চট্টগ্রাম-৮ আসনে সুবিধাজনক অবস্থানে নেই এনসিপির প্রার্থী
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা চট্টগ্রাম
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে নানা নাটকীয়তা সামনে আসছে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) সংসদীয় আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। আসনটি ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতা অনুযায়ী বোয়ালখালীতে একেবারেই নতুন এনসিপির এক নেতাকে ছেড়ে দেয়া হয়। ফলে ১১দলীয় জোটের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী আসনটিতে অনেকটা নিশ্চিত জয়ের পথে ছিলেন। কিন্তু আসনটি এনসিপিকে ছেড়ে দেয়া হলেও জামায়াতের প্রার্থী মনোনয়পত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় তিনি দলীয় প্রতীক বরাদ্দ পান। এত দিন তিনি একেবারে নীরব থাকলেও তার সমর্থক-শুভাকাক্সক্ষীদের উল্লেখযোগ্য অংশ নির্বাচনের মাঠে প্রচারণায় সক্রিয় ছিলেন। সমর্থকদের চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত তিনিও শেষ মুহূর্তে এসে প্রচারণায় শামিল হচ্ছেন। ফলে নির্ভার এরশাদ উল্লাহর (ধানের শীষ) সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ ডা: আবু নাসের (দাঁড়িপাল্লা)। আর ১১দলীয় প্রার্থী হলেও খোদ এনসিপিতেই আসনটিতে এনসিপির প্রার্থী নিয়ে অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। তা ছাড়া জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যরাও দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীর পক্ষে। সব মিলিয়ে আসনটিতে নতুন সমীকরণ শুরু হয়েছে। ভোটের মাঠে ধানের শীষ এবং দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী উভয়েই জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
সরেজমিন দেখা গেছে, আসনটিতে বিএনপি এবং জামায়াতের যে সাংগঠনিক শক্তি রয়েছে, সেই তুলনায় এনসিপির সাংগঠনিক শক্তি একেবারেই হাতেগোনা। এলাকার প্রতিষ্ঠিত মানুষজন ধানের শীষের প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ এবং দাঁড়িপাল্লার ডা: আবু নাসেরের সাথে দেখা গেলেও শাপলা কলির প্রার্থী জোবাইরুলের সাথে নেই বললেই চলে।
আসনটিতে এবারের মোট ভোটার পাঁচ লাখ ৫৬ হাজার ৭২৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৮৪ হাজার ৬০৬ এবং নারী ভোটার দুই লাখ ৭২ হাজার ১২২ জন এবং মাট ভোট কেন্দ্র ১৭৯টি।
এবারের নির্বাচনে আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর রয়েছে পূর্বেকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভিজ্ঞতা। ইতঃপূর্বে তিনি ২০০৮ সালের ওয়ান ইলেভেন সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সেই নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী মঈনুদ্দিন খান বাদলের কাছে হেরে গিয়েছিলেন। সেবারের নির্বাচনে এই আসনটি ছিল চট্টগ্রাম-৭। কিন্তু আসনটিতে এবারের নির্বাচনে আলোচনায় থাকা জামায়াতের প্রার্থী ডা: আবু নাসেরের পূর্বে জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভিজ্ঞতা নেই। পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই এনসিপির প্রার্থীরও।
এ ছাড়া চট্টগ্রামের অন্যান্য আসনের প্রার্থীদের ইমেজ সঙ্কটও তেমন নেই এই বিএনপি নেতার। রাজনীতির মাঠেও রয়েছে বড় পদবি। তিনি চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক। প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের সমীকরণে আসনটি এনসিপিকে দেয়ার পর তিনি বিজয়ের ব্যাপারে অনেকটাই নির্ভার ছিলেন। সে জন্য প্রচার-প্রচারণায়ও ছিলেন কিছুটা গো সেøা ভাব। কিন্তু নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে জামায়াতের প্রার্থী এবং কর্মী-সমর্থকরা মাঠে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে সরব হওয়াতে তিনি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ফলে আসনটিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে ধানের শীষের সাথে দাঁড়িপাল্লার।
অপর দিকে, জামায়াতের পক্ষ থেকে আসনটি জোটের প্রার্থীদের জন্য উন§ুক্ত রাখার প্রস্তাব করা হলেও ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতা অনুযায়ী এ আসনটি এনসিটির প্রার্থী জোবায়রুল হাসান আরিফকে দেয়া হয়। জামায়াতের প্রার্থী ডা: আবু নাসের দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে আট দিন প্রচারণা থেকে একেবারেই দূরে ছিলেন। তবে তিনি গণসংযোগ না করলেও স্থানীয়ভাবে তার ভক্ত-সমর্থকরা নির্বাচনী মাঠে সরব ছিলেন। এর মধ্যে গত চারদিন ধরে মাঠে নেমেছেন ডা: আবু নাসের নিজেও।
