গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ২ লাখ ছাড়াতে পারে : জেনেভা একাডেমি

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত
  • ইসরাইলি হামলায় নিহত ১৭০০-এর বেশি চিকিৎসাকর্মী
  • গাজায় ফেরা ফিলিস্তিনিরা নির্যাতন ও অপমানের শিকার

জেনেভা একাডেমি ফর ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিটারিয়ান ল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস মনে করছে, গাজায় ইসরাইলের হামলায় নিহতের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক মানবিক আইন প্রকল্পের প্রধান স্টুয়ার্ট কেসি মাসলেন বলেন, অক্টোবর ২০২৩ থেকে গাজার জনসংখ্যা ১০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির ।

তিনি জানান, এখন পর্যন্ত অন্তত ৭০ হাজার নিহতের বিষয়ে ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি উভয়পক্ষের মধ্যেই এক ধরনের ঐকমত্য রয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত সংখ্যা নয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরো বহু লাশ থাকতে পারে। ফিলিস্তিনি কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী জনসংখ্যা হ্রাসের হার বিবেচনায় নিলে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা দুই লাখের বেশি হতে পারে। মাসলেন বলেন, যুদ্ধবিরতির পর বড় ধরনের সংঘর্ষ কমলেও গাজার মানুষের দুর্ভোগ শেষ হয়নি। আহতদের নিরাপদে সরিয়ে চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা জরুরি। খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসাসহ মানবিক সহায়তা ব্যাপকভাবে বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, গাজার পুনর্গঠন কয়েক মাসে সম্ভব নয়; এতে বহু বছর লাগবে এবং এতে বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে।

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত

গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। স্বাস্থ্য সূত্রের বরাতে আনাদোলু জানায়, উত্তর গাজার জাবালিয়ায় যুদ্ধবিরতির আওতায় যেসব এলাকা থেকে ইসরাইলি বাহিনী সরে গিয়েছিল, সেখানেই আবার গুলি চালানো হয়। এতে আহমেদ ইমরান আল-কানু নামের এক ফিলিস্তিনি নিহত হন। অন্য দিকে বেইত লাহিয়ার জিকিম এলাকায় ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে ৩৩ বছর বয়সী মুহাম্মদ সালাহ আবু রাকবা নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এসব এলাকায় ইসরাইলি বাহিনীর থাকার কথা ছিল না। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর গাজায় যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তার পর থেকেই ইসরাইল একাধিকবার চুক্তি লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ উঠছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, যুদ্ধবিরতির নামে নিরাপত্তা ফেরার আশা থাকলেও বাস্তবে হামলা ও গুলিবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে।

স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ইসরাইলি হামলায় নিহত ১,৭০০-এর বেশি চিকিৎসাকর্মী

ঘোষিত ‘যুদ্ধবিরতি’ সত্ত্বেও গাজার স্বাস্থ্য খাতে ইসরাইলি সামরিক হামলা অব্যাহত রয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও গুলিবর্ষণের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন চিকিৎসক, প্যারামেডিক ও উদ্ধারকর্মীরা; একই সাথে চিকিৎসাবঞ্চিত অবস্থায় আটকে আছেন হাজার হাজার রোগী। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে এ পর্যন্ত গাজায় অন্তত এক হাজার ৭০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন। খবর আলজাজিরার।

সাম্প্রতিক সময়ে, তথাকথিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও চারজন স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হন। সর্বশেষ, খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় স্পষ্টভাবে চিহ্নিত অ্যাম্বুল্যান্স দলকে লক্ষ্য করে চালানো বিমান হামলায় নিহত হন প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্টের প্যারামেডিক হুসেইন হাসান আল-সামিরি।

