭.

গণসংবর্ধনা সমাবেশে দেয়া তারেক জিয়ার এবারের বক্তব্য ছিল ব্যতিক্রম। যা বিএনপির অন্যান্য নেতার দিয়ে আসা বক্তব্যের সাথে মেলে না। তার বক্তব্যে সারমর্মটা ছিল কল্যাণরাষ্ট্রের দিকে ধাবিত। জনাব তারেক রহমান ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে দেশ গড়ার যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন তার জন্য দরকার হবে ন্যায়পরায়ণ রাজনৈতিক কর্মী। বিএনপি কি নিজের দলের ভেতরে সেই ন্যায়পরায়ণযোগ্য কর্মী সৃষ্টি করতে পেরেছে? দলীয় খুনখারাবি দেখে তো সেটি মনে হয় না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির অনেক সদস্যকেই বলতে শোনা গেছে, বড় দল হিসেবে বিএনপিতে একটু আধটু খুনখারাবি, চাঁদাবাজি, জবরদখল থাকবেই। নেতারা যদি এই মানসিকতা লালন করেন তাহলে তারেক জিয়ার ন্যায়পরায়ণতার রাষ্ট্র গড়া আদৌ সম্ভব হবে কি-না কে জানে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মানুষ চাইবে, এবারের নির্বাচনের পর বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার পুরাতন চরিত্র বদলাবে। হ