সৌদি আরবে হাউছিদের লোহিত সাগর অবরোধ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সঙ্ঘাতের নতুন বিস্তার
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হাউছি লোহিত সাগর সংলগ্ন নৌপথে সৌদি আরবের ওপর অবিলম্ব কার্যকর সমুদ্র অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ, তেলের বাজারে সরবরাহ ও বাণিজ্যিক যাতায়াতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে এই পদক্ষেপ।
গত মাসে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী চুক্তিটি ভেঙে যাওয়ার পর উত্তেজনা প্রশমনে তেহরান ও ওয়াশিংটন আবারো আলোচনায় ফিরতে পারে এমন সঙ্কেতের মধ্যেই হাউছিরা এই পদক্ষেপ নেয়। সংবাদমাধ্যম রয়টার্সে খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দর সাময়িকভাবে বাড়লেও কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনায় তা আবার নি¤œমুখী হয়। ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে মার্কিন হামলার বিপরীতে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মানদেব প্রণালী অবরুদ্ধ করতে হাউছিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল তেহরান। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের অন্তত সাত শতাংশ এই পথ দিয়ে রফতানি হয়, যা বন্ধ হলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সঙ্কট তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ দশ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। হাউছিদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইয়েমেনের ওপর সৌদি সরকারের আরোপিত ‘অন্যায্য অবরোধের’ জবাবেই তারা পাল্টা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এ নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যুদ্ধবিরতির কূটনৈতিক তৎপরতা
সহিংসতা থামানোর লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরানের কাছে ১০ দিনের এক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরই অংশ হিসেবে এক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো পাকিস্তান সফর করেছেন ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি। সঙ্ঘাত নিরসনে ওয়াশিংটনের সাথে আবারো মধ্যস্থতার ভূমিকা পালনে তিনি ইসলামাবাদকে অনুরোধ জানিয়েছেন। অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী মূল্যের চাপে থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক হামলায় তিন সেনাসদস্য প্রাণ হারানোর কথা উল্লেখ করে ইরানে হামলা অব্যাহত রাখার যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন।
তেলবাহী ট্যাংকার ও নৌযানে আঘাত
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, সঙ্ঘাতপূর্ণ ও অনিরাপদ পথ দিয়ে চলাচলের সময় দু’টি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটেছে। তবে সেই নৌযানগুলোর পরিচয় বা হতাহতের খবর স্পষ্ট করা হয়নি। পৃথক এক ঘটনায় ওমান উপকূলে এক বাণিজ্যিক জাহাজে অজ্ঞাত রকেটের আঘাত হানে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য সংস্থা ইউকেএমটিসি। জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ক্রু সদস্যরা নিরাপদে আছেন। আইআরজিসি একই সাথে জর্দানের আকাবা বিমানবন্দর, কুয়েতের আল-আদিরি ও আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি এবং সিরিয়ায় থাকা একাধিক মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
অন্য দিকে, যুক্তরাষ্ট্র সেন্টকম টানা নবম রাতের মতো ইরানের চাবাহার, বন্দর মাহশহরসহ বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে।
পানি শোধনাগারে হামলা
মরুভূমির দেশে অত্যন্ত জরুরি নাগরিক সেবা হিসেবে বিবেচিত কুয়েতের একটি পানি শোধনাগারে পরপর দুই দিন হামলার ঘটনা ঘটেছে। কুয়েত একে সিভিল অবকাঠামোর ওপর সরাসরি আক্রমণ বলে অভিহিত করেছে। ইরান পূর্বে অভিযোগ তুলেছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের একটি পানি শোধনাগার ধ্বংস করেছে, যার জবাবে তারা উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের শোধনাগারগুলোকে নিশানা করার হুমকি দেয়। যদিও মার্কিন প্রশাসন এই অভিযোগ স্বীকার করেনি।
কূটনীতির পথ উন্মুক্ত
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, আন্তর্জাতিক নৌপথ সচল রাখতে তারা সাময়িক সামরিক অভিযান চালালেও কূটনৈতিক সমাধানের দরজা সবসময় খোলা রেখেছেন। একইভাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, মধ্যস্থতাকারীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রস্তাব এসেছে এবং তারা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রেখেছেন। চলমান সঙ্ঘাতের ফলে ইতোমধ্যে ইরান ও লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
কুয়েত, বাহরাইন ও জর্দানে পাল্টাপাল্টি হামলা:
মার্কিন অভিযানের পাল্টা জবাবে ইরানও কুয়েত, বাহরাইন ও জর্দানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা জোরদার করেছে। ইসরাইলি বাহিনী জানায়, জর্দানের আকাবা বন্দর নগরীর দিকে ধেয়ে আসা একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র তারা নিষ্ক্রিয় করেছে; চলমান লড়াইয়ে এই প্রথম ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র অত দূর পর্যন্ত পৌঁছাল। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা বাহরাইনের সাখির বিমানবন্দর, সালমান বন্দরের মার্কিন নৌবাহিনীর টাস্কফোর্স হ্যাঙ্গার এবং কুয়েতের আরিফজান ঘাঁটিতে আঘাত হেনে মার্কিন পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে। একইসাথে আইআরজিসি এক বার্তায় জানায়, দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র ইরানের হাতে রয়েছে।
মার্কিন সেনাহতের তথ্য গোপনের অভিযোগ:
অন্য দিকে পেন্টাগন জর্দানে নিজেদের ঘাঁটিতে হামলায় দুই সেনা নিহত ও একজন নিখোঁজের কথা স্বীকার করলেও নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, একাধিক ইরানি হামলায় বহু মার্কিন সেনা আহত ও হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য গোপন রেখেছিল মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর। সঙ্ঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ১৭ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং চার শতাধিক আহত হয়েছেন।
সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা পেজেশকিয়ানের:
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান উদ্ভূত পরিস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করে দেশবাসীকে এই প্রতিরোধের প্রভাব ও ক্ষয়ক্ষতি মেনে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অপর দিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যুদ্ধ বিরতির কথা বলছে, অন্য দিকে অঞ্চলে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছেন।
জ্বালানি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব:
এই তীব্র ভৌগোলিক ও সামরিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসের দাম চার ডলারে পৌঁছেছে, যা আসন্ন মার্কিন নির্বাচনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।