ইরানের মিসাইল উৎপাদন সীমিত ও দূরত্ব কমানোর শর্ত বাতিল
ওমানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু আলোচনা শুরু
Printed Edition
বিবিসি, আলজাজিরা ও হারেৎজ
বহু প্রতীক্ষার পর ইরানের সাথে আলোচনায় বসেছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল শুক্রবার ওমানের রাজধানী মাস্কাটে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি ও মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ আলোচনায় বসেন। যদিও তারা একে অপরের সাথে সরাসরি আলোচনা করেননি। এই আলোচনার আগে যুক্তরাষ্ট্র শর্ত দিয়েছিল ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি ছাড়াও ব্যালিস্টিক মিসাইল ও প্রক্সি বাহিনীকে সহায়তা নিয়ে কথা বলতে হবে। তবে ইরান এতে রাজি হয়নি।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ জানিয়েছে, ইরানের কথা মেনে ওই দু’টি বিষয় আলোচনা থেকে বাদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে গতকাল শুধু পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। হারেৎজকে একটি সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের মতো আঞ্চলিক দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের শর্ত মেনে নিয়ে আলোচনায় বসতে বলে। সূত্রটি বলেছে, শর্ত না মানলে ইরান মূলত আঞ্চলিক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। এ কারণে মার্কিনিদের বুঝিয়ে ব্যালিস্টিক মিসাইল ও প্রক্সি বাহিনীকে সহায়তার বিষয়টি বাদ দেয়া হয়।
সূত্রটি আরো বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো চায় না তাদের প্রতিবেশী দেশ ইরান প্রভাবশালী হোক। কিন্তু তারা একই সময় বুঝতে পারছে যদি ইরানের ওপর এখন কোনো হামলা হয় তাহলে এটি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য খারাপ হবে। তিনি জানিয়েছেন, ইরান কঠোর ভাষায় কথা বললেও; শেষ পর্যন্ত পরমাণু কর্মসূচি থেকে সরে আসবে। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি তারা এই শর্ত থেকে সরে এসেছে কি না।
কয়েক সপ্তাহ ধরে চলমান উত্তেজনা ও সামরিক সঙ্ঘাতের আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ বৈঠক শুরু হয়েছে।
এই পরোক্ষ আলোচনায় ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও জামাতা জারেড কুশনার।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানান, এই বৈঠকের লক্ষ্য হলো ‘পারমাণবিক ইস্যুতে একটি ন্যায্য, পারস্পরিক সন্তোষজনক ও সম্মানজনক চুক্তিতে পৌঁছানো।’ তবে তেহরানের স্পষ্ট আপত্তি সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বাইরের বিষয়গুলো আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করতে চাপ দিচ্ছে। ফলে আলোচনার প্রকৃত এজেন্ডা কী, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। বৈঠকের আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, ইরান ‘চোখ খোলা রেখে’ এবং ‘গত এক বছরের অভিজ্ঞতা’ সামনে রেখে কূটনৈতিক পথে এগোচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমরা সৎ উদ্দেশে আলোচনায় বসছি এবং আমাদের অধিকার নিয়ে দৃঢ় থাকব। প্রতিশ্রুতি অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সমান অবস্থান, পারস্পরিক সম্মান এবং পারস্পরিক স্বার্থ- এগুলো কোনো অলঙ্কারপূর্ণ বক্তব্য নয়; এগুলো একটি টেকসই চুক্তির অপরিহার্য ভিত্তি।’ এই আলোচনাকে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগে উত্তেজনা প্রশমনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই দেশ এখনো বিপরীতমুখী অবস্থানে থাকলেও, আলোচনা সফল হলে ভবিষ্যৎ সংলাপের জন্য একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করা এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ কমানোর দাবি জানিয়েছে। একই সাথে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন এবং নাগরিকদের প্রতি আচরণের বিষয়গুলো আলোচনায় আনার কথা বলছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে ইরান স্পষ্ট করেছে, আলোচনা কেবল তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এই মৌলিক মতপার্থক্যগুলো কতটা সমাধান হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, চুক্তিতে পৌঁছানো না গেলে ইরানে হামলা চালানো হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে হাজার হাজার সেনা, একটি বিমানবাহী রণতরী, যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করেছে। এর জবাবে ইরান জানিয়েছে, কোনো হামলা হলে তারা পাল্টা জবাব দেবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরাইলকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
ইসরাইল-ইরান যুদ্ধের পর এটিই প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৈঠক, যে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছিল। ইরানের দাবি, সেই হামলার পর তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
এই আলোচনাকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা এড়ানোর শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছেন। ইরান আশা করছে, আলোচনার বিনিময়ে তাদের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে, যা দেশটির অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে সরকারের বিরোধীরা মনে করেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে তা শাসকগোষ্ঠীর জন্য নতুন জীবনরেখা হয়ে উঠবে। আঞ্চলিক দেশগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা হলে তা ইরানে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা বা বৃহত্তর যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তারা সতর্ক করে বলেছে, শুধু বিমান হামলা দিয়ে ইরানের নেতৃত্বকে উৎখাত করা সম্ভব নয়। প্রাথমিকভাবে আলোচনা ইস্তাম্বুলে হওয়ার কথা থাকলেও, শেষ মুহূর্তে ইরানের অনুরোধে স্থান পরিবর্তন করে ওমানে নেয়া হয় এবং বৈঠকটি কেবল মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ইরান কঠোর হাতে দমন করার সময় থেকেই ট্রাম্প শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির ওপর হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিয়ে আসছিলেন। তবে সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করার লক্ষ্যেই তিনি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা উপস্থিতি বাড়িয়েছেন। বিমানবাহী রণতরী আবরাহাম লিঙ্কন ও একাধিক যুদ্ধজাহাজ ইরানের আশপাশে অবস্থান নেয়ার পর ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা অবশ্যম্ভাবী বলেই অনেকে ধরে নিয়েছিল। তবে পরে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক তৎপরতায় তেহরান ও ওয়াশিংটন আলোচনায় বসতে রাজি হয়।