হাসিনার পালানো নিয়ে রাজনীতিতে ধূম্রজাল
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
অত্যন্ত সুকৌশলে ভারতে হাসিনার পালানো নিয়ে ধুম্রজাল সৃষ্টি করে রাজনীতিতে তার ফিরে আসা ও গ্রহণযোগ্যতার বয়ান তৈরির অপচেষ্টা চলছে। এর বিপরীতে পাল্টা কোনো কার্যকর বয়ান না থাকায় বিষয়টি নিয়ে জনমনে ব্যাপক সন্দেহ দানা বেঁধেছে। হাসিনা পালিয়েছে/হাসিনা পালায়নি/হাসিনা পালায় নাÑ এই তিন ধরনের ধারাবাহিক সন্দেহের চক্রে জনমনে ভাবান্তর দেখা দিয়েছে। এর আগে রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন হাসিনার পদত্যাগপত্র তার কাছে নেই। এখন বলা হচ্ছে পদত্যাগ করেননি বলে সংবিধান অনুযায়ী তিনি এখনো দেশের প্রধানমন্ত্রী। হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল দিয়েই ভারত আশ্রয় দিয়েছে। উনি কোনো এ্যাসাইলাম চাননি। শরণার্থী হিসেবে কোনো মর্যাদা দেয়া হয়নি। অন্য দিকে হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে লিবিয়ার মতো দেশ খণ্ড বিখণ্ডের হুঙ্কার দেয়া হচ্ছে। আর এসব ধুম্রজাল তৈরি করা হচ্ছে বাকস্বাধীনতার নামে।
ধুম্রজালের গোয়েবলস পদ্ধতি : মিথ্যা বারবার বললে সত্য হয় না, কিন্তু বিভ্রান্তির বেড়াজাল তৈরি করা যায়। বিশৃঙ্খলা থেকে সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়া যায়। হাসিনাকে নিয়েও সেই অপচেষ্টা হচ্ছে। রাজনৈতিক সচেতনতা ও স্মরণের অভাবে এভাবেই ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের ফাঁদ পাতা হয়। শুধু হাসিনার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা নয়, এ ধরনের অন্যান্য মামলার নিষ্পত্তির গতি হারিয়ে গেছে। অর্থপাচারকারী ও খুনিদের সম্পদ জব্দ করে কার্যকরব্যবস্থা গ্রহণে ভাটা পড়েছে। গুজব হলেও সুকৌশলে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে যে সরকারের সাথে হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সমঝোতা হলেও হতে পারে। সরকার প্রধান সংসদে বলেছেন ফ্যাসিবাদ প্রশ্নে বিরোধীদলের সাথে ঐক্য অটুট থাকবে। সংসদের বাইরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তথ্য উপদেষ্টা ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করেছেন মাত্র। এর জন্যে যে পাল্টা বয়ান তৈরি করে জনমনে ভুল বয়ান বিভ্রান্তি দূর করার কোনো উদাহরণ দেখা যাচ্ছে না। পাল্টা বয়ান তৈরি তো দূরের কথা, টেলিভিশন টকশোতে যখন সরকারি দলের একজন নারী সংসদসদস্য বলেন, ‘আমি তো চাই হাসিনা দেশে ফিরে আসুক’ এবং তিনি এর কোনো যুক্তিসই বক্তব্য দিচ্ছেন না তখন দর্শক ও শ্রোতাদের মনে ধারণা তৈরি হচ্ছে হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে মতাসীন দলের সায় থাকলেও থাকতে পারে।
সরকার প্রধানের সিগন্যাল মিস হচ্ছে : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে যথার্থই বলেছেন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ঐক্য ধরে রাখতে হবে। কিন্তু পাঁচটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা যখন কারাগারে আটক ফ্যাসিবাদের দোসর ও ফ্যাসিস্ট সরকারের বৈধতা উৎপাদনকারী চিহ্নিত সাংবাদিকদের মুক্তি চাচ্ছে তখন এসব সংস্থাগুলোকে কোনো কার্যকর বার্তা পাঠাতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ব্যর্থ হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে ফ্যাসিস্ট সরকারের লেজুরবৃত্তি করা মিডিয়া নেতৃবৃন্দকে কিভাবে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে এর কোনো নজির তুলে ধরা হচ্ছে না। সরকার প্রধানের রাজনৈতিক দর্শনের উপলব্ধি নিয়ে সরকারি মিডিয়া কর্তাব্যক্তিদের অবহেলা ও ভয়ঙ্কর ধরনের দিনগুজরানের পাশাপাশি ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিস্ট সরকারের অবশিষ্টাংশ মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা ফের পুরোদস্তুর মাঠে নেমেছে। তাদের সাথে যোগ দিয়েছে আওয়ামী লীগ সমর্থক পেশাজীবীরা। ধীরে ধীরে তারা কলেবর বৃদ্ধি করে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসিনার