আগ্রহ বাড়ছে আমেরিকান তুলা আমদানিতে
গুণগত মান ভালো হওয়ায় অপচয়ের হার কম
Printed Edition
আমেরিকা থেকে তুলা আমদানিতে আগ্রহ বাড়ছে দেশের টেক্সটাইল শিল্প মালিকদের। এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি অনেকাংশ কমে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এ দিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমেরিকার তুলার গুণগত মান অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক ভালো। এতে অপচয়ের হার অনেক কম। আমেরিকান তুলার অপচয় ১০ শতাংশের কম। একই সাথে ভারত থকে আমদানিকৃত তুলার অপচয় ১৮ শতাংশের বেশি। একই সাথে আমেরিকান তুলা থেকে যেসব পণ্য উৎপাদন করা হয় তার গুণগত মান যেকোনো দেশের তুলার তুলনায় অনেক ভালো বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ শুল্ক আরোপ করেছে তা কমাতে দেশটি থেকে আমদানি বাড়াতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশের তুলা আমদানির উৎস হিসেবে দেশটিকে চিন্তা করা হচ্ছে। তারা বলছেন, ট্রাম্প সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করছে। বাংলাদেশ অবশ্য আগে থেকেই শুল্ক দিয়ে রফতানি করছে। তবে সাম্প্রতিক আবার নতুন করে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। যদিও নতুন এ সিদ্ধান্ত ৩ মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। তবুও একটা সংশয় থেকেই যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র বেশি পরিমাণে তুলা রফতানি করতে চায়। দেশের ব্যবসায়ীরাও চেষ্টা করছেন এ বিষয়ে তারা যাতে কিছু সুবিধা আদায় করতে পারেন।
এ দিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়াতে দ্রুত গুদাম নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সাম্প্রতিক বাণিজ্য সচিব মো: মাহবুবুর রহমানের সভাপতিত্বে এক বৈঠকে এসব সুপারিশ উঠে আসে। বৈঠকে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব। এ লক্ষ্যে সরকার দ্রুত গুদাম নির্মাণ করবে। এ দিকে এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন যেসব পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ানো সম্ভব এবং তাতে রাজস্ব আহরণে বড় প্রভাব পড়বে না, এমন পণ্যের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। এসব পণ্যে শুল্ক হ্রাস বা শূন্য করার বিষয় বিবেচনায় রয়েছে। তারা বলছেন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে এককভাবে শুল্ক কমানো যাবে না। কারণ অন্য দেশগুলোও একই সুবিধা চাইবে। তাই এমন পণ্য চিহ্নিত করা হচ্ছে, যেগুলো শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকেই বেশি আমদানি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রিকালচারের (ইউএসডিএ) বৈদেশিক কৃষিসেবা বিভাগের (এফএএস) ‘কটন অ্যান্ড প্রোডাক্টস অ্যানুয়াল’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের বাজারে ব্রাজিল ৯ লাখ ৭০ হাজার ৪৮৭ বেল তুলা রফতানি করেছে। যা বাংলাদেশের মোট তুলা আমদানির ২০ শতাংশ। ভারত থেকে আমদানি করা হয় ৮ লাখ ৮৭ হাজার ৬০০ বেল ও অস্ট্রেলিয়া থেকে ৪ লাখ ১৬ হাজার ১৯৪ বেল। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৫৬ বেল আমদানি হয়, যা মোট বাজারের ৬ শতাংশ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দুই বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের তুলা আমদানি নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৪ সালে দেশের টেক্সটাইল শিল্প মালিকরা ২৫২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের আমেরিকান তুলা আমদানি করেছে। আগের বছরের তুলনায় ২৫ দশমিক ৫১ শতাংশ কম। মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ৩৩৭ মিলিয়ন ডলার মূল্যের আমেরিকান তুলা আমদানি করেছিল। এ দিকে ২০২২ সালে বাংলাদেশ ৪৬৯ মিলিয়ন ডলার মূল্যের তুলা আমদানি করেছে।
বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি বস্ত্র ও পোশাক শিল্প আমদানি করা তুলার ওপর নির্ভরশীল। শিল্পের অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিদের মতে, এই খাতের প্রয়োজনীয় তুলার প্রায় ১২ শতাংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা হয়। লিটল স্টার স্পিনিং মিলসের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, ভারতীয় তুলার তুলনায় মার্কিন তুলার দাম তুলনামূলকভাবে বেশি। একই সাথে মার্কিন তুলা পেতে সময়ও লাগে বেশি। তবে তিনি উল্লেখ করেন, ভারতীয় তুলা সস্তা হলেও এর অপচয়ের হার বেশি। অন্য দিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রাজিল থেকে তুলা আমদানি করতে প্রায় এক মাস সময় লাগে, অন্য দিকে স্পিনাররা ভারত থেকে যত দ্রুত সম্ভব তুলা সংগ্রহ করতে পারেন।
ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম ফিরোজ নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রতি বছর তুলার চাহিদা এবং রঙের পছন্দ পরিবর্তিত হয়। সাদা রঙের পোশাকের জন্য মার্কিন তুলাই সেরা। তিনি উল্লেখ করেন, গত দুই বছরে সাদা রঙের পোশাকের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে, যার কারণে মার্কিন তুলা আমদানি কমেছে।
রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান নয়া দিগন্তকে বলেন, অন্যান্য দেশের তুলার তুলনায় মার্কিন তুলার দাম বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতির কারণে স্পিনাররা দীর্ঘ সময় ধরে তুলা আমদানি করতে পারছেন না। তিনি বলেন, বাণিজ্য ঘাটতির ওপর ভিত্তি করে আমেরিকার প্রতিশোধমূলক শুল্ক বৃদ্ধির প্রভাব পূরণের জন্য মার্কিন তুলার ব্যবহার বাড়ানো উচিত।
এ দিকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যঘাটতি কমাতে মার্কিন তুলা আমদানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রণোদনা দেয়ার কথা বলছেন দেশের তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বৃদ্ধির সরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে দেশের পোশাক খাতে নিযুক্ত ব্যবসায়ীরা।
বিজিএমইএ সাবেক সভাপতি, শেলটেক গ্রুপ ও এনভয় টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান কুতুবুদ্দিন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, তুলার দাম বেশি হওয়ায় নগদ প্রণোদনা বা ভর্তুকি দিলেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি হারে তুলা আসতে শুরু করবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা রাখার জন্য গুদাম তৈরি করা হচ্ছে। এটা ভালো। তবে যুক্তরাষ্ট্রের তুলার দাম প্রতি বেলে ৪ সেন্ট (বাংলাদেশী মুদ্রায় ৫ টাকা ৪০ পয়সা) করে বেশি। ব্যবসায়ীরা এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বেশি ব্যবহার করে না। এই বাড়তি খরচ পূরণের জন্য সরকারের বিদ্যমান প্রণোদনা ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে তা সামঞ্জস্য করলে আমদানিকারকরা মার্কিন তুলা আমদানিতে উৎসাহী হবেন। তিনি বলেন, বর্তমান নগদ সহায়তার পরিবর্তে যদি সরকার আমাদের এই বাড়তি অর্থ মার্কিন তুলা আমদানির জন্য প্রণোদনা হিসেবে দেয়, তাহলে উদ্যোক্তারা সেখান থেকে তুলা আমদানিতে আগ্রহী হবেন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময় এবং মার্কিন শুল্ক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমদানি শুল্ক কমানো প্রয়োজন। বিশেষ করে কৃত্রিম তন্তু আমদানিতে উচ্চ শুল্ক একটি বড় সমস্যা। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাত, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কাস্টমসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাও আছে। তবে কিছু খাতে, বিশেষ করে এনবিআর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকার ইতিমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে।
এদিকে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ নয়া দিগন্তকে বলেন, উচ্চ সুদের হার, ইউটিলিটি চার্জ এবং বন্দরে প্রশাসনিক বিলম্ব ব্যবসায়িক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশকে সাধারণত সস্তা শ্রমের দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু যদি ভিয়েতনামের সাথে তুলনা করি, তাহলে তাদের পরিবহন, সুদের হার, লজিস্টিকসসহ সংশ্লিষ্ট খরচ অনেক কম। ফলে আমাদের উৎপাদন ব্যয় খুব বেশি পার্থক্য তৈরি করে না। তার ওপর আমাদের দেশে সুদের হার অনেক বেশি, গ্যাসের দাম তিন গুণ বেড়েছে, আর যেসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প স্থাপন করতে বলা হচ্ছে, সেগুলোরই সঠিক উন্নয়ন এখনো হয়নি।