জানা গেছে, চিকিৎসকদের সংগঠন বিএমএ’র চট্টগ্রামের সাবেক নেতা এবং বোয়ালখালী উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির ডা: আবু নাসের চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই দলের সবুজ সঙ্কেত পেয়ে এই আসনে প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। তা ছাড়া তিনি আগে থেকে এলাকার মানুষের কাছে বেশ পরিচিত, বিশেষ করে বোয়ালখালির মানুষের চিকিৎসা সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে তার সহযোগিতার কারণে। এর বাইরে দীর্ঘদিন মাঠে থেকে নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় ডা: নাসেরের বিশাল এক ভক্ত-সমর্থক গোষ্ঠীও তৈরি হয়েছে। কিন্তু ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা থাকা সত্ত্বেও জোটের সমীকরণে তিনি বাদ পড়ায় ভক্ত-সমর্থকদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। এক পর্যায়ে তাকে মনোনয়ন প্রত্যাহার না করতেও চাপ দেয়। একই সাথে তারা ডা: নাসেরের পক্ষে প্রচারণায়ও মাঠে সরব ছিলেন।
এলাকার বাসিন্দাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর এনসিপির পক্ষ থেকে আসনটিতে প্রার্থী করা হয় জোবায়রুল হাসান আরিফকে। তিনি এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা। কিন্তু তিনি আসনটির স্থায়ী বাসিন্দা নন। একেবারেই নতুন মুখ হিসেবে নির্বাচনী মাঠে নেমে তিনি খুব বেশি সুবিধা করতে পারছিলেন না। এমনকি নিজ দল এনসিপি ও অঙ্গ সংগঠনকেও এখনো এই আসনে মাঠে নামাতে পারেননি বলে স্থানীয়রা জানান।
এ প্রসঙ্গে এনসিপির প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফের সাথে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
ধানের শীষের প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ নয়া দিগন্তকে বলেন, ভোটের মাঠে জোটবদ্ধতা বিএনপিরও আছে, আবার জামায়াতেরও আছে। জনগণ কাকে বেছে নেয় সেটাই এখন দেখার বিষয়। ভোটাররাই কোন জোট দেশের পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে, জনগণের পক্ষে তা রায়ের মাধ্যমে বাছাই করবে জানিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি মুক্তিযোদ্ধার দল। ভোটের মাঠে বিএনপির মজবুত অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। গত ১৫ বছর ভোটাররা পছন্দসই প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেননি। কাজেই ভোটররা এবারের নির্বাচনে পছন্দসই প্রার্থী বেছে নেবেন।
নির্বাচিত হলে নিজের প্রধান কাজ হবে কালুরঘাট সেতুর বাস্তবায়ন করা। এ ছাড়া বোয়ালখালির স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়নে হাসপাতাল স্থাপন, নদীভাঙন রোধ এবং স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি জানান। ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার দেখতে পাচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ইনশা আল্লাহ ১২ তারিখ জনগণ গণতন্ত্রের পক্ষে রায় দেবে, ধানের শীষ বিজয়ী হবে।
দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ডা: আবু নাসের নিজের প্রার্থিতা সম্পর্কে বলেন, জনগণের চাপের মুখে আমি নির্বাচনী মাঠ থেকে সরতে পারিনি এবং বাধ্য হয়ে প্রচারণায় নেমেছি। ডা: আবু নাসের বলেন, ১১ দলীয় জোটের সিদ্ধান্তের কারণে আমি গত আট দিন কোনো প্রচারণায় বের হইনি, বাসাতেই ছিলাম। কিন্তু বোয়ালখালী ও চান্দগাঁও এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরে আমার সাথে কাজ করা সাধারণ মানুষ আমাকে বাসা থেকে বের করে এনেছে। এখন আমার উপায় কী? আমি এই এলাকা ছেড়ে তো আর চলে যেতে পারবো না। তিনি বলেন, জনগণ দাঁড়িপাল্লা ছাড়া অন্য কোনো প্রতীক মেনে নিচ্ছে না এবং আমাকে বাধ্য করে প্রচারণায় নামিয়েছে। নির্বাচনের পরিবেশ খুবই ভালো মন্তব্য করে এই চিকিৎসক নেতা বলেন, ইনশা আল্লাহ ১২ তারিখে দাঁড়িপাল্লাই বিজয়ী হবে।
বিজয়ী হলে নিজের অগ্রাধিকার সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা: নাসের বলেন, কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন এক নম্বর অগ্রাধিকার। এ ছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণ, চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, চাঁদাবাজি বন্ধ এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে তিনি কাজ করবেন বলে জানান।