বিচারে আদালতের বৈধতা ও এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তাদের এ অপব্যাখ্যা আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ হিসেবে হাসিনার উক্তির প্রতিধ্বনি মাত্র। কিন্তু এর বিপরীতে টিভি টকশো, মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপির সংসদ সদস্য, নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি বা সমর্থকদের কোনো পাল্টা বক্তব্য দিতে দেখা যায় না। খোদ সরকারি মিডিয়া বিটিভি, বাসস ও একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকে যারা মিডিয়ায় অংশ নেন তারা পর্যন্ত নিশ্চুপ। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিএনপির আশীর্বাদ নিয়ে যারা বিভিন্ন টেলিভিশন ও মিডিয়ায় দায়িত্বপূর্ণ পদে বসে গেছেন তাদেরও ফ্যাসিস্ট অনুসারীদের বিপরীতে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশল গ্রহণ করে সত্যিকার তথ্য তুলে ধরতে অনীহা দেখা যাচ্ছে। নিশ্চিত চাকরি ও বেতন ভাতাসহ নানা সুবিধায় দিনগুজরানকেই তারা প্রাধান্য দিচ্ছেন। তারা ভাবছেন, ‘বেশ তো যাচ্ছে, এভাবেই দিন যাক না, ভবিষ্যতে কোনো সরকার মতায় আসে বলা মুশকিল।’
এ দিকে পাল্টা বয়ানের অভাবে জনমনে ফ্যাসিবাদ নিয়ে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে ঐক্য অটুট রয়েছে কি না সে নিয়ে অস্বস্তি ও সন্দেহ বাড়ছে। অন্য দিকে বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নামে এভাবেই চলছে হাসিনাকে রাজনীতিতে ফের গ্রহণযোগ্য করে ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার মতো নির্বিচার অপব্যাখ্যা।
বাধ্য হয়ে আদালতের হুঁশিয়ারি : তীব্র ােভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম নয়া দিগন্তের সাথে একান্ত আলাপচারিতায় জানিয়েছেন, বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজে গণহত্যাকারীদের পে চালানো এ ধরনের প্রচার-প্রচারণা ও অনুষ্ঠানমালার ওপর কড়া নজরদারি ও পর্যবেণ চলছে। আপে করে তিনি বলেন, এতগুলো মানুষ যে শহীদ হলো, তা নিয়ে তাদের ইউটিউব চ্যানেলে কোনো নিন্দা বা কথা বলতে আমরা খুব একটা দেখি না। নিরপে তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে এ জাতীয় ন্যারেটিভ তৈরি হলে মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা যায়, যা চলমান বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
আদালতের পর্যবেণই কি যথেষ্ট : জুলাই আন্দোলনের শহীদদের নিয়ে অত্যন্ত দায়িত্বহীন ও নির্মমতার পরিচয় দিয়ে আওয়ামী সমর্থক অভিনেত্রী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও পেশাজীবীরা নিরন্তর বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। গোয়েন্দা সংস্থা থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প থেকে এদের বিরুদ্ধে কোনো কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় এ ধরনের অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি জনমনে ক্রমেই ােভ বাড়াচ্ছে। পুলিশ কি চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপোয় বসে আছেন? জনমনে এ ধরনের প্রশ্ন উদ্রেকের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের একজন সাবেক উপদেষ্টার আত্মীয় হওয়ার কারণেই কি অভিনেত্রী শাওন আহমেদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তার হোমডিস্ট্রিক্টে লুকিয়ে থাকা আওয়ামী কর্মীদের সশস্ত্র মিছিল বের করায় তাদের অভিনন্দন দিয়ে ান্ত থাকেনি শাওন, উপরন্তু ফ্যাসিস্ট সরকার প্রধানের সরাসরি হুকুমের পর গুলিতে শত শত মায়ের বুক খালি হলেও জুলাই আন্দোলন নিয়ে ‘সিডিআই’ মন্তব্য করে তিনি তার চরিত্রের একটি অত্যন্ত কুৎসিত দিক উন্মোচন করেছেন। জুলাই লিখতে গেলেই তার কলমে ‘সিডিআই’ এসে যাচ্ছে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন। তারপরও শাওনকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। মহসিন রশিদের মতো আইনজীবী হাসিনা দেশে ফিরলে লিবিয়ার মতো দেশ খণ্ড বিখণ্ড হয়ে যাবে বলে হুঙ্কার দেন অথচ তাকে কোনো কৈফিয়ত তলব করছে না কেউ।
