ইরানে আসছে একাকিত্বের সুনামি : বয়স বাড়ছে, প্রস্তুতি নেই

৮০-র দশকের তরুণরাই কি ইরানে ভবিষ্যতের নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ!

এই মুহূর্তে ইরানে প্রায় ৮০ হাজার বৃদ্ধ নির্দিষ্টভাবে ‘একাকী’ হিসেবে জীবনযাপন করছেন। অর্থাৎ তাদের স্ত্রী-সন্তান কেউই নেই।

সৈয়দ মূসা রেজা
Printed Edition
Iranian
রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন একজন ইরানি বৃদ্ধ | ইন্টারনেট

ইরানে জনসংখ্যার বয়স বাড়ছে দ্রুতগতিতে। দেশটির বিজ্ঞানীরা বলছেন, ২০৫১ সাল নাগাদ ইরানের এক-তৃতীয়াংশ মানুষই হবেন বয়সী ব্যক্তি। এই বাস্তবতা সামনে রেখে গেরিয়াট্রিকস বা বয়সীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক ইরানি বিজ্ঞান সংস্থার প্রধান ড. আহমদ দেলবারি বলছেন, এখনই সময় ‘অতিরিক্ত বয়স’ সংক্রান্ত জাতীয় পরিকল্পনার জন্য আলাদা একটি কেন্দ্র গড়ে তোলার।

ইরানের ছাত্রদের সংবাদ সংস্থা ইসনার সাথে সাক্ষাৎকারে ড. দেলবারি আরো বলেন, এই মুহূর্তে ইরানে প্রায় ৮০ হাজার বৃদ্ধ নির্দিষ্টভাবে ‘একাকী’ হিসেবে জীবনযাপন করছেন। অর্থাৎ তাদের স্ত্রী-সন্তান কেউই নেই। নিঃসঙ্গতা তাদের জীবনের অনিবার্য অংশ। চলমান হারে বাড়তে থাকলে এই সংখ্যাটা কয়েক বছরের মধ্যেই ২৭ লাখ স্পর্শ করবে! ড. দেলবারি বলেন, ইরানে যেভাবে জনসংখ্যাবিষয়ক নীতিমালার জন্য ‘পপুলেশন হেডকোয়ার্টার’ গঠন করা হয়েছে, ঠিক তেমনি ‘বৃদ্ধজনসংখ্যা কেন্দ্র’ গঠন করাও এখন সময়ের দাবি।

ইরানে গড় অবসরের বয়স ৫২ বছর। গড় আয়ু ৭৬ বছর। অর্থাৎ একজন মানুষ অবসরের পর গড়ে আরো ২০ বছরের বেশি সময় বাঁচেন। কিন্তু সেই জীবনের জন্য কি কোনো পরিকল্পনা আছে? ড. দেলবারির প্রশ্ন, বেশির ভাগ মানুষই অবসরের সাথে সাথে জীবনকেও বিদায় বলে ভাবেন, অথচ অবসর মানে তো শুধু কাজ থেকে ছুটি, জীবন থেকে নয়! ৯০ এর দশকে দেশের ওপর পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে স্বাস্থ্যসূচকে ইরানের অবস্থান ৪৪, তারপর দ্রুত বর্ধনশীল বৃদ্ধদের ব্যাপারে দেশটির প্রস্তুতি নেই। বুড়িয়ে গেলে সবাই কি অসুস্থ হন বলেও একটি ধারণা প্রচলিত আছে ইরানে। ড. দেলবারি বলেন, না মোটেই না। বার্ধক্য মানেই অসুস্থ হওয়া সাধারণভাবে প্রচলিত ভুল ধারণা। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে ইরানে দেখা গেছে, মাত্র ১০ শতাংশ বয়স্ক ব্যক্তি আলঝেইমারে আক্রান্ত, ৪০ শতাংশ হার্টের সমস্যায়। বাকি বহু বৃদ্ধই বেশ সুস্থ জীবন কাটান। মানসিকভাবে সচেতন থাকলেই বয়সীদের জীবনযাপন স্বাস্থ্যকর হয়।

বৃদ্ধ বয়সে সুখকে অসম্ভব মনে করেন অনেকেই। বয়স বাড়লে দেহ ভেঙে পড়ে, এটাই বাস্তব। তবে অন্যদিক দিয়ে, মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যের দিক থেকে বয়সভিত্তিক সুখের ইংরেজি ইউ অক্ষরের সাথে মিল রয়েছে। শৈশবে সুখ বেশি, মধ্য বয়সে সাংসারিক চাপের কারণে সুখ কমে যায়, আবার বৃদ্ধ বয়সে ফের বাড়ে। কিন্তু সমাজ এ ক্ষেত্রে ভুল ধারণা পোষণ করছে। ধরে নেয়া হচ্ছে বয়স হওয়ার মানেই হচ্ছে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়া। বয়স মানুষের সুখটা কেড়ে নিচ্ছে।

ইরানে বুড়িয়ে যাওয়ার হারকে বিশ্বে নজিরবিহীন বলে মনে করা হচ্ছে। দেশটিতে ১৯৭৬ থেকে ২০১৬-এই ৪০ বছরে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি, ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে। এই হার উন্নত দেশগুলোর তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। এখন ইরানে বৃদ্ধদের হার ১১.৫ শতাংশ। ২০৩০ সাল নাগাদ এই হার ২০ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে। আর কোনো দেশেই এত দ্রুত এই হার বৃদ্ধির নজির নেই।

এ বাবদ নীতিনির্ধারণে ধীরগতি, সময়ের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে ইরান। দেলবারির মতে, বৃদ্ধদের জন্য জাতীয় নীতিমালা তৈরি করতে তেহরানের সময় লেগেছে ১৭ বছর! অথচ এই ১৭ বছরে ইরানে বৃদ্ধের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যুবসমস্যার সমাধানে যে নীতিমালা হয়, তাই দিয়ে কি এই বুড়িয়ে যাওয়ার সঙ্কট মোকাবেলা করা যাবে? উত্তরও দেন তিনি নিজেই- না, কারণ এটি আরো জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কট।

যারা এখনো বিয়ে করেননি, তাদেরকে ভবিষ্যতের কথা ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন দেলবারি। হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, যারা এখনো ঘরসংসার শুরু করেননি, ভেবে দেখুন, ৭০ বছরে গিয়ে একজন সঙ্গী এবং যতœকারীর প্রয়োজন হবেই। তখন একা থাকাটা কেবল দুঃখজনক নয়, বরং বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কট তৈরি করতে পারে, দেলবারি বলেন।

ইরান এখন যে বয়সভিত্তিক ‘সুনামি’র মুখে, তা শুধু স্বাস্থ্য বা কল্যাণ সংক্রান্ত সমস্যা নয়। বরং এটি সর্বাঙ্গীণ সামাজিক রূপান্তরের সঙ্কেতও বহন করছে। ইরানের সমাজ যদি এখনই সচেতন হয়, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেয় এবং বৃদ্ধদের সম্মানের সাথে বাঁচার সুযোগ দেয় তা হলে বৃদ্ধ বয়সের মানে নিছক অসুস্থতা বা একাকিত্বও নয়।