উষ্ণতা : মামুন সরকার

Printed Edition
agdum-1
উষ্ণতা : মামুন সরকার

শীতের ভোর নামল খুব নরম করে। পুরো আকাশটায় কুয়াশার পাতলা পর্দা টেনে রেখেছে কেউ যেন। মাঠের ঘাসের ডগায় শিশির মতি চিকচিক করছে। দূরের খালের ধারে ফুটে থাকা শাপলার মাথায় জমেছে সাদা কুয়াশা? দেখলে মনে হয় সাদা তুলোর চাদরের মধ্যে ঢাকা পুরো গ্রামটা। গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু ঝরে পড়ছে ঘরের চালে টুপটাপ টুপ শব্দে। দূর থেকে ভেসে আসছে মোরগের ডাক। কুয়াশা ভেদ করে উঠোনে হাঁসের প্যাকপ্যাক ডানা ঝাপটানোর শব্দ। চোখের দৃষ্টি বেশি দূর দৃশ্যায়ন হয় না। যেন কারো মুখের ধোঁয়াটে

শীতার্ত নিঃশ্বাস উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে।

মাহিন ঢাকার ছেলে। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর দাদার বাড়িতে আসা তার জন্য বছরের সবচেয়ে আনন্দের সময়। ভোরে ঘুম ভাঙতেই কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে যখন সামনে এগোচ্ছিল, তখনই চোখে পড়ে সেই শীতে কাঁপা এক কিশোরকে। গাঁয়ের কিশোর। শীতের সকালে রাস্তার ধারে খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে কুয়াশার ভেতর নিজের নিঃশ্বাস দেখতে খুব পছন্দ করে। যেন নিজের ভিতরের গল্পটাই ধোঁয়া হয়ে বের হয়ে আসছে। দু’হাত বুকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন নিজের ভেতরের উষ্ণতা ধরে রাখতে চাইছে। মৃদু হিম বাতাসে তার শরীর কাঁপছে খটখট করে। গায়ে ছেঁড়া গামছা ছাড়া আর কিছুই নেই।

মাহিনের চোখে বিস্ময়। আরো কাছে যেতেই কিশোরটা সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, আর বলল, ভাইসাব, আপনেরে তো চিনলাম না। মাহিন হেসে বলল, আমি মাহিন। আমি দাদা শওকত আলীর নাতি। কালই এসেছি।

কিশোর একটু লজ্জার হাসি দিল, ও-ওহ? তাইলে আপনে শহর থাইকা আসছেন।

হ্যাঁ।

শীত বাড়ছিল। কথা বলতে বলতে মাহিন দেখল কিশোরের হাত দুটো নীলচে হয়ে গেছে। নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, তোমার কোনো গরম জামা নেই?

কিশোর মাথা নাড়ল।

না ভাইসাব। আমি গাঁয়ের ছেলে। বিহানবেলা একটু কষ্ট লাগে। সুরুজ উইঠা গেলে আর শীত লাগে না। কাজকামে ব্যস্ত হইয়া পড়লে শীত দৌড়ে পালায়। আইজ সুরুজটা কুয়াশার লাইগা মুখ ঢাইকা রাখছে।

আমরা খেটে খাওয়া মানুষ। আব্বা অটো রিকশা চালায়। কইছে হাতে টাকা হইলে একটা জ্যাকেট কিননা দিবো।

কিশোরের কণ্ঠে আশা আছে, কিন্তু বাস্তবতা আরো কঠিন। শীত সবার ঘরে নামে, কিন্তু সবার গায়ে সমান লাগে না। কিশোরের কথা শুনে মাহিনের বুকটা কেমন যেন করে উঠল।

হঠাৎ সেই কিশোর ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে মাহিনের নীল জ্যাকেটটা ছুঁয়ে বলল, এইটা খুব গরম মনে হয়। দাম কত ভাইসাব?

মাহিন দাম না বলে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার পছন্দ হয়েছে?

কিশোর কিছু বলল না। তার চোখে এক অদ্ভুত আকাক্সক্ষা, আর চাপা লজ্জা। পছন্দ হলেইবা কী?

এত সুন্দর জ্যাকেট কেনার সামর্থ্য তার বাবার নেই।

মাহিন আর দেরি করল না। গা থেকে জ্যাকেটা খুলে বলল, একবার পরো তো দেখি।

কিশোর অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। লাজে হাতে নিচ্ছিল না। মাহিন অনেকটা জোর করে হাতে তুলে দিলো। জ্যাকেট তার গায়ে দেওয়ার পর শীতের ঠাণ্ডা বাতাস তার গায়ে ধাক্কা দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু জ্যাকেটটা যেন উষ্ণতার একেবারে নতুন পৃথিবী।

একটু পর কিশোর জ্যাকেটটা খুলে দিয়ে বলল, ভাইসাব, এইটা খুব গরম। আমার গা তো গরম হইয়া গেছে। নেন, আপনের কাপড়। আরেকটু পরে রোদ উঠলে তো শীত কইমা যাইব।

