স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তাকে সংযুক্ত করে আইওয়াশ
অর্থে বহাল তবিয়তে আওয়ামী সুবিধাভোগীরা
Printed Edition
সচিবালয় নির্দেশমালা লঙ্ঘন করে প্রধানমন্ত্রীর ওপর দায় চাপিয়ে কর্মকর্তাদের আর্থিক সুবিধা হ্রাসের চিঠির ঘটনায় স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তাকে সংযুক্ত করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। অর্থ বিভাগের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেনকে সংযুক্ত করা হলেও এর মূল পরিকল্পনাকারীরা বহাল তবিয়তে আছেন। ফলে মূল পরিকল্পনাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তাকে সংযুক্ত করাকে আইওয়াশ মনে করছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ওপর দায় চাপিয়ে কর্মকর্তাদের আর্থিক সুবিধা হ্রাসের চিঠি পাঠায় অর্থ মন্ত্রণালয়। চিঠিটি সচিবালয় নির্দেশমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সচিবালয় নির্দেশমালা ২০২৪ এর ১৫০ এ স্পষ্ট করে বলা হয়েছে ‘সরকারের কোনো আদেশ জ্ঞাপন করা হইতেছে এইরূপ পত্রে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছেন এইরূপ কোনো বিষয় উল্লেখ থাকিবে না। সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে এইরূপ উল্লেখ করিতে হইবে।’
এমন স্পষ্ট নির্দেশমালা উপেক্ষা করে অর্থ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মাসিক ৫০ হাজার টাকার পরিবর্তে ২৫ হাজার টাকা হারে নির্ধারণ ও স্কলারশিপ/ফেলোশিপ প্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ডেপুটেশন প্রদানের পরিবর্তে শিক্ষা ছুটি প্রদান সংক্রান্ত দু’টি চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীর ওপর দায় চাপানো হয়।
বিষয়টি নয়া দিগন্তে প্রকাশের পর নড়ে চড়ে বসে সরকার। এর পরদিন একটি চিঠিতে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর ওপর দায় চাপানো চিঠি দু’টি বাতিল করে আরেকটি চিঠি জারি করে। এরপর গত বুধবার রাতে চিঠির স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। কিন্তু ঘটনার পরিকল্পনাকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যান।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সাবেক অর্থসচিব এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ পালিয়ে গেলেও এখনো অর্থ মন্ত্রণালয়ে তার সিন্ডিকেট বহাল তবিয়তে রয়েছে। এসব কর্মকর্তারা তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগও রাখছেন। ফলে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এই বিতর্কিত চিঠি জারি করা হয় বলে মনে করছেন অনেকেই।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আর্থিক খাত ধ্বংসকারী সাবেক অর্থসচিব আব্দুর রউফ তালুকদারের অত্যন্ত বিশ^স্ত ও অনুগত হিসেবে তার সুপারিশে প্রথমে জ্বালানিসচিব এবং পরে অর্থসচিব হিসেবে পদায়ন করা হয় অর্থসচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদারকে। অর্থ বিভাগে যোগদান করার পর বক্তব্য বিবৃতিতে জয় বাংলার সাথে জয় বঙ্গবন্ধু বলা শুরু করে। ৫ আগস্টের আগে ফেসবুকে লাল প্রোফাইলের বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের প্রোফাইল কালো করার নির্দেশ দেয়া এই কর্মকর্তা এখনো অর্থসচিব হিসেবে বহাল রয়েছেন।
আট বছরেরও বেশি সময় ধরে অর্থ মন্ত্রণালয়ে বহাল আছেন অতিরিক্ত সচিব দিলরুবা শাহীন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের টোকাই এবং ভাড়ায় এসেছে বলে প্রচার করা এই কর্মকর্তা এখনও অর্থ মন্ত্রণালয়ে বহাল রয়েছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, জনপ্রশাসনের পদায়ন নীতিমালা ২০২২ এর ৪.৪ নীতি অনুসারে মন্ত্রণালয়/দফতরে কোনো কর্মকর্তার সাধারণ কর্মকাল হবে তিন বছর। কিন্তু এই নীতি উপেক্ষা করে আওয়ামী সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা তিন থেকে ছয় বছর পর্যন্ত বহাল থাকছেন। কোনো কর্মকর্তাকে এই মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করতে চাইলে বলা হয়, ‘অর্থ বিভাগ ফাইন্যান্স ব্যাকগ্রাউন্ড না হলে বাজেট বা ম্যাক্রোতে কাজ করা যায় না।’
কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ে সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ সিন্ডিকেটের যেসব কর্মকর্তা বহাল রয়েছেন তাদের মধ্যে অতিরিক্ত সচিব হাসানুল মতিন ড. মালিকা সায়েন্স ইনস্টিটিউট থেকে বিকম (পাস) কোর্সে পড়ালেখা করেছেন। মো: তারিকুল ইসলাম খান পড়ালেখা করেছেন আইন বিভাগে, অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান নিজেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের। অথচ নতুন পদায়ন করতে চাইলে ‘টেনিক্যাল এক্সাপারটাইস’ এর ধুয়া তোলেন এসব কর্মকর্তারা। বলা হয় অর্থের বিষয়ে বিস্তর জ্ঞান না থাকলে এই মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা যায় না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ে বহাল আছেন শেখ হাসিনার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামালের দীর্ঘদিনের একান্ত সচিব ড. ফেরদৌস আলম, দীর্ঘ ছয় বছর ধরে থাকা অতিরিক্ত সচিব সাহানা, দিল্লিতে দীর্ঘ ছয় বছর দায়িত্ব পালন করা যুগ্মসচিব মোহাম্মদ রাশেদুল আমীন, শেখ হাসিনার সচিব আব্দুল মালেকের পিএস গোলাম কবীর, শেখ হাসিনার আমলে ওয়াশিংটনে পদায়ন পাওয়া উপসচিব আশফাকুল নুমান, যুগ্মসচিব মেহেদী মাসুদুজ্জামান, মোহাম্মদ ফারুক-উজ-জামান, দীর্ঘ সময় শেখ মুজিবের পূজায় ব্যস্ত থাকা গোপালগঞ্জের আওয়ামী পরিবারের মোহাম্মদ ওয়ালিদ হোসেন প্রমুখ।