স্বাস্থ্যকর্মীদের বিরুদ্ধে ‘ডাবল-ট্যাপ’ হামলার অভিযোগও উঠেছে, যেখানে প্রথম হামলার পর আহতদের উদ্ধার করতে গেলে দ্বিতীয় দফা আঘাত হানা হয়। গাজার কর্তৃপক্ষ বলছে, অক্টোবর ২০২৫ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে অন্তত এক হাজার ৪৫০টি হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার রোগী গাজার ভেতরে আটকে আছেন, যাদের মধ্যে চার হাজার ৫০০ শিশু জরুরি চিকিৎসার অপেক্ষায়। সীমান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে এ পর্যন্ত এক হাজার ২০০-এর বেশি রোগী চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, অক্টোবর ২০২৩ থেকে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে স্বাস্থ্যসেবা লক্ষ্য করে এক হাজার ৮০০-এর বেশি হামলা নথিভুক্ত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হাসপাতাল ধ্বংস, চিকিৎসাকর্মী হত্যা ও রোগীদের আটকে রাখা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন এবং গাজার মানবিক সঙ্কটকে আরো গভীর করছে।

খান ইউনুসে চারতলা ভবন ধ্বংস

দক্ষিণ গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনী ভবন ধ্বংসের অভিযান অব্যাহত রেখেছে। বৃহস্পতিবার সকালে খান ইউনুসের কেন্দ্রস্থলে ‘আবু হাতাব’ পরিবারের একটি চারতলা ভবন ইসরাইলি বিমান হামলায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এতে অন্তত একজন আহত হন এবং আশপাশের তাঁবু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খবর আনাদোলু এজেন্সির। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভবনের নিচে থাকা একটি ধাতব কারখানার মালিককে আগেই এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এরপর ভবনের বাসিন্দা ও আশপাশের মানুষজনকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়। ইসরাইলি আর্মি রেডিও দাবি করেছে, উত্তর গাজায় সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর প্রতিশোধ হিসেবে ভবনটি লক্ষ্যবস্তু করা হয়। একই সময়ে খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চলে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। রাফাহ ও জাবালিয়ার দিকেও ভারী গোলাবর্ষণ ও গুলির খবরও পাওয়া গেছে।

গাজায় ইসরাইলের হয়ে কাজ করছে সশস্ত্র মিলিশিয়া

গাজায় ইসরাইলি সেনাবাহিনীর পক্ষে কাজ করা সশস্ত্র ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে যাচ্ছে আলজাজিরা। সাংবাদিক তামের আলমিসহালের অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান এর নতুন পর্বে এসব গোষ্ঠীর নাম, চলাচলের পথ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর ভেতরে উত্তর ও দক্ষিণ গাজায় এসব সশস্ত্র গোষ্ঠী নির্বিঘেœ চলাচল করছে,যা সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জন্য নিষিদ্ধ। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইল প্রায় প্রতিদিনই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে এবং এ পর্যন্ত ৫২৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়াসের আবু শাবাব প্রতিষ্ঠিত ‘পপুলার ফোর্সেস’ গোষ্ঠী এসব মিলিশিয়ার মধ্যে অন্যতম। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগেই স্বীকার করেছিলেন, হামাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ব্যবহার করছে ইসরাইল। আল জাজিরার অনুসন্ধানে আরো উঠে এসেছে, এসব গোষ্ঠী মানবিক সহায়তা লুট করে আবার বিক্রি করছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এতে গাজায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে।

জানুয়ারিতে প্রায় ৭০০ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত : জাতিসঙ্ঘ

ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও হয়রানির কারণে জানুয়ারি মাসে অধিকৃত পশ্চিমতীরে প্রায় ৭০০ ফিলিস্তিনি ঘরছাড়া হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘ। মানবিক সহায়তাবিষয়ক সংস্থা ওসিএইচএ জানায়, শুধু জানুয়ারিতেই ৬৯৪ জন ফিলিস্তিনি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যা অক্টোবর ২০২৩-এর পর সর্বোচ্চ। খবর আলজাজিরার। বিশেষ করে জর্দান ভ্যালির রাস আইন আল-আউজা এলাকায় ১৩০টি পশুপালনকারী পরিবার দীর্ঘ দিনের হয়রানির মুখে পুরো এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। ওসিএইচএ বলছে, এটি গত তিন বছরে একটি সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় জোরপূর্বক উচ্ছেদ। ইসরাইলি এনজিও পিস নাউ জানিয়েছে, বসতি স্থাপনকারীরা কৃষিকাজ ও পশুপালনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করে এবং ধীরে ধীরে তাদের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেয়। জাতিসঙ্ঘের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, পশ্চিমতীরে ‘নীরব জাতিগত নির্মূল’ চলছে; কিন্তু আন্তর্জাতিক মনোযোগ মূলত গাজার দিকে থাকায় পরিস্থিতি আরো অবনতি হচ্ছে।

