আজ ৪ সিটি করপোরেশনে টিকাদান শুরু
২০ মের মধ্যে ২ কোটি শিশুকে দেয়া হবে ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যু ২
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
হামের উপসর্গে ও হাম সন্দেহে দেশে আরো দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে গত ২৪ ঘণ্টায়। এ দিকে হামের বিরুদ্ধে হার্ড ইমিউনিটি আনয়নের লক্ষ্যে আগামী ২০ মের মধ্যে দেশব্যাপী দুই কোটি শিশুকে টিকা দেয়া হবে। ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের এ টিকার আওতায় আনা হবে।
ইপিআই সূত্রে জানা গেছে, আজ রোববার সকাল ৯টা থেকে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ এবং বরিশাল ও ময়মনসিংহসহ চার সিটি করপোরেশনে শিশুদের হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে।
গত সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির উপ-পরিচালক ডা: মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, আজ রোববার সকাল ৯টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এরশাদের মাঠ এবং দক্ষিণ সিটির নগর ভবনে হামের জরুরি টিকা ক্যাম্পেইন শুরু হবে। দুই সিটির স্বাস্থ্য বিভাগ টিকা ক্যাম্পেইনের সার্বিক বিষয়টি দেখভাল করবে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা: এম.এ মুহিত উত্তর সিটিতে ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন করবেন।
এর বাইরে আজ বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনেও বিশেষ এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে। আজ থেকে আগামী ১২ মে পর্যন্ত একমাসে ডিএনসিসির হামের টিকাদান লক্ষ্যমাত্রা চার লাখ ৪৭ হাজার ২০৮ শিশু। দক্ষিণে চার লাখ ৬৫ হাজার ২২৭ শিশু। এ ছাড়া মসিকে ৬২ হাজার ৩০০ এবং বিসিসিতে ৪৫ হাজার ৩০০ শিশুকে টিকা দেয়া হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকার হাসপাতালগুলোতে হাম নিয়ে ভর্তি শিশুদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে।
এর আগে গত ৫ এপ্রিল দেশের ১৮ জেলার নির্বাচিত ৩০টি উপজেলায় হামের প্রথম ধাপের জরুরি টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। ক্যাম্পেইনে আসা হাম আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। পরে রোগের পরিস্থিতি ও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির ভিত্তিতে তা ধাপে ধাপে আরো বাড়ানো হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী হাম আক্রান্তদের ৮২ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এই বাস্তবতায় সরকার দেশের সব শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। করোনাকালে অব্যয়িত ৬০৪ কোটি টাকা দিয়ে হামের টিকা কেনার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এ দিকে গত শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হাম ও হাম সন্দেহে আরো দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময় নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ৮০ শিশু। এছাড়া সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে ৮৮৮ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। গত ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত সরকারি হিসাবে হামে ২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ১৪৫। ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে দুই হাজার ৪৮৯ শিশু। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামে আক্রান্তের সংখ্যা ১৪ হাজার ৩৮৫ শিশু। ভর্তি হয়েছে ৯ হাজার ৪৬৩ এবং সুস্থ হয়েছে সাত হাজার ২২ শিশু।
খুলনা ব্যুরো জানায়, খুলনা বিভাগে গত ৪৮ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত সন্দেহে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে খুলনায় একজন ও কুষ্টিয়ায় একজন। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৪৭ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য পরিচালক ডা: মো: মুজিবর রহমান এ তথ্য জানান।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দফতর সূত্র গতকাল জানায়, গত ১৫ মার্চ থেকে শনিবার পর্যন্ত বিভাগের ১০ জেলায় সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এক হাজার ৯৫ শিশু। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৭৯৯ জন শিশু। এ ছাড়া ৫১ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এই সময় সন্দেহজনক হামে মারা গেছে ৯ জন শিশু। বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কুষ্টিয়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে সর্বোচ্চ ৩৭৬ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এ সময় হাসপাতাল ছেড়েছে ২৮২ জন। সন্দেহজনক হামে মারা গেছে আটজন শিশু, এর মধ্যে হাম শনাক্ত হয় মারা যায় তিনজন। এ ছাড়া যশোরে ৯২, খুলনায় ৮৭, বাগেরহাটে ৩০, চুয়াডাঙ্গায় ১৩, ঝিনাইদহে ৩৩, মাগুরায় ৫৭, মেহেরপুরে ৩৩, নড়াইলে ২৬ এবং সাতক্ষীরায় ৫২ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
