লইয়ার্স কাউন্সিলের সংবাদ সম্মেলন

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সংসদীয় কমিটি বিলুপ্তের দাবি

Printed Edition
Font--------------4
বাংলাদেশ লইয়ার্স কাউন্সিলের সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন অ্যাডভোকেট শিশির মনির : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

সংসদ কোনো আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করতে পারে না; জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবেÑ এমন দাবি জানিয়েছেন আইনজীবীরা। একই সাথে তারা জাতীয় সংসদের ১২ সদস্যের সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটি বিলুপ্ত করার আহ্বান জানান। তাদের দাবি, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ওই কমিটির সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার নেই।

গতকাল বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের শহীদ শাফিউর রহমান অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ লইয়ার্স কাউন্সিল আয়োজিত ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি, গণভোট, জুলাই সনদ ও পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রায়: বর্তমান বাস্তবতা ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়।

এ সময় লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। পরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন, ব্যারিস্টার মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন ও ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান।

লিখিত বক্তব্যে মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, গত ১৩ জুলাই সংবিধান সংশোধনের জন্য জাতীয় সংসদে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তার দাবি, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী গণভোটের পর সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিধান রয়েছে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, একটি গণ-অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে বর্তমান সংসদ গঠিত হয়েছে। তার দাবি, এসব কার্যক্রমের আইনগত ভিত্তি ছিল জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ।

শিশির মনির বলেন, সরকারের প থেকে ওই আদেশকে শুরু থেকেই অবৈধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। কিন্তু কোনো আইন বা আদেশ সংবিধানসম্মত কি না, তা নির্ধারণের এখতিয়ার উচ্চ আদালতের। সংসদ বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে কোনো আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করতে পারে না। তিনি বলেন, মতার পৃথকীকরণ নীতি অনুযায়ী আইন প্রণয়ন, নির্বাহী কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের েেত্র সাংবিধানিক সীমারেখা রয়েছে। তার দাবি, কোনো আইন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়ার এখতিয়ার আদালতের।

শিশির মনির আরো বলেন, মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, তথ্য অধিকার এবং গণভোট-সংক্রান্ত কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। এসব আইন সংশোধন করে পুনঃপ্রণয়নের বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলে তিনি দাবি করেন। লিখিত বক্তব্যে তিনি ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন, মানবাধিকার পরিস্থিতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়েও বক্তব্য দেন।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের তিনটি প্রধান ল্য ছিল বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। নির্বাচন সম্পন্ন হলেও রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে। শিশির মনির বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ জনগণের প্রত্য সমর্থনের ভিত্তিতে প্রণীত হয়েছে এবং গণভোটের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাবের পে জনসমর্থন নিশ্চিত করা হয়েছে। তার মতে, জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার ভিত্তিতেই পরবর্তী সাংবিধানিক সংস্কারকার্যক্রম পরিচালিত হওয়া উচিত।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, তারা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, আইনজীবী হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের আইনগত অবস্থান ব্যাখ্যা করতে সংবাদ সম্মেলন করছেন। তিনি বলেন, সংসদে সরকারি দলের প থেকে বলা হচ্ছে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অসাংবিধানিক এবং শুরু থেকেই বাতিলযোগ্য। তাদের বক্তব্যের আইনগত ব্যাখ্যা দিতেই এই আয়োজন করা হয়েছে।

তাজুল ইসলাম বলেন, সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সব মতার মালিক জনগণ। তার ভাষ্য, জনগণের অভিপ্রায়ের সর্বোচ্চ প্রকাশ হচ্ছে সংবিধান। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। সেই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করা হয় এবং গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সমর্থন নেয়া হয়। তিনি বলেন, ‘জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে যে প্রক্রিয়া হয়েছে, সেটার আইনগত কাভারেজ দেয়ার জন্যই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ করা হয়েছে।’ তাজুল ইসলাম বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সমর্থন পাওয়া কোনো আইনকে সংসদ বা সরকার নিজেদের সিদ্ধান্তে অকার্যকর করতে পারে না।

তাজুল ইসলাম বলেন, কোনো আইন অসাংবিধানিক কি না, তা নির্ধারণের মতা কেবল সুপ্রিম কোর্টের। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কোনো আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হলে বিচার বিভাগের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়বে। তিনি বলেন, ‘যদি মনে করা হয় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অসাংবিধানিক, তাহলে আদালতে যেতে হবে। সেখানে যুক্তি উপস্থাপন করতে হবে। আদালত সিদ্ধান্ত দেবেন।’ তার ভাষ্য, একটি আইনকে বাতিল বা অসাংবিধানিক ঘোষণা করার সাংবিধানিক প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সংসদ বা সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, জনগণ সংবিধান সংস্কারের পে ম্যান্ডেট দিয়েছে এবং জুলাই জাতীয় সনদের মূল ল্যও সংবিধান সংস্কার। তিনি বলেন, ‘আমরা সংবিধান সংস্কারের সাথে একমত। আমরা সংস্কারের দাবিই জানাচ্ছি। জুলাই সনদের স্পিরিটও এটাই।’

তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ভিত্তিতেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এটি কার্যকর আইন হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘এই ভ্যালিড পিস অব ল-কে যদি সংসদ সদস্যরা বা সরকার অমান্য করেন, তাহলে আইনের শাসন কোথায় থাকবে?’ তার ভাষ্য, কোনো আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার মতা আদালতের। আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো আইনকে অকার্যকর করার চেষ্টা করা হলে সাংবিধানিক কাঠামো দুর্বল হবে। তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক সম্পর্ক বা অবস্থান জনগণের স্বার্থের ওপর নির্ভর করবে। যারা জনগণের স্বার্থের বিপে অবস্থান নেবে, জনগণ তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

ব্যারিস্টার মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের মাধ্যমেই অন্তর্বর্তী সরকারের আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বর্তমান সংসদ গঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, ওই আদেশে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিধান ছিল। তার মতে, মৌলিক সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য ওই পরিষদই উপযুক্ত ফোরাম। বেলায়েত হোসেন বলেন, সংসদের ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়ে সুপারিশ করার এখতিয়ার রাখে না।

তিনি বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের আলোচনার মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব তৈরি হয়েছে। অনেক বিষয় আইন সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলেও মৌলিক কাঠামোর বিষয়গুলো সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে বিবেচনা করা উচিত। বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সংসদীয় বিশেষ কমিটি বিলুপ্ত করা উচিত।’

এক প্রশ্নের জবাবে ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান বলেন, সংবাদ সম্মেলনের উদ্দেশ্য জনগণের মধ্যে সংবিধান ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা। তিনি বলেন, সংবিধানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। আইনজীবীরা বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করছেন, যাতে জনগণ আইনগত অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান বিভ্রান্তি দূর হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের সভাপতি অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার, সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, অ্যাডভোকেট সাবিকুন নাহার মুন্নী, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন লিপুসহ আরো অনেকে উপস্থিত ছিলেন।