গাজায় ফেরা ফিলিস্তিনিরা নির্যাতন ও অপমানের শিকার

রাফাহ সীমান্ত দিয়ে গাজায় ফেরা ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলি বাহিনী ও তাদের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে নির্যাতন ও চরম অপমানের শিকার হচ্ছেন বলে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার দফতর (ওএইচসিএইচআর) এর বরাতে জানিয়েছে মিডলিস্ট মনিটর। সংস্থাটি জানায়, সীমান্ত পার হওয়ার পর অনেককে চোখ বেঁধে, হাতকড়া পরিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অর্থ ও মালামাল ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগও উঠেছে। অনেককে চিকিৎসা বা টয়লেট ব্যবহারের সুযোগ না দিয়ে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়েছে। কিছু প্রত্যাবর্তনকারী জানান, তাদের অর্থের বিনিময়ে মিশরে ফিরে যেতে বা ইসরাইলের জন্য গুপ্তচর হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। জাতিসঙ্ঘ বলছে, এসব আচরণ নির্যাতন ও অমানবিক ব্যবহারের শামিল এবং মানুষের নিরাপদে ফেরার অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করছে। জাতিসঙ্ঘের মুখপাত্র স্টেফান দুজারিক বলেন, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব।

গাজা সীমান্ত ভাঙার চেষ্টা

গাজা উপত্যকায় ইহুদি বসতি স্থাপনের দাবিতে শতাধিক কট্টর ডানপন্থী ইসরাইলি কর্মী গাজা সীমান্ত ভাঙার চেষ্টা করেছে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ইয়নেটের বরাতে তাস নিউজ জানায়, দু’টি বাসে করে আসা এসব কর্মী সাতটি স্থানে সীমান্তে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, কয়েকজন গাজায় ঢুকতে সক্ষম হলেও দ্রুত আটক করে ফেরত পাঠানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন গাজা যুদ্ধ ও ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইসরাইলের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে।

রাফাহ সীমান্তে যাতায়াত প্রায় স্থবির

প্রায় চার মাসের কথিত যুদ্ধবিরতির মধ্যেও উত্তর গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। জরুরি সেবা সংস্থার বরাতে জানা গেছে, শুক্রবার জাবালিয়া ও বেইত লাহিয়ায় ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় দুই ফিলিস্তিনি নিহত হন। নিহতদের লাশ গাজা সিটির আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সে নেয়া হয়েছে। খবর আলজাজিরার। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে একটি ফিলিস্তিনি বাড়িতে বিমান হামলা চালায় ইসরাইল। সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর কাছে তাদের সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার প্রতিক্রিয়ায় এ হামলা চালানো হয়। স্থানীয় বাসিন্দা সালেহ আবু হাতাব জানান, আধা ঘণ্টার মধ্যে বাড়িটি খালি করতে বলা হয় এবং পরে সেটিতে বোমা হামলা হয়। ভবনটি একটি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত স্কুলের কাছেই অবস্থিত ছিল। আলজাজিরার সাংবাদিক হিন্দ খোদারি জানান, গাজা সিটির শেখ আজলিন এলাকাতেও ফাঁকা জমিতে হামলা চালানো হয়েছে। একই সাথে দেইর আল-বালাহর পূর্বাঞ্চলে ইসরাইলি ট্যাংক ও বুলডোজার দিয়ে ধ্বংসলীলা চালানো হয়। এ দিকে রাফাহ সীমান্ত দিয়ে যাতায়াত খুবই সীমিত। বৃহস্পতিবার মিসরে আটকে থাকা ২১ জন ফিলিস্তিনি গাজায় ফিরতে সক্ষম হন। রেড ক্রিসেন্ট জানায়, শুক্রবার সীমান্ত দিয়ে কোনো চলাচলের পরিকল্পনা নেই। সীমান্তে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ, হয়রানি ও অনিশ্চয়তায় চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন ফিলিস্তিনিরা।