সরকারকে ‘বিব্রত’ করতে চায় না বিএনপি

দলটি বলছে, বিভিন্ন পক্ষ নানামুখী এজেন্ডা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর ভর করেছে

মঈন উদ্দিন খান
Printed Edition

নির্বাচন ইস্যুতে রাজপথে নেমে সরকারকে এখনই ‘বিব্রতকর’ পরিস্থিতিতে ফেলতে চায় না বিএনপি। নির্বাচন ঠিক কবে হবে, সরকার নিজেদের দেয়া রোডম্যাপের মধ্যে নির্বাচন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে দলটির মধ্যে উৎকণ্ঠা ক্রমাগত বাড়তে থাকলেও, আরো কয়েক মাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। দলটির দায়িত্বশীল নেতারা বলেছেন, বিভিন্ন পক্ষ নানামুখী এজেন্ডা নিয়ে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের সরকারের ওপরে ভর করেছে। ফলে পরিস্থিতি থেমে থেমেই অস্থির হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় বিকল্প হতে পারে রাজনৈতিক মতৈক্যের ভিত্তিতে দেশকে নির্বাচনমুখী করা। নেতারা বলেছেন, বিএনপি চায় না এমন পরিস্থিতি তৈরি হোক, যেখানে কর্মসূচির মাধ্যমে নির্বাচনের দাবি আদায় করে নিতে হয়।

জানা গেছে, গত ১০ মে রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটি বৈঠকেও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ ইস্যুতে দলের অবস্থান নির্ধারণের পাশাপাশি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা তোলেন শীর্ষ নেতারা। সেখানে কোনো কোনো নেতা বলেন, নির্বাচন নিয়ে সরকার তালবাহানা করছে। আগামী নির্বাচনকে তারা কোন পথে নিয়ে যেতে চান, সেটি পরিষ্কার নয়। নানা এজেন্ডায় জড়িত হয়ে যাওয়ায় সরকার আসলে নির্বাচন দিতে পারবেন কি না, সেটা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন কেউ কেউ। নেতারা বলেন, সরকারের এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয়, যেখানে নির্বাচনের দাবিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে আবার রাস্তায় নামতে হয়। সেটা হবে খুবই বিব্রতকর। সরকার কোনো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়–ক, বিএনপি সেটা চায় না।

ওই বৈঠকের পরদিন স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘তিনি আশঙ্কা করছেন- গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে, গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথপরিক্রমায় যদি দীর্ঘায়িত পদক্ষেপ নেয়া হয়, কৌশল অবলম্বন করা হয়- হয়তো সরকার বিব্রত হতে পারে সামনে।’ আওয়ামী লীগকে আইনি উপায়ে নিষিদ্ধ করা নিয়ে দলের মহাসচিবের দেয়া বিবৃতিতেও বলা হয়, ‘নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ (রূপরেখা) ঘোষিত না হওয়ায় জনমনে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে, সে ব্যাপারে সচেতন হওয়ার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’ দলটি এ ধরনের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নির্বাচন ইস্যুতে সরকারকে একধরনের ‘বার্তা’ দিয়েছে বলে মনে করেন অনেকে।

আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের মধ্যে বিভিন্ন পক্ষের নানান দাবি এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন বিএনপি। দলটি মনে করে, অবনতিশীল ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নির্বাচনই একমাত্র পথ। দলটির নেতারা বলছেন, সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে সরকারের উচিত সঙ্কট উত্তরণে দ্রুত সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দিয়ে দেশকে নির্বাচনমুখী করা। সেই নির্বাচন চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই অনুষ্ঠান সম্ভব। এর অতিরিক্ত হলে সেটা হবে সময়ক্ষেপণ করা।

জানা গেছে, বিএনপি নির্বাচন ইস্যুতে এখনই এই সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো আন্দোলনে যেতে চায় না। দলটি সামনে আরো কয়েক মাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। আগামী দুই থেকে তিন মাস তারা সরকারের মতিগতি দেখবে। এরপর নির্বাচন নিয়ে সরকারের তরফ থেকে সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ না পেলে, সে ক্ষেত্রে দলীয় অবস্থানে পরিবর্তন আসতে পারে। তখন মাঠের কর্মসূচিতেও যেতে পারে দলটি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশের মানুষ গত ১৫-১৬ বছর ধরে ভোটাধিকার বঞ্চিত। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারা এখন ভোট দিতে উন্মুখ, এ জন্য তারা দ্রুত নির্বাচন চায়। রাজনৈতিক দলগুলোও দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু সরকার এখনো নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করেনি। রোডম্যাপ দিতে বিলম্ব হওয়ায় দেশে নানা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তাই সরকারের উচিত দ্রুত সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দিয়ে দেশকে নির্বাচনমুখী করা। তখন এসব দাবি-দাওয়া আর অগ্রাধিকার পাবে না। অন্তর্বর্তী সরকার তখন যার যা দাবি-দাওয়া আছে, নির্বাচিত সরকারের কাছে জানানোর আহ্বান জানাতে পারবে।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ ইস্যু থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেক্টর এখন প্রতিদিনিই নানা ধরনের দাবি-দাওয়া নিয়ে মাঠে নামছে। জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের আন্দোলনের মুখে গত সোমবার আওয়ামী লীগের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। এর পরপরই শুরু হয় আবাসন সঙ্কট নিরসনসহ তিন দফা দাবিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, যা চলমান রয়েছে। এর মধ্যেই গত মঙ্গলবার রাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে নিহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হল শাখা ছাত্রদলের সাহিত্য ও প্রকাশনাবিষয়ক সম্পাদক শাহরিয়ার আলম সাম্য। এসব ঘটনায় রাজনীতি ও রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এর বাইরে নির্বাচনের পাশাপাশি রাজনীতিবিদরা সোচ্চার রয়েছে রাখাইনে মানবিক করিডোর এবং চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশীদের হাতে তুলে না দেয়ার ইস্যুতে।

বিএনপি মনে করছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে শুরু করে সামাজিক, রাজনৈতিক তথা সামগ্রিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। থেমে থেমে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে। সংস্কারের প্রক্রিয়াও ধীরগতিতে এগোচ্ছে। একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে কোন সংস্কারগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আগে হওয়া উচিত, সরকার এখনো সেটি ঠিক করতে না পারায় সংস্কারের মূল লক্ষ্য অর্জিত হবে কি না, তা নিয়েও দলটি একধরনের শঙ্কার মধ্যে আছে। দলটি মনে করে, এমন অবস্থায় সরকারের উচিত, রাজনৈতিক দলগুলো যেসব সংস্কারে একমত হয়েছে, সেগুলোকে ফোকাস করা এবং সেগুলোর ভিত্তিতে সামনে অগ্রসর হওয়া।