কৈফিয়তের অভাবেই জনমনে ঘোর সন্দেহ : সরকারের সাথে সমঝোতা না হলে ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে কেন হাসিনা দেশে ফিরতে চায়। কেন আদালতে আত্মসমর্পণের কথা বলে। নিরাপত্তা ও মতায় যাওয়ার রাজনীতি করার আশ্বাস না পেলে হাসিনা দেশে ফেরার সাহস কিভাবে পায়। তাকে তো নিরাপদে দিল্লিতে পাঠানো হয়েছিল। ফের নিরাপদেই দেশে ফেরার কথা বলছেন। মতা ছাড়া বিরোধী দলে রাজনীতি করার নিশ্চয়তা না পেলে কিভাবে দেশে ফেরার সাহস করছেন। আদালতে জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লা, এটিএম আজহারুল ইসলাম, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার রায় পরিবর্তনের নজির টেনে আওয়ামী সমর্থকরা বলছেন হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ভবিষ্যতে আদালতে পরিবর্তন সম্ভব। অথচ অপপ্রচারের পাল্টা জবাব হিসেবে কেউ বলছেন না জামায়াত নেতারা হাসিনার মতো শত শত মানুষকে গুলি করে হত্যার হুকুম দেয়নি, গুম করে নদীতে ভাসিয়ে, গণকবর দিয়ে বা আয়নাঘরে আটক করে রাখেনি। বরং বলা হচ্ছে হাসিনা ফিরে আপিল করার সুযোগ পাবেন ইত্যাদি।
বিশৃঙ্খলাই হাসিনাকে ফিরিয়ে আনবে : এমন আশা আওয়ামী নেতাকর্মীদের। যেকোনো ইস্যুকে বিশৃঙ্খলায় পরিণত করতে চায় বলেই তাদের পে টকশো বক্তারা অব্যাহতভাবে বলে যাচ্ছেন দেশের পরিস্থিতি আগের মতো নেই। সংবেদনশীল মনোভাব নিয়ে সরকার প্রধান ও বিরোধী দল এ অপকৌশলের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারলে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্য ধরে রাখা যাবে। শিামন্ত্রী শিার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ দিয়ে পচা শামুকে পা কেটে যাওয়ার উদাহরণ সৃষ্টি করলেন তা লুফে নিতে কোনো কার্পণ্য দেখা যায়নি। তার পদত্যাগের পাশাপাশি সরকারের পদত্যাগের দাবি তোলার কোশেশ দেখা গেছে। ডিসেম্বরে হাসিনার ফেরার অপোয় ওঁৎ পেতে রয়েছে খুনি ফ্যাসিবাদ গোষ্ঠী।
অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন বাস্তবায়নই হাসিনার ল্য : অতীতে রাজনৈতিক ভুলের জন্য মা চেয়ে মতায় ফিরে আসার নজির রয়েছে হাসিনার। এবার অনুশোচনার লেশ বিন্দুমাত্র নেই। আওয়ামী পরিবারের নেতৃত্বের পরিবর্তে রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের ধারণা হাসিনা নাকচ করেছে। তাকে মতার মসনদে ফিরিয়ে আনার জন্য স্বৈরাচারী এরশাদকে ভারত এর আগে গ্রুমিং করেছিল। এরপর হাসিনা ভারতকে যা দিয়েছেন তা দিল্লি কখনো ভুলতে পারবে না বলে নিজেই সহাস্যে বলেছিলেন। জুলাই আন্দোলনের পর নির্বাচিত সরকার মতায় এলেও বাংলাদেশকে নিয়ে বিন্দুমাত্র দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয়নি ভারতের। সেই লেন্দুপ দর্জির মতো একজন হাসিনা দরকার দিল্লির। ভারত তাকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন মিত্র মনে করে কারণ হাসিনা দীর্ঘ সময় সফলভাবে ভারতের স্বার্থ রা করেছেন। ট্রানজিট দিয়ে, তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণের দায়িত্ব দিয়ে, মংলা বন্দর ও ফেনীতে বিশেষ ইপিজেড নির্মাণে বিনিয়োগের ইত্যাকার সুযোগ তো হাসিনাই দিয়েছিলেন। হাসিনার কারণেই সোনাদিয়ায় চীন গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ কাজ পায়নি। যতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো বিকল্প বিশ্বস্ত শক্তি তৈরি না হচ্ছে, ততদিন ভারত শেখ হাসিনাকেই সমর্থন দিয়ে যাবে। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে বিপদের সময় লেন্দুপ দর্জির মতো বাংলাদেশ থেকে ভারত মিত্রের পাশে না দাঁড়ালে অখণ্ড ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা সঙ্কটে পড়বে। এ জন্যই ভারত সার্ক চায় না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বাভাবিক বিকাশ ও সার্বভৌমত্ব ভারতের অখণ্ড ভারত রূপকল্পের সবচেয়ে বড় বাধা। সেই বাধা অতিক্রম করতেই হাসিনা দেশে ফিরতে চান।