ইরান যুদ্ধ : বৈশ্বিক সঙ্ঘাতের নতুন সমীকরণ
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ আজ ১১তম দিনে প্রবেশ করেছে। অল্প সময়ের মধ্যেই এই সঙ্ঘাত শুধু সামরিক লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এর প্রভাব বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোতে গভীর ছাপ ফেলতে শুরু করেছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রথমত, এই যুদ্ধকে অনেক বিশ্লেষক ওয়ার অব চয়েজ বা স্বেচ্ছায় বেছে নেয়া যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করছেন। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এমন কোনো শক্তিশালী যুক্তি আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যভাবে উপস্থাপিত হয়নি, যা এই যুদ্ধের অপরিহার্যতা প্রমাণ করে। ফলে যুদ্ধের ফলাফল নিয়েও এক ধরনের কৌশলগত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, বর্তমানে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে ইরান হারছে না, আবার ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রও নিশ্চিতভাবে জিতছে না।
দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষক স্কট রিটার-এর হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন এই যুদ্ধের খরচ প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে কিছু আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন, সঙ্ঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং এতে আরো আঞ্চলিক শক্তি যুক্ত হয়, তবে মোট ব্যয় ১০০ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এমন পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তৃতীয়ত, এই সঙ্ঘাতে দুই পক্ষের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যও লক্ষণীয়। যুক্তরাষ্ট্র তার ঐতিহ্যগত সামরিক শক্তি ও বৈশ্বিক সামরিক ঘাঁটির ওপর নির্ভর করে যুদ্ধ পরিকল্পনা সাজিয়েছে, যা অনেকটা শীতল যুদ্ধের সময়কার কৌশলের ধারাবাহিকতা। অন্যদিকে ইরান তাদের কৌশল নির্ধারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় রেখে।
এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থা। ১৯৭৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের তেল বাণিজ্য মূলত ডলারে পরিচালিত হওয়ার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন অর্থনৈতিক আধিপত্যকে শক্তিশালী করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক দেশ মনে করছে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এখন আগের মতো নেই; বরং অনেক ক্ষেত্রেই ইসরাইলের নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
চতুর্থত, যুদ্ধের সম্ভাব্য বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ সামরিক পদক্ষেপ। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র তার তথাকথিত প্রলয় দিনের বিমান ঊ-৬ই গবৎপঁৎু মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মোতায়েন করেছে। এই বিমানটি একটি উড়ন্ত কমান্ড সেন্টার হিসেবে কাজ করে এবং কৌশলগত পারমাণবিক বাহিনীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে। এমনকি ভূমিভিত্তিক কমান্ড সেন্টার ধ্বংস হয়ে গেলেও আকাশ থেকে পারমাণবিক কমান্ড চ্যানেল পরিচালনার সক্ষমতা এটির রয়েছে। ফলে এই পদক্ষেপ যুদ্ধের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
পঞ্চমত, যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যেই অঞ্চলটির সামাজিক ও মানবিক পরিস্থিতিতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। অধিকৃত আরব ভূখণ্ডে বসবাসকারী কিছু ইসরাইলি সেটেলারকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সঙ্ঘাতের প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে তাদের একটি অংশ ইসরাইল ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ষষ্ঠত, ইরানের পক্ষ থেকেও কৌশলগত বার্তা দেয়া হয়েছে। ইরানি নেতৃত্ব অন্যান্য আরব দেশগুলোকে আশ্বস্ত করেছে যে তাদের ভূখণ্ড যদি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার না করা হয়, তাহলে ইরানও সেই দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে না। তবে যেসব স্থানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বা সরঞ্জাম রয়েছে, সেসব জায়গায় হামলার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
এদিকে উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন বাস্তবতা বিবেচনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। তাদের মধ্যে রয়েছে- যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করা বিপুল অর্থ কিভাবে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা যায়, মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর নিরাপত্তা দিচ্ছে এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে কোনো সম্মিলিত নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে কি না। সপ্তমত, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের লক্ষ্যও সময়ের সাথে পরিবর্তিত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। সর্বশেষ ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’-এর কথা বলেছেন। তবে অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন লক্ষ্য অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন।
অষ্টমত, যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে পড়ছে। শিপিং বীমার খরচ প্রায় ৬০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ না হলেও জাহাজ চলাচল কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে তেল ও গ্যাসের দামে, যা ইতোমধ্যেই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনিশ্চয়তার কারণে অনেক এলএনজি সরবরাহকারী দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্থগিত করে স্পট মার্কেটের দিকে ঝুঁকছে-যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য উদ্বেগজনক।
সবশেষে, ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতির বিষয়টিও এই সঙ্ঘাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইরানি সমাজে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। শিয়া ঐতিহ্যে কারবালার শহীদির স্মৃতি, বিশেষ করে ইমাম হোসেনের আত্মত্যাগ, প্রতিরোধ ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে এই ধরনের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্মৃতি রাজনৈতিক দৃঢ়তাকে আরো শক্তিশালী করে তুলতে পারে।