বিএনপি সরকারের ২১ দিন : সূচনার বার্তা
Printed Edition
ইকবাল মজুমদার তৌহিদ
সরকারের মেয়াদ সাধারণত কয়েক বছর হলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহই অনেক সময় একটি সরকারের চরিত্র, অগ্রাধিকার এবং শাসনধারার ইঙ্গিত দেয়। এই সময়েই জনগণ বুঝতে শুরু করে নতুন সরকার কোন পথে দেশকে এগিয়ে নিতে চায়।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম একুশ দিনে প্রশাসনিক গতি সঞ্চার, আইনশৃঙ্খলা জোরদার, অর্থনৈতিক আস্থার পরিবেশ তৈরি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের মতো নানা উদ্যোগ সামনে এসেছে। একই সাথে রাজনৈতিক আচরণ, পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও কিছু প্রতীকী ও বাস্তব পদক্ষেপ আলোচনায় এসেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সময়ের কয়েকটি সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ বিশেষভাবে নজর কাড়ছে।
জনতার কাছে পৌঁছানোর রাজনৈতিক বার্তা : বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রক্ষমতার সাথে একটি দূরত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। সরকারপ্রধানের চলাচলে কঠোর প্রটোকল, প্রশাসনের ওপর ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রভাব এবং নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধতা, এসব ছিল প্রায় স্বাভাবিক চিত্র।
নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেয়ার পর শুরু থেকেই তুলনামূলকভাবে ভিন্ন একটি বার্তা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। তাকে ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলতে দেখা গেছে, কখনো সাধারণ মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতেও দেখা গেছে। কঠোর ভিভিআইপি প্রটোকল সীমিত করার সিদ্ধান্তও জনমনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন, রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে জনগণের মধ্যে। তাই অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দুর্নীতি দমন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে তিনি সরকারের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে সামনে এনেছেন। একজন দূরদর্শী নেতা হিসেবে তিনি তরুণ সমাজকে দেশের উন্নয়নের প্রধান শক্তি হিসেবে দেখেন। শিক্ষা, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তরুণদের সক্ষম করে তোলার ওপর তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপ মূলত একটি প্রতীকী বার্তা বহন করে- রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা জনগণের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা।
ট্রাফিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় প্রতীকী পরিবর্তন : প্রধানমন্ত্রীর সীমিত প্রটোকল ব্যবহারের ফলে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ঢাকার সড়কে যানবাহনের গড় গতি কিছুটা বেড়েছে এবং যানজটে নষ্ট হওয়া কর্মঘণ্টাও কিছুটা কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এদিকে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আধুনিক করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক প্রশাসনিক পরিকল্পনার একটি দিকনির্দেশ করে।
এ ছাড়া বিদেশ সফরের সময় মন্ত্রী ও সামরিক কর্মকর্তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে বিদায় ও অভ্যর্থনা জানানোর প্রচলিত প্রথা বাতিল করাও রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ : সরকারের প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর একটি হচ্ছে বিভিন্ন পরিচয়ভিত্তিক কার্ড চালুর পরিকল্পনা। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ড। গতকাল ১০ মার্চ ঢাকার কড়াইল বস্তিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুত ফ্যামিলি কার্ড উদ্বোধন করেন। একই সময়ে দেশের ১৪টি স্থানে এই কর্মসূচি চালু হয়। পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরুতে ৬৫০০ পরিবার এই কার্ডের সুবিধা পাবে, যা পরে সারা দেশে বিস্তৃত করা হবে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলোকে সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের জন্য কৃষি উপকরণ, সেবা এবং আর্থিক সহায়তা সহজ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রবাসীদের জন্য আলাদা কার্ড চালু এবং স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল হেলথ কার্ড চালুর নির্দেশনাও সরকারের সামাজিক নীতি কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবা সহজ করতে ই-হেলথ কার্ড চালুর নির্দেশনাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি দ্রুত সময়ের মধ্যে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সরকারি কর্মসংস্কৃতি : নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই সরকারি অফিসে সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে মন্ত্রীদের তদারকি বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে জনগণের জন্য সরকারি সেবা পাওয়ার সুযোগ সহজ হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নিজেও শনিবার ছুটির দিনেও অফিস করছেন, ফলে সরকারি কাজের কার্যত কর্মঘণ্টা বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের কর্মসংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার এই প্রচেষ্টা বাস্তবে কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োগের ওপর।