এ দিকে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে খুলনা বিভাগের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছে ৪৭ শিশু। এর মধ্যে কুষ্টিয়ায় ২৬, খুলনায় ৯, মাগুরায় পাঁচ ও নড়াইলে তিন, মেহেরপুরে তিন ও চুয়াডাঙ্গায় একজন রয়েছে।
সিলেট ব্যুরো জানায়, সারা দেশের মতো সিলেটেও বাড়ছে হাম আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে হামের উপসর্গ নিয়ে আরো এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্যাডিয়াট্রিক আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া সাত বছর বয়সী শিশুর নাম দিব্য। সে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের শাইলকান্দি এলাকার বাসিন্দা। সিলেট বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ডা: মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম জানান, শিশু দিব্য নিউমোনিয়া ও জ্বর নিয়ে ৫ এপ্রিল নগরীর শহীদ শামসুদ্দীন হাসপাতালে ভর্তি হয়। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হওয়ায় ওসমানীর আইসিইউতে নেয়া হয়। সেখানেই শুক্রবার তার মৃত্যু হয়। এ নিয়ে সিলেটে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুসংখ্যা দাঁড়ায় তিনজনে।
শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে একজনের শরীরে ল্যাব পরীক্ষায় হাম বা রুবেলা রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরো ১৯ জন।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট ৪১ জনের শরীরে হাম ও রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে হবিগঞ্জে সাতজন (দুইজন রুবেলা), মৌলভীবাজারে ১৩ জন, সুনামগঞ্জে ১১ জন এবং সিলেটে ১০ জন।
এ দিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে নতুন করে আরো ১৯ সন্দেহজনক রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১৩, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পাঁচ ও শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন ভর্তি হয়েছেন।
ময়মনসিংহ অফিস জানায়, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে হামের প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরো ২৭ শিশু ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসায় রয়েছে ৭৭ শিশু। প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতালে শিশু রোগীর চাপ বাড়লেও এখনো চালু হয়নি শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় আইসিইউ সুবিধা। ফলে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসায় চিকিৎসকদের ভরসা হয়ে উঠেছে ‘বাবল সিপ্যাপ’ পদ্ধতি।
গতকাল দুপুর ১টা পর্যন্ত হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন স্বজনরা। আইসিইউ সুবিধার অভাবে চিকিৎসকেরা স্বল্প খরচে তৈরি বাবল সিপ্যাপের মাধ্যমে অক্সিজেন সাপোর্ট দিচ্ছেন। সদর উপজেলার রাশেদা বেগম তার আট সন্তান নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। শিশুটির অবস্থা গুরুতর হলেও আইসিইউ না থাকায় বাবল সিপ্যাপেই চিকিৎসা চলছে। তিনি বলেন, আইসিইউ সুবিধা থাকলে চিকিৎসা আরো ভালো হতো। ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, পানিভর্তি প্লাস্টিক বোতল ও নলের মাধ্যমে তৈরি বিশেষ ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ যুক্ত করে শিশুদের নাকে অক্সিজেন দেয়া হচ্ছে।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা: মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, করোনা মহামারির সময় শিশুদের জন্য আইসিইউ ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হলেও তা এখনো চালু করা যায়নি। তবে সীমিত সামর্থ্যরে মধ্যেও চিকিৎসকেরা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
হাম পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার কাজ করছে :স্বাস্থ্য সচিব
বাসস জানায়, হাম পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য সচিব মো: কামরুজ্জামান চৌধুরী। বিশ্ব পারকিনসন দিবস উপলক্ষে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড হসপিটালে আয়োজিত সেমিনারে তিনি গতকাল এ কথা বলেন।
বর্তমান সময়ে দেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বাস্থ্য সচিব বলেন, গত চার বছর টিকাদান কর্মসূচিতে কিছুটা ছেদ পড়ায় বর্তমানে হাম নিয়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার আন্তরিকতার সাথে কাজ করছে। তিনি বলেন, বিগত সরকারের ভুলের কারণে বর্তমানে হামের প্রভাব দেশব্যাপী বেড়েছে। ঠিকমতো টিকাদান কর্মসূচি চলমান থাকলে এ সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো না। বর্তমানে আমরা ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের জন্য দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করছি।
এ দিকে বিশ্ব পারকিনসন দিবস উপলক্ষে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজে আলোচনা সভা ও এক বর্ণাঢ্য র্যালির আয়োজন করা হয়।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক ডা: মুহাম্মদ আব্দুল মোমেন খান। প্রধান অতিথি ছিলেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডা: এটিএম সোলাইমান কবির। আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডা: মুহাম্মদ আক্তার হোসেন।