চলতি হিসাবের ঘাটতি, তবে রিজার্ভ ও আর্থিক হিসাবে ইতিবাচক মোড়

বৈদেশিক লেনদেনে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) এক ধরনের সংযত স্থিতিশীলতা ও আংশিক পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি হিসাব এখনো ঘাটতিতে থাকলেও সামগ্রিক ব্যালান্স ঘাটতি থেকে উদ্বৃত্তে পরিণত হয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কেত।

বাণিজ্য ঘাটতি : রফতানি বাড়লেও আমদানির চাপ : ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭.৫৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের (২০২৪-২৫) তুলনায় বেশি। যদিও রফতানি আয় সামান্য বেড়ে ১৪.৫৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে (প্রবৃদ্ধি ১.৮%), তবে আমদানি ব্যয় ২২.১১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ায় ঘাটতি বেড়েছে।

রফতানিতে এখনো প্রধান ভরসা তৈরী পোশাক খাত। এই খাত থেকে আয় হয়েছে ১২.৯৩ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানির প্রায় ৮৯ শতাংশ। তবে প্রবৃদ্ধি মাত্র ১ শতাংশ- যা বৈশ্বিক চাহিদার মন্দা ও মূল্যচাপের ইঙ্গিত দেয়। বিপরীতে, আমদানি ব্যয় ৫.৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে।

পরিষেবা ও প্রাথমিক আয় : ঘাটতির চাপ অব্যাহত : পরিষেবা খাতে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.৯৬ বিলিয়ন ডলার। পরিষেবা আমদানির ব্যয় (ডেবিট) বেড়ে ৪.১৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যেখানে প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৪ শতাংশ। পরিবহন, বীমা ও অন্যান্য পেশাদার পরিষেবায় ব্যয় বৃদ্ধিই এর প্রধান কারণ।

একইভাবে প্রাথমিক আয় খাতে ঘাটতি রয়েছে ১.৫৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শুধু সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধেই গিয়েছে ৬৯৮ মিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক ঋণনির্ভর উন্নয়ন কাঠামোর ফলে সুদ ও মুনাফা বহিঃপ্রবাহ বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই বড় চাপ হয়ে উঠছে।

প্রবাসী আয় : চলতি হিসাবের মূল ভরসা : এই চিত্রে সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো প্রবাসী আয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি। জুলাই-অক্টোবর সময়ে এই খাতে আয় হয়েছে ১০.৩৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩.৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে শ্রমিকদের রেমিট্যান্সই ১০.১৪ বিলিয়ন ডলার- ১৩.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।

হুন্ডি দমন, ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রণোদনা এবং বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর উৎসাহ এ প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। এই প্রবাসী আয়ই মূলত বাণিজ্য ও পরিষেবা ঘাটতির চাপ সামাল দিতে সহায়তা করছে।

চলতি হিসাব : সীমিত ঘাটতি, তবে ঝুঁকি রয়ে গেছে : সব মিলিয়ে চলতি হিসাব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৪৯ মিলিয়ন ডলার। এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য হলেও কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট বাংলাদেশ এখনো আমদানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর অতিনির্ভরশীল। রফতানিতে বৈচিত্র্য না এলে এই ভারসাম্য টেকসই হবে না।

আর্থিক হিসাব : বড় উল্টো স্রোত : চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত হয়েছে ২.১৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় বড় পরিবর্তন। এর পেছনে প্রধান অবদান এসেছে- এফডিআই (এফডিআই): ৪৪৫ মিলিয়ন ডলার; মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ (এমএলটি ঋণ): ১,৫৫৩ মিলিয়ন ডলার; নেট সহায়তা প্রবাহ: ৪৪৪ মিলিয়ন ডলার।

এতে বোঝা যায়, সরকার বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তার মাধ্যমে রিজার্ভ শক্তিশালী করার কৌশল নিচ্ছে। তবে একই সাথে ঋণ পরিশোধও বেড়েছে- এমএলটি পরিশোধ ২০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

রিজার্ভ : শক্ত অবস্থানে বাংলাদেশ ব্যাংক : এই আর্থিক প্রবাহের ফলেই সামগ্রিক ভারসাম্য ১.০৮ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্তে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা কিনে রিজার্ভ বাড়িয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে- গ্রস অফিসিয়াল রিজার্ভ : ৩২.৩৩ বিলিয়ন ডলার; বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ : ২৭,৫৭৮ মিলিয়ন ডলার। এতে আমদানি কাভারেজ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪.৯ মাস, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থান নির্দেশ করে।

স্বস্তির মধ্যেও কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ : সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতে বাংলাদেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টস তাৎণিক সঙ্কট থেকে কিছুটা বেরিয়ে আসছে। প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ রিজার্ভকে শক্তিশালী করেছে। তবে বাণিজ্য ঘাটতি, পরিষেবা ব্যয় ও ঋণনির্ভর অর্থপ্রবাহ দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আমদানি-নির্ভরতা ও ঋণসেবার চাপ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। তবে প্রবাসী আয়, আর্থিক হিসাবে পুনরুদ্ধার এবং রিজার্ভ বৃদ্ধির ধারা ইঙ্গিত দিচ্ছে- সঠিক নীতি ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা সম্ভব। অর্থনীতিবিদদের মতে, রফতানি বৈচিত্র্য, আমদানি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণনির্ভরতা কমানোই হবে আগামী মাসগুলোতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরীা। টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন- রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য; আমদানি-নির্ভরতা কমানো; দ মানবসম্পদ রফতানি এবং ঋণের বদলে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন না হলে বর্তমান স্বস্তি সাময়িকই থেকে যাবে।