এই সরল কথাটা মাহিনের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটল। কত কম চাওয়ার মানুষ। কত সহজে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। কষ্টটা প্রকাশ করতে চায় না। যেন তাদের জীবনটাই এমন।

মাহিন বলল, এটা তুমি রাখো। আমার আরেকটা আছে।

কিশোরের চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল। আবার কিছুটা লাজে মাথা নিচু হয়ে গেল। সে কাঁপা গলায় বলল, ভাইসাব, আপনে মানুষটা খুব ভালো। আমি এইটারে ধইরা রাখমু। এমুন গরম নরম জিনিস কোনকালে কিনতে পারমু না। বাড়ির উঠোনে ফিরে দাদাকে সব বলল মাহিন। দাদা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, শীতের কামড় কাপড়ে লাগে না, লাগে মানুষের দয়ার ওপর।

কিন্তু তুই আজ যে দয়া দেখাইলি তা বড় এক মানবতা। এ কাজ সবাই করতে পারে না। শীতের উষ্ণতা কেউ পায়, কেউ পায় না। আমি যা পারিনি তুই তা পূরণ করলি দাদা ভাই।

দাদার কথায় মাহিনের মনটা আলো হয়ে উঠল।

পরদিন ভোরে মাহিন আবার বের হলো। এবার কুয়াশা একটু পাতলা। কড়ই গাছের নিচে দেখা গেল সেই কিশোরকে। জ্যাকেটটা গায়ে দিয়ে খুশিতে লাফাচ্ছে। দু’জন ছেলেকে দেখাচ্ছে, দেখছস? এইটা শহরের কাপড়, খুব গরম। শওকত দাদার নাতি আমারে দিছে। কিশোরের মুখে এমন হাসি দেখে মনে হয় শীত গ্রামের উপর থেকে সরে গেছে। মাহিন কাছে গেলে কিশোর দৌড়ে এলো। ভাইসাব আইজ আমি আর কাঁপছি না। রাইতে ঘুমও ঠিকমতো হইছে।

মাহিন হাত বাড়িয়ে বলল, ভালো লাগছে দেখে। কিশোরের ছোট বোনটিকেও দেখা গেল। মেয়েটার গায়ে পাতলা শাড়ির টুকরো, শীতে কাঁপছে। এ দৃশ্য দেখে মাহিনের বুকটা আরেকবার মোচড় দিয়ে উঠল।

মাহিন পকেট থেকে পাঁচশ টাকার একটা চকচকে নতুন নোট কিশোরীর হাতে দিয়ে বলল, এটা রাখো বোন। আবার বেড়াতে আসি তোমার জন্যেও একটা ভালো জ্যাকেট নিয়ে আসব। এই টাকা দিয়ে কিছু একটা কিনে নিও।

কিশোরী কোনো কথা বলল না। চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক। মাহিন সেই আনন্দে নিজেকে ধন্য মনে করছে।

সন্ধ্যায় মাহিন দাদাকে বলল, দাদা, এখানে তো আরো বাচ্চারা শীতে কষ্ট পায়, তুমি চাইলে তাদের সাহায্য করতে পারো।

দাদা মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ রে। তা পারি। করব ইনশাআল্লাহ। তুই আমার চোখ খুইলা দিছস।

আমি ঢাকায় ফিরে স্কুলে একটা শীতবস্ত্র সংগ্রহ করব। বন্ধুদের বলব। প্রতি বছর করব।

দাদা হেসে মাথায় হাত রেখে বললেন, এই যে ভাবনা, এটাই মানুষের বড় হওয়া।

শেষ দিন সকালে গ্রাম ছাড়ার সময় সেই কিশোর দৌড়ে এসে বলল, ভাইসাব, একটা কথা বলি?

হ্যাঁ, বলো।

কিশোর খুব ধীরে, লজ্জা নিয়ে বলল, দুনিয়ায় শীতের চাইতে মানুষই বেশি ঠাণ্ডা।

কিন্তু আপনেরে দেইখা বুঝলাম, মানুষ আবার গরমও হইতে পারে।

মাহিনের চোখে পানি চলে এলো। ওকে জড়িয়ে ধরে বলল, একদিন তুমি বড় হবে। আর কাউকে না কাঁপিয়ে রাখবে তোমার উষ্ণতায়। পেছনে তাকিয়ে মাহিন দেখল, কুয়াশার ভোরে ছোট্ট সেই কিশোর দাঁড়িয়ে আছে। পাশে তার বোন। গায়ে লাল চাদর। কিন্তু এবার কেউ কাঁপছে না।

তাদের মুখে এমন এক হাসি, যা মানুষের হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে। আর মাহিন হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে বলল, সেদিন আমি শুধু জ্যাকেট দিইনি, একটা মানুষকে আবার মানুষ হওয়ার সাহস দিয়েছি।হ