পুলিশ সংস্কার ও আইনশৃঙ্খলা : পুলিশ বাহিনীতে কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগও নতুন সরকারের আলোচিত পদক্ষেপগুলোর একটি। সরকার জাপানের আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থাকে মডেল হিসেবে বিবেচনা করে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় সহায়তা চেয়েছে।
একই সাথে ‘মব কালচার’ বা গণপিটুনির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পুলিশের নতুন নেতৃত্ব উভয়ই এ বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন।
বৈশ্বিক সঙ্কটের মধ্যে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা : মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক সঙ্ঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বাড়ানো এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য কিছু প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী মার্চ মাসে স্পট মার্কেট থেকে চার কার্গো এলএনজি কেনার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে এলএনজি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা মজুদ রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানি ব্যবহারে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’-পররাষ্ট্রনীতির নতুন ভাষ্য : সরকার গঠনের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল নীতি হবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
এই অবস্থান মূলত একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক নীতির ইঙ্গিত দেয়- যেখানে সব দেশের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
ভারতের সাথে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপড়েনও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার জানিয়েছেন, বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা প্রদান আবারো বাড়ানো হচ্ছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর বাংলাদেশ সফর করেছেন এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা করেছেন।
রাজনৈতিক শিষ্টাচার : নির্বাচনে বিজয় লাভের পর বিজয় মিছিল না করে প্রধানমন্ত্রী নিজে গিয়ে বিরোধী দলগুলোর নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনুষ্ঠানে পারস্পরিক অংশগ্রহণ রাজনৈতিক সৌহার্দ্যের একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক আস্থার পুনর্গঠন : অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বন্ধ হয়ে যাওয়া কয়েক শ’ কারখানা আবার চালুর উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নীতি সুদহার কমানোর সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় এসেছে। এসব পদক্ষেপ ব্যবসায়ী মহলে নতুন করে বিনিয়োগের আস্থা তৈরি করতে পারে বলে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন।
সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই শুরু হয় রমজান মাস। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে বাজারে সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে দেবে।
কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত মনিটরিংয়ের কারণে দুধ, ডিম, পেঁয়াজ, বেগুন, ছোলা ও ভোজ্যতেলের দাম স্থিতিশীল ছিল। একমাত্র লেবুর দাম সাময়িকভাবে বাড়লেও দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসে।
শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার : প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন। লক্ষ্য- বাংলাদেশের শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা।
তিনি প্রতি শনিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবেন বলে জানিয়েছেন। শিক্ষকদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
এপ্রিলের এসএসসি পরীক্ষা সামনে রেখে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে এবং পাঠ্যবই পরিমার্জনের সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে।
কৃষকদের জন্য ঋণ মওকুফ : সরকার দায়িত্ব নেয়ার প্রথম দিকেই কৃষকদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় ১৩ লাখ কৃষক উপকৃত হতে পারেন। কৃষি অর্থনীতিতে এটি স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
উপসংহার : প্রথম একুশ দিনের কার্যক্রম একটি সরকারের পূর্ণ মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। তবে এই সময়ের উদ্যোগগুলো সরকারের অগ্রাধিকার এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি প্রাথমিক ধারণা দেয়।
প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, অর্থনৈতিক আস্থা পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক সৌহার্দ্যের কিছু উদ্যোগ ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো- এই সূচনাগুলো কতটা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে এই সূচনাকে ইতিহাস কিভাবে মূল্যায়ন করবে।