কুরআন বোঝা সহজ
Printed Edition
তাইফুর রহমান
কুরআনুল কারিম চর্চার ক্ষেত্রে আমাদের মনের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে বাধা কাজ করে তা হচ্ছে- এটি বেজায় কঠিন। এটি পড়া আমাদের জন্য সহজ নয়। বিশেষ করে সাধারণ শিক্ষিত মানুষ মনে করে, কুরআন মাজিদ শুধু মাদরাসা থেকে পাস করা আলেম-ওলামারা পড়বে এবং তারা মানুষের সামনে বয়ান করে বুঝিয়ে দেবে এবং সে অনুযায়ী তারা আমল করবে। কুরআন-সুন্নাহর আলেম-ওলামারা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেন, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বিপুলসংখ্যক সাধারণ শিক্ষিত আল্লাহর বান্দা কুরআনের মোজেজা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ মহান রাব্বুল আলামিন কুরআন মাজিদে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন- ‘আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্য। অতএব কোনো চিন্তাশীল আছে কি?’ (সূরা আল কামার : ১৭, ২২, ৩২, ৪০)
যে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনুল কারিম অবতীর্ণ করলেন তিনি ঘোষণা দিলেন, আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্য। আর আমরা নিজেদের খেয়াল খুশিমতো মিথ্যারোপ করছি মহান রবের বাণীর ওপর। মূলত কুরআনকে কঠিন মনে করা কুরআনের সাথে প্রাথমিক বিদ্রোহ। কারণ কুরআনের প্রতিটি অক্ষরের ওপর ঈমান আনয়ন করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
এবারে আসুন কেন আমরা মুমিন হওয়ার পর ও এই রকম একটি ধারণা পোষণ করি, যেটি মূলত কুরআন মাজিদের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। প্রথমে আমাদের অন্তরে পরিপূর্ণ বিশ^াস রাখতে হবে, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেটিই বলেন, সেটি পরিপূর্ণ সত্য এবং এ ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেমনটি কুরআন মাজিদের প্রারম্ভেই বলেছেন-‘এ সেই কিতাব যাতে কোনোই সন্দেহ নেই। পথপ্রদর্শনকারী মুত্তাকিদের জন্য।’ (সূরা আল বাকারা-২)
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা বিশ্বাস স্থাপন করি কিন্তু আমরা যখন কুরআন মাজিদ পড়তে যাই তখন এটি বুঝি না। আর এই কারণে আমরা কুরআন মাজিদ থেকে নিজেদের দূরে রাখি। এটিই হচ্ছে বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে বাস্তবতা। তা হলে এই সমস্যার সমাধান কোথায়? প্রকৃতপক্ষে সমাধান আমাদের নিজেদের মধ্যে আর সেটি হচ্ছে- মানসিক দৈন্যতা। আমরা আমাদের জীবনের মূল্যবান সময়ের সামান্যতম অংশটুকু ও কুরআনের জন্য বরাদ্দ রাখতে রাজি নই। অথচ আমরা পৃথিবীর তাবৎ সব বই পড়ি এবং বুঝতে আমাদের কোনো সমস্যা হয় না। এর প্রধানতম কারণ হচ্ছে- আমরা এসব বই পড়া এবং বোঝার জন্য অনেক সময় দেই। কোনো কিছু বুঝতে সমস্যা হলে আমরা আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাই এবং না বোঝা পর্যন্ত আমাদের চেষ্টা বন্ধ হয় না। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, কুরআন মাজিদ পড়া ও বোঝার ক্ষেত্রে ঠিক তার বিপরীত ঘটনা ঘটে। আমরা এমনিতেই কুরআনের জন্য কোনো সময় দেই না, তার পরও কখনো পড়তে শুরু করলে কোনো রকম তিলাওয়াত করে মনে মনে অনেক তৃপ্তি অনুভব করি। ভাবখানা এ রকম যে, কুরআনের জন্য অনেক কিছু করে ফেলেছি কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে কুরআনের মূল বার্তা বুঝতে সক্ষম হই না। ফলস্বরূপ কুরআন বোঝার জন্য যে ধৈর্য প্রয়োজন সেটি দ্রুত হারিয়ে যায়, আর আমরা সর্বশেষ যে মন্তব্য করি তা হচ্ছে- কুরআন বোঝা অনেক কঠিন। অথচ কুরআন বোঝা এবং আনুগত্যের ক্ষেত্রে আমরা যদি ধৈর্যের পরিচয় দিতে পারি তা হলে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের পুরস্কার হিসেবে জান্নাত দান করবেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন- ‘এবং তাদের সবরের প্রতিদানে তাদের দেবেন জান্নাত ও রেশমি পোশাক।’ (সূরা আল ইনসান-১২)
