সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে দোলাচল
ঐকমত্য কমিশনের শেষ বৈঠক : দূরত্ব কমার সঙ্কেত নেই
জুলাই জাতীয় সনদ কার্যকর করা শুধু সংবিধান সংশোধনের বিষয় নয়; এটি দেশের নির্বাচনী স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বৈঠকগুলোতে যদি রাজনৈতিক দলগুলো কার্যকর সমাধানে পৌঁছায়, তাহলে ২০২৬ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও জনগণমুখী প্রক্রিয়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
Printed Edition
জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে আজ রোববার ফের রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বসবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বেলা সাড়ে ১১টায় কমিশনের এ বৈঠক শুরু হবে। আগামী ১০ অক্টোবরের মধ্যে বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে সুপারিশ চূড়ান্ত করে সরকারকে দিতে চায় কমিশন। ১৫ অক্টোবর জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এর মধ্যেই সব দলের স্বাক্ষরের মাধ্যমে সনদের পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে চায় কমিশন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, গত বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কমন গ্রাউন্ড তৈরি করে তা পরবর্তী বৈঠকে উত্থাপনের কথা জানিয়েছিল কমিশন। আজকের বৈঠকে কমিশনের পক্ষ থেকে প্রথমে দলগুলোর কাছে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইবে। দলগুলোর পক্ষ থেকে সনদ বাস্তবায়নের নতুন সুপারিশ উত্থাপন হতে পারে আজ। কোনো কারণে দলগুলো ঐকমত্যে আসতে না পারলে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সুপারিশের আলোকে কমিশন প্রস্তাবনা তুলে ধরবে। আগামী মঙ্গলবার ফের দলগুলোর সাথে বৈঠক হতে পারে। তবে এ দিনই আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে শেষ বৈঠক। আগামী ১৫ অক্টোবর যেহেতু শেষ হচ্ছে কমিশনের মেয়াদ; তাই এর আগেই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ চূড়ান্তকরণ শেষে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষর নেবে কমিশন।
রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করলেও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে অনৈক্য দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে একাধিক বৈঠক করেও দলগুলোর মতভিন্নতা দূর করা যায়নি। বিএনপি চায় প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন হবে জাতীয় নির্বাচনের পর, সংসদের মাধ্যমে। অন্য দিকে জামায়াতে ইসলামী আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগেই প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন এবং এর ভিত্তিতে নির্বাচন চায়। প্রায় কাছাকাছি দাবি জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের।
৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে তৈরি হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫। তবে বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে এখনো ঐকমত্য হয়নি। এ কারণে আটকে আছে জুলাই সনদ।
এ দিকে জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে চূড়ান্ত পর্বের প্রস্তুতি পর্যালোচনা করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। গতকাল শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনের কমিশন কার্যালয়ের সভাকক্ষে এক সভায় সামগ্রিক প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেন কমিশনের সদস্যরা। বিশেষত আজ রোববার অনুষ্ঠেয় রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে কমিশনের মুলতবি সভায় যেসব বিষয়ে আলোচনা করা হবে, সেগুলো চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে ইতঃপূর্বে বিশেষজ্ঞদের প্রদত্ত মতামত ও পরামর্শগুলো আবার পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি এ বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে পাওয়া অভিমতও পুনঃবিশ্লেষণ করা হয়।
বৈঠকে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ, সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার, বিচারপতি মো: এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান ও ড. মো: আইয়ুব মিয়া উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ঐকমত্য গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দারও সভায় অংশ নেন।
এর আগে বাস্তবায়নের উপায় ঠিক করতে গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা শুরু করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তিন দিন আলোচনা হলেও ঐকমত্য হয়নি। আলোচনা কয়েক দিন মুলতবি শেষে আজ ফের দলগুলোর সাথে বসছে কমিশন।
দলগুলোর ভিন্নমত ও সম্ভাব্য সমাধান : আজকের বৈঠকে কমিশনের পক্ষ থেকে প্রথমে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য শোনা হবে। দলগুলোর পক্ষ থেকে সনদ বাস্তবায়নের নতুন সুপারিশও উত্থাপিত হতে পারে। কোনো কারণে দলগুলো ঐকমত্যে না এলে, বিশেষজ্ঞ প্যানেলের পূর্ববর্তী সুপারিশের আলোকে কমিশন নিজ প্রস্তাবনা তুলে ধরবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জুলাই জাতীয় সনদ কার্যকর করা শুধু সংবিধান সংশোধনের বিষয় নয়; এটি দেশের নির্বাচনী স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বৈঠকগুলোতে যদি রাজনৈতিক দলগুলো কার্যকর সমাধানে পৌঁছায়, তাহলে ২০২৬ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও জনগণমুখী প্রক্রিয়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। অন্য দিকে দলগুলোর মতবিরোধ থাকলে সনদ বাস্তবায়ন বিলম্বিত হতে পারে, যা আগামী নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এরই মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা চালিয়ে আসছে। ১১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই আলোচনায় কয়েক দফা বৈঠক মুলতবি হওয়ার পর আজ ফের দলগুলোর সাথে বৈঠক। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি শেষ সুযোগ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যেখানে রাজনৈতিক সংলাপ ও ঐকমত্যের মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়নের রোডম্যাপ চূড়ান্ত হবে।