ব্রির শীর্ষ পদশূন্য ১০ দিন সিদ্ধান্তহীন কৃষি মন্ত্রণালয়
সিন্ডিকেট সক্রিয়
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)-এর মহাপরিচালক পদ টানা ১০ দিন ধরে শূন্য থাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘসূত্রতা ও দৃশ্যমান সিদ্ধান্তহীনতা সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিতে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও টেন্ডার প্রক্রিয়া ঘিরে অনিয়ম ও দুর্নীতির একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পরিচালকের (গবেষণা) রুটিন দায়িত্বে থাকা ড. মো: রফিকুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, তার প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতায় একটি বিতর্কিত পদোন্নতি প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়, যা দু’টি আইনি নোটিশের মুখে পড়ে এবং পরবর্তীতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে স্থগিত বা বাতিল করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা বা নিয়োগ পরীক্ষা ছাড়াই তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন আত্মীয়কে (ছয়জন) ব্রিতে চাকরি দেয়া হয়েছে। ডরমিটরি শাখায় সহকারী কুক পদে তার এক নিকটাত্মীয়ের নিয়োগ বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক ৭৫টি পদে নিয়োগকে ঘিরেও ব্যাপক বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মহলে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের আলোচনা থাকলেও এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো তদন্ত শুরু হয়নি।
ব্রির অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে অভিযুক্ত হচ্ছেন ড. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান মুকুল। অভিযোগ অনুযায়ী, গত প্রায় ১৯ মাস ধরে ব্রির নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও টেন্ডারসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তিনি প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা পালন করে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এই সিন্ডিকেটের সাথে সংশ্লিষ্ট হিসেবে আরো কয়েকজনের নাম আলোচনায় এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ব্রির পার্টনার প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ড. মো: আব্দুল কাদের এবং নির্বাহী প্রকৌশলী মো: হাসান আলী- যাদের বিরুদ্ধে অর্থের জোগান ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, ড. মুকুল ব্রির বিভিন্ন প্রকল্পে গাড়ি সরবরাহের আড়ালে ব্যক্তিগত ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তার নামে নিবন্ধিত একটি গাড়ি (ঢাকা-চ-১৯৯০৯৯) প্রতিষ্ঠানিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সেটি একজন অনিয়মিত শ্রমিক দ্বারা চালিত হচ্ছে- যা বিধিবহির্ভূত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া ব্রি প্রগতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা নীতিমালা পরিবর্তন করে তার স্ত্রীকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিদায়ী মহাপরিচালকের ওপর প্রভাব খাটিয়ে নীতিমালা সংশোধন করে এই পদোন্নতি কার্যকর করা হয়, যা প্রশাসনিক নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বর্তমানে মহাপরিচালক পদ শূন্য হওয়ার পর এই সিন্ডিকেট ড. মো: রফিকুল ইসলামকে ওই পদে নিয়োগ দেয়ার জন্য জোরালো তৎপরতা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়ে তারা সক্রিয় রয়েছে এবং বিভিন্ন মহলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
এমনকি বিকল্প প্রার্থীদের নিরুৎসাহিত করতে চাপ ও হুমকি প্রয়োগের ঘটনাও সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ড. রফিকুল ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তি মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পেলে ড. মুকুলসহ সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের বিগত সময়ের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়গুলো প্রকাশ্যে চলে আসতে পারে- এই আশঙ্কা থেকেই তারা তাকে ওই পদে বসাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
উল্লেখ্য, মহাপরিচালক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (সিএসও) পদকে ফিডার পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে সিএসও তালিকার শীর্ষ পর্যায়ের অধিকাংশ কর্মকর্তার যোগদানের তারিখ অভিন্ন হওয়ায় যোগ্যতা, সততা ও পেশাগত গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে একজন উপযুক্ত প্রার্থী বাছাইয়ের সুযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এ অবস্থায় ব্রির সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৎ, যোগ্য ও বিতর্কমুক্ত ব্যক্তিকে মহাপরিচালক পদে নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন।
তারা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সাথে সম্পৃক্ত এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি গভীর সঙ্কটে নিমজ্জিত হতে পারে।
অতএব, উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হচ্ছে- অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে উত্থাপিত অভিযোগগুলো যাচাই করা এবং একই সাথে ব্রির শীর্ষ পদে একজন সৎ, দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে দ্রুত নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে সুশাসন ও আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।