দুই বছর পরও ফেরেনি ন্যায়বিচার : শহীদ আসাদুল্লাহর স্ত্রী

Printed Edition

হাবিবুল বাশার

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের ১৯ জুলাই দুপুরের নামাজের পর বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ। স্ত্রী ফারজানা আক্তার ভেবেছিলেন, স্বামীর ফিরতে হয়তো একটু দেরি হবে। কিন্তু সেই অপো পরিণত হয় জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও নির্মম প্রতীায়। তিন দিন ধরে হাসপাতাল, থানা, মর্গÑ সবখানে ছুটেও তিনি স্বামীর কোনো খোঁজ পাননি। পরে সিসিটিভি ফুটেজ, ডিএনএ পরীা আর দীর্ঘ দেড় বছরের অনুসন্ধানের পর জানতে পারেন, গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর পর আসাদুল্লাহকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার না পাওয়ার বেদনা আর দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎÑ এই দুই বাস্তবতা মোকাবেলাই আজ ফারজানা আক্তারের জীবনের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম।

দেড় বছর পর কবর শনাক্ত

আসাদুল্লাহর স্ত্রী ফারজানা জানায়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শুক্রবার উত্তরার বাসা থেকে আসরের নামাজের উদ্দেশে সাইকেল নিয়ে বের হন। রাত বাড়লেও তিনি না ফেরায় পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের সাথে নিয়ে শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। কিন্তু কোথাও তার সন্ধান মেলেনি। এর তিন দিন পর এক বন্ধুর মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের ২ নম্বর সড়কে এক ব্যক্তিকে গুলি করা হয়েছিল এবং তার একটি সাইকেল স্থানীয় এক দারোয়ানের কাছে রাখা আছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে সেই দারোয়ান ফারজানাকে একটি ছবি দেখান। ছবিটি দেখেই তিনি বুঝতে পারেন, গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিটিই তার স্বামী।

প্রত্যদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আসাদুল্লাহ সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পেছন থেকে তাকে গুলি করা হয়। গুলি তার ঘাড় ভেদ করে কণ্ঠনালীর কাছে আটকে যায়। এতে সাথে সাথে তিনি কথা বলার মতা হারিয়ে ফেলেন। কয়েকবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও পারেননি। অচেতন হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। স্থানীয় লোকজন তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে প্রায় তিন ঘণ্টা চিকিৎসা দেয়া হলেও পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি, কারণ তার সাথে কোনো পরিচয়পত্র ছিল না। পরে ১৯ জুলাই রাতেই তাকে বেওয়ারিশ রোগী হিসেবে ঢাকা মেডিক্যালে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ঢাকা মেডিক্যালে তিনি দুই দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরিবারের সদস্যরা ওই সময় একের পর এক হাসপাতাল, আইসিইউ, মর্গ, এমনকি বিভিন্ন থানায় খোঁজ করেও তাকে খুঁজে পাননি। ২৪ জুলাই যখন পোস্টমর্টেম করে ছবিগুলো দেখানো হয়, তখন দীর্ঘ সময় পানিতে ও সংরণে থাকার কারণে তার চেহারা এতটাই বদলে গিয়েছিল যে, স্ত্রী তাকে শনাক্ত করতে পারেননি।

ফারজানা বলেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিবার ঢাকা মেডিক্যালের সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে সম হন তিনি। সেখানে দেখা যায়, ১৯ জুলাই রাত ৯টার দিকে ক্রিসেন্ট হাসপাতালের একটি অ্যাম্বুলেন্সে আসাদুল্লাহকে ঢাকা মেডিক্যালে আনা হয়েছিল। পরে আরেকটি ফুটেজে দেখা যায়, বার্ন ইউনিটের দ্বিতীয় তলায় তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরিবার জানায়, ২২ জুলাই রাত ১টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এরপর ২৪ জুলাই হাসপাতাল কর্তৃপ তার লাশ আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে বেওয়ারিশ হিসেবে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করে। এরপর দীর্ঘ অনুসন্ধান, নথিপত্র সংগ্রহ এবং ডিএনএ পরীার মাধ্যমে প্রায় দেড় বছর পর নিশ্চিত হওয়া যায়, রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের ২৩ নম্বর সিরিয়ালের কবরটিই শহীদ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহর।

পরিবারের বর্তমান অবস্থা

স্বামীকে হারানোর পর থেকেই দুই সন্তানকে নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি ফারজানা আক্তার। তার এক ছেলে মাদরাসায় পড়ে, আর মেয়ে স্কুলে। তিনি বলেন, অর্থকষ্টের চেয়েও বড় কষ্ট হলো পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ না থাকা। তার ভাষায়, স্বামী ছিলেন জীবনের সবচেয়ে বড় ভরসা। সেই শূন্যতা কিছুটা হলেও বাবা পূরণ করছিলেন। কিন্তু দেড় মাস আগে বাবার মৃত্যুর পর তিনি আরো অসহায় হয়ে পড়েছেন। ফারজানা বলেন, এখন মানসিক, সামাজিক ও পারিবারিক সব দায়িত্ব একাই বহন করতে হচ্ছে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিদিনই নতুন উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটছে।

শহীদ পরিবারের বিচার দাবি

স্বামীর মৃত্যুর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন ফারজানা আক্তার। তিনি বলেন, দুই বছরেও তিনি কোনো শহীদের বিচার হতে দেখেননি। তাই আদৌ এই দেশে বিচার হবে কি না, তা নিয়েও তার মনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ফারজানা বলেন, আমার হাজবেন্ডকে যেভাবে প্রকাশ্যে গুলি করা হয়েছে, আমি চাই যারা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত, তাদেরও প্রকাশ্যে বিচার হোক। কোনো গোপন বিচার আমি চাই না।