দুনিয়ার সামান্য সফলতার জন্য আমরা যে পরিমাণ ধৈর্য ধারণ করি এবং আমাদের কর্মোদ্যম অব্যাহত রাখি সে পরিমাণ ধৈর্য আমরা ধারণ করি না কুরআনের জন্য, যেটি আমাদের পরকালে জান্নাত অথবা জাহান্নাম নির্ধারণ করবে। এটি হচ্ছে মনোজগতে একটি প্রতিকূল চিন্তার উন্মেষ, যার কারণে আমরা কুরআন অধ্যায়ন শুরুই করি এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা নিয়ে যে, এটি বোঝা সহজ বিষয় নয়। একশ্রেণীর মানুষ রয়েছেন যারা সাধারণ মানুষকে কুরআন বোঝার থেকে শুধু তেলাওয়াত করার বিষয়ে অনুপ্রেরণা দিয়ে থাকেন। যার কারণে তারা কুরআন বোঝার কোনো গুরুত্বই অনুভব করেন না। এ ধরনের চিন্তাভাবনা কুরআন বোঝার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। কুরআন মাজিদ হচ্ছে সমগ্র মানবজাতির জন্য পথনির্দেশনা।
‘রমজান মাস, যাতে নাজিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্য পথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টিকারী।’ (সূরা আল বাকারা-১৮৫)
কুরআন মাজিদ যেহেতু সব মানুষের জন্য হেদায়েত সেহেতু কোনো মানুষ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে এই হেদায়েতের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকে এবং কুরআনকে কঠিন মনে করে, তা হলে সেই দায়দায়িত্ব প্রত্যেককে আলাদাভাবে নিতে হবে। শয়তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাজেন্ডা হচ্ছে, সে যেকোনো মাধ্যমে মানুষকে কুরআন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন- ‘হে বনি-আদম! আমি কি তোমাদেরকে বলে রাখিনি যে, শয়তানের ইবাদত করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?’ (সূরা ইয়াসিন-৬০)
আমরা কুরআনকে কঠিন মনে করে নিজেদের এর চর্চা থেকে বিরত রাখছি। তার মানে হচ্ছে প্রকারান্তরে আমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করছি। কোনো কাজ সুচারুরূপে সম্পাদন করার জন্য পূর্বশর্ত হচ্ছে সেই বিষয় সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানার্জন করা। বান্দা হিসেবে আমরা যদি আমাদের মূল কাজ সম্পর্কে সচেতন থাকতে চাই তাহলে অবশ্যই আমাদের কুরআন মাজিদের মূলনীতিগুলো বুঝতে হবে। তা না হলে সবচেয়ে বড় যে সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে সেটি হচ্ছে- আমাদেরকে অন্ধভাবে অন্য মানুষকে অনুসরণ করতে হবে, যেটি সঠিক হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে। আমরা কেন জেনেশুনে সন্দেহের মধ্যে নিপতিত হবো? মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন দয়া করে মানুষকে বুদ্ধিমত্তা দিয়েছেন, যেটি প্রয়োগ করে কুরআন-সুন্নাহের মানসম্মত আলেমে দ্বীনের তত্ত্বাবধানে আমরা সহজেই কুরআন মাজিদের মূলনীতিগুলো বুঝতে পারি এবং সেই অনুযায়ী আমাদের জীবনকে সাজিয়ে তুলতে পারি। আমাদের এই সচেতনতার কারণে কেউ বিপথে পরিচালিত করতে পারবে না। যদি কেউ বিপথে পরিচালিত করতে চায় তাহলে আমরা নিজেরাই যাচাই করতে পারবো। কারণ অনেক মানুষ ও জিন আছে যারা মহান আল্লাহর নামে অনেক মিথ্যা কথা প্রচার করে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন- ‘আমাদের (জিন) মধ্যে নির্বোধেরা আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে বাড়াবাড়ির কথাবার্তা বলতো। অথচ আমরা মনে করতাম মানুষ ও জিন কখনো আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে মিথ্যা বলতে পারে না।’ (সূরা আল জিন : ৪-৫)
বর্তমানে মুসলিম জাতির বড় সমস্যা হচ্ছে তারা নিজেরা কুরআন চর্চা বাদ দিয়ে এমন সব কাজ করছে, কুরআন মাজিদের চেতনার সাথে যার কোনো মিল নেই; বরং কিছু ক্ষেত্রে এমন বাড়াবাড়ি হয় যা আল্লাহ তায়ালা এবং তার নাজিল করা কালামে হাকিমের ওপর মিথ্যারোপ করা হয়। মুসলিম হিসেবে সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে কুরআনের আলোয় নিজেকে আলোকিত করতে হলে কুরআনকে কঠিন মনে করে বসে থাকলে কখনোই সেই উদ্দেশ্য হাসিল হবে না; বরং দিন দিন কুরআনের ওপর নতুন নতুন মিথ্যা আরোপ করা হবে এবং মহান আল্লাহ তায়ালার অসন্তুষ্টির মধ্যে আমরা নিপতিত হবো। সব বাধা উপেক্ষা করে মানুষ যখন কুরআনের দিকে ফিরে যাবে ঠিক তখনই মহান আল্লাহ তায়ালা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন এবং কুরআনকে অনেক সহজ মনে হবে। মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআন যাদের জন্য অবতীর্ণ করেছেন তারাই যদি না বুঝলো তা হলে কুরআন নাজিলের সার্থকতা কোথায়। আর মহান আল্লাহ তায়ালা নিরর্থক কোনো কাজ করেন না।
লেখক : ব্যাংকার