বিদেশের শ্রমবাজার ফের চাঙ্গা
Printed Edition
- মডেল মেঘনার ঘটনায় সৌদি শ্রমবাজারে প্রভাব পড়বে না
- ব্যক্তি উদ্যোগে ভিসা সংগ্রহকারীদের সাক্ষাৎকার নেয়া শুরু
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত এবং ইউরোপের দেশ ইতালি, রোমানিয়াসহ বিশ্বের শ্রমবান্ধব দেশগুলোতে আবারো শ্রমবাজার চাঙ্গা হয়ে উঠছে। চলতি বছরের প্রথম মাসে শ্রমিক যাওয়ার হার গতানুগতিক থাকলেও এক মাস না যেতেই শ্রমসেক্টরে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে। তবে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর শীর্ষ পদের কর্মকর্তারা তাদের অধীনস্থ রুটিন কাজের ওপর জবাবদিহি বাড়ানো শুরু করলে পরের মাসেই আবারো শ্রমিক যাওয়ার ব্যবধান বাড়তে থাকে; অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় মার্চ মাসে ৪২ হাজারেরও বেশি কর্মী বিদেশে বৈধভাবে পাড়ি জমান।
এ দিকে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো কর্তৃপক্ষ বিদেশগামী কর্মীদের বহির্গমন ছাড়পত্র প্রদানে শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্যে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এর মধ্যে বিদেশ থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে যারা ভিসা সংগ্রহ করে আনছেন তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য নতুনভাবে বিএমইটিতে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর ফলে বিদেশে গিয়ে যেসব শ্রমিক সমস্যার মধ্যে পড়ছেন তাদেরকে আর বিড়ম্বনায় পড়তে হবে না বলে মনে করছেন অভিবাসন ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল শুক্রবার রাতে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা নিজের পরিচয় না প্রকাশের শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় মার্চ মাসে বিদেশে শ্রমিক বেশি গেছে। তিনি ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মার্চ মাসের কর্মী যাওয়ার ব্যবধান তুলে ধরে বলেন, ফেব্রুয়ারি মাসে সৌদি আরব, কাতার, রোমানিয়া, জর্দানসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমিক গিয়েছিল ৬২ হাজার ৪৪২ জন। আর মার্চ মাসে সেটি বেড়ে দাড়িয়েছে এক লাখ চার হাজার ৯৭৪ জনে; অর্থাৎ ৪২ হাজার ৫৩২ জন কর্মী বিভিন্ন দেশে বেশি গেছে। সম্প্রতি মডেল মেঘনা আলমের সাথে সাবেক একজন কূটনীতিককে জড়িয়ে যে ধরনের কথাবার্তা গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, এর ফলে কি বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরবে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে কি না জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা একবাক্যে বলেন, না। তিনি বলেন, সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বন্ধুপ্রতিম ও সুদীর্ঘ। আর মেঘনার সাথে যে ঘটনার কথা বলা হচ্ছে, সেটি ব্যক্তিগত একটা ইস্যু। এ ঘটনার সাথে শ্রমবাজারের কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, আমার ধারণা সৌদি আরব সরকার সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ-অদক্ষসহ নানা পেশার শ্রমিক আরো বেশি করে নেবে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে শ্রমিক গিয়েছিল ৯৭ হাজার ৮৬৭ জন। এর মধ্যে সৌদি আরবেই গিয়েছিল ৭৬ হাজার ৬১৮ জন। পরের মাসেই (ফেব্রুয়ারি) সেটি কমে দাঁড়ায় ৬২ হাজার ৪১৬ জনে। এর মধ্যে সৌদি আরবে গিয়েছিল ৪৪ হাজার ২৫৮ জন; অর্থাৎ সৌদি আরবে জানুয়ারি মাসের তুলনায় ফেব্রুয়ারি মাসে ৩২ হাজার ৩৬০ জন শ্রমিক কম গেছে। অভিযোগ আছে ব্যুরো থেকে বৈধভাবে ছাড়পত্র নিয়ে বিদেশ যাওয়ার পরও অনেকেই গিয়ে চুক্তি মোতাবেক কাজ পাননি। আকামা সমস্যাসহ বিভিন্ন সমস্যায় পড়ে কেউ কেউ খালি হাতে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো থেকে সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দূতাবাস বা হাইকমিশন থেকে ভিসার ক্ষেত্রে সত্যায়ন বাধ্যতামূলক করে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে এক অফিস আদেশ জারি হয়। এই নিয়ম চালুর পলে শ্রমিকদের বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হচ্ছিল বলে জনশক্তি ব্যবসায়ীদের একটি পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল। তবে ব্যবসায়ীদের সুবিধাবাদী একটি গ্রুপ দূতাবাস থেকে সত্যায়ন বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি মেনে নিতে পারছিল না। এর ফলে তারা মন্ত্রণালয় ও ব্যুরোর কর্মকর্তাদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করেন। একপর্যায়ে জনশক্তি ব্যুরো তাদের স্বচ্ছ প্রক্রিয়া থেকে পিছু হটতে বাধ্য হন বলে মনে করছেন জনশক্তি ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তারা। পরবর্তীতে ওই অফিস আদেশ সাময়িক প্রত্যাহার করা হলে সৌদি আরবসহ অনেক দেশে আবারো শ্রমিক যাওয়ার গতি বেড়ে যায়।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর একজন কর্মকর্তা গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মার্চ মাসে ৪২ হাজার শ্রমিক বেশি গেছে। সামনে আরো বাড়বে। তিনি বলেন, বিদেশগামী কর্মীদের হয়রানি বন্ধে জনশক্তি ব্যুরোর বহির্গমন শাখাসহ প্রতিটি সেক্টরেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য কঠোর মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা এখানে এসেছি শ্রমিকদের সেবা দেয়ার জন্য। তাদের হয়রানি কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না। যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর অর্পিত দায়িত্ব দেয়া রয়েছে, সেগুলো তারাই তাদের প্রয়োজনে নিশ্চিত করবেন। যদি কোনো ধরনের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাহলে ওই কর্মকর্তা-কর্মচারীকেই জবাবদিহি করতে হবে। এর ফলে জনশক্তি ব্যুরোর অভ্যন্তরে একটা শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে। এখন এটিকে ধরে রাখতে হবে।
এ দিকে বিদেশ থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভিসা সংগ্রহকারীদের সাক্ষাৎকার নেয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৯ এপ্রিল থেকে নতুন করে সাক্ষাৎকার পর্ব শুরু হয়েছে। সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত চলমান থাকে। এ সময়ের পর আর কোনো সাক্ষাৎকার নেয়া হবে না বলে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছে। ওয়ানস্টপ সার্ভিসে এসব ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেয়া হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ ওই বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের পর আর কোনো ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেয়া হবে না। অবশিষ্টদের সাক্ষাৎকার পরবর্তী কার্যদিবসে গ্রহণ করা হবে। উপস্থিত কর্মীদের সিরিয়াল টোকেন দুপুর ১২টা পর্যন্ত দেয়া হবে।
গতকাল বায়রার সাবেক একজন সেক্রেটারি নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশের শ্রমবাজারের অবস্থা খুব বেশি ভালো না। তার পরও যেহারে শ্রমিক বিদেশে যাচ্ছে তাতে এর ক্রেডিট কিন্তু অবশ্যই প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, সচিব থেকে শুরু করে বিএমইটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের। তাদের কারণেই হচ্ছে। তবে তিনি বলেন, আমি কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমা-বাড়া দিয়ে শ্রমবাজার বিচার করি না। আমি মনে করি সরকারের দক্ষ শ্রমিক তৈরি করে বিদেশে পাঠানোর অনেক সুযোগ রয়েছে। সেই দিকটায় সরকারের আরো বেশি মনোনিবেশ করা দরকার। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হচ্ছে সৌদি আরব। এই বাজারে যেন কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি না হয়, সেটিকে সরকারের পাশাপাশি আমাদের সব বায়রার সদস্যদের খেয়াল রাখতে হবে। এমনিতেই মালয়েশিয়া, দুবাই, ওমান, বাহরাইন, ইরাকসহ অনেক শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে আছে। নতুন করে যাতে আর কোনো শ্রমবাজার বন্ধ না হয়, সে দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।