ভিআইপি আসন চট্টগ্রাম-৯

জলাবদ্ধতা-অবকাঠামো সঙ্কট ও চাঁদাবাজ থেকে মুক্তি চান ভোটাররা

Printed Edition
3rd-3
জলাবদ্ধতা-অবকাঠামো সঙ্কট ও চাঁদাবাজ থেকে মুক্তি চান ভোটাররা

বিশেষ সংবাদদাতা চট্টগ্রাম

  • ডা: ফজলুর অগ্রাধিকার জলাবদ্ধতা ও স্বাস্থ্য খাতের সঙ্কট নিরসন
  • সুফিয়ানের অগ্রাধিকার জলাবদ্ধতা নিরসন

চট্টগ্রামের সবচেয়ে ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত সংসদীয় আসন চট্টগ্রাম-৯ আসনটি। অতীতে এই আসনের নির্বাচিতরা সরকারের মন্ত্রী পরিষদে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেতেন। কিন্তু এই আসনের বিস্তীর্ণ এলাকার অবকাঠামো এখনো নগর জীবনের উপযোগী নয়। জলাবদ্ধতা সমস্যা এই আসনের অধিকাংশ মানুষের নিত্যসঙ্গী। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এখনো কাঁচা সড়কের ব্যাপ্তি রয়ে গেছে। ফ্যাসিবাদের পতন হলেও প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা চাক্তাই-খাতুনগঞ্জজুড়ে রয়ে গেছে চাঁদাবাজদের উৎপাত। তাই এবারের নির্বাচনে ভোটাররা এসব সমস্যা সমাধানে পারঙ্গম প্রার্থীকেই বাছাই করবেন বলে ভোটারদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে। আসনটিতে ১০ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও মূলত বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান (ধানের শীষ) এবং জামায়াত মনোনীত ও ১১ দল সমর্থিত প্রার্থী ডা: এ কে এম ফজলুল হকের (দাঁড়িপাল্লা) প্রতীকেই হবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১৫ থেকে ২৩ ও ৩১ থেকে ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৯ সংসদীয় আসন। বাকলিয়ার বিস্তীর্ণ জনপদ থেকে শুরু করে চকবাজার, দেওয়ানবাজার, জামালখান, কোতোয়ালি, আন্দরকিল্লা, ফিরিঙ্গীবাজারসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর অবস্থান এই সংসদীয় আসনটিতে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চাক্তাই-খাতুনগঞ্জসহ টেরিবাজার-রেয়াজুদ্দিন বাজারের অবস্থানও এই আসনে। চট্টগ্রামের বৃহৎ দু’টি হাসপাতালের অবস্থান আসনটিতে। চট্টগ্রাম আদালত, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিসের অবস্থান এই আসনেই।

ইতঃপূর্বে আসনটিতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো বিএনপি ও পতিত আওয়ামী লীগের মধ্যে। কিন্তু ২০২৪-এর ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে আগের সে অবস্থা এখন আর নেই।

ভোটারদের মূল ফোকাস

জামায়াতে ইসলামী এখন বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছরের আওয়ামী দুঃশাসন এবং ২০২৪-এর ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের কর্মতৎপরতাই এখন ভোটারদের মূল ফোকাস। ৫ আগস্ট পরবর্তী নতুন করে চাঁদাবাজিতে লিপ্ত রাজনৈতিক শক্তি এখন কঠিনভাবেই ভোটারদের কাটগড়ায়। ভোটাররা প্রার্থীর সক্ষমতা ও নৈতিকতার পাশাপাশি তাদের সাঙ্গো-পাঙ্গদেরকেও চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। আসনটিতে মুসলিম ছাড়াও রয়েছে বিপুল সংখ্যক ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ভোটার। তারা ভোটের মাঠে বিস্তর প্রভাব রাখেন। অতীতে এসব ভোটার নির্দিষ্ট একটি দলের ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত থাকলেও তারা এবার সেই পরিচিতি ভাঙতে চান। ফলে বিএনপি এবং জামায়াত উভয় দলই ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ভোটের ব্যাপারে আশাবাদী। তবে তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মাঝে ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার ব্যাপারে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আছেন বলেও আলাপে উঠে এসেছে।

মূলত দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ানের রয়েছে চট্টগ্রাম মহানগরী ও দক্ষিণ জেলার রাজনৈতিক ময়দানে নেতৃত্ব দেয়ার অভিজ্ঞতা। কিন্তু তার এই রাজনৈতিক পথচলার মাঝে দলীয় শাস্তির মুখোমুখিও হতে হয়েছে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট পরবর্তী আলোচিত এস আলমের গাড়িকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতায় দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়কের পদও হারাতে হয়েছে তাকে। অবশ্য পরে তিনিসহ অন্যদের বিরুদ্ধে নেয়া দলীয় ব্যবস্থা আর বহাল থাকেনি। তবে আলোচিত সেই ঘটনা থেকে দলীয়ভাবে রক্ষা পেলেও তাকে ভোটের মাঠে এর প্রভাবকে মোকাবেলা করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। এ ছাড়া বাকলিয়া-চকবাজার-খাতুনগঞ্জ এলাকায় বেশ ক’জন আলোচিত চাঁদাবাজের বিএনপি সংশ্লিষ্টতাও দলটির ভোটের হিসাবকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে বলে বেশ ক’জন ভোটারের সাথে আলাপ করে জানা গেছে। তবে দল হিসেবে বিএনপির বিশাল ভোট ব্যাংক থাকার দাবিও রয়েছে দলটির।

অন্য দিকে জামায়াতের প্রার্থী ডা: এ কে এম ফজলুল হক সরাসরি রাজনীতির ময়দানে না থাকলেও চিকিৎসকদের সংগঠন বিএমএ’র নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের অভিজ্ঞতা। তা ছাড়া জামায়াতের এই প্রার্থীর ইমেজ সঙ্কট না থাকলেও জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতার দিক দিয়ে একেবারেই নতুন। তবে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদকের মতো দলীয় পদবি থাকায় চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে তিনি দৃঢ় অবস্থান নিতে পারবেন বলেই ভোটারদের বিশ্বাস। বেশ ক’জন ভোটারের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, স্বাস্থ্য খাত এবং অবকাঠামো নিয়ে ডা: ফজলুল হকের ভিশনারি চিন্তা ভোটারদের মাঝে বেশ প্রভাব ফেলছে দলমত নির্বিশেষে। জাতীয়ভাবে সংস্কারের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকা তরুণ প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট এই প্রার্থীর দিকেই ঝুঁকে আছে মনে করছেন বেশ ক’জন ভোটার।

এ দিকে অতীতের ভোটের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়- ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রম-৯ আসনে বিএনপির আবদুল্লাহ আল নোমান ৪৯ হাজার ৮১৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী পেয়েছিলেন ৪৮ হাজার ২৪৫ ভোট। ওই নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে।

এর পর ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এম এ মান্নান ৯৯ হাজার ২৪০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বিএনপির আবদুল্লাহ আল নোমান পান ৮৫ হাজার ১৭১ ভোট। সেবার আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে।

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারদীয় জোট প্রার্থী আবদুল্লাহ আল নোমান এক লাখ ৩১ হাজার ৬৩৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। সেবার আওয়ামী লীগের এম এ মান্নান পান এক লাখ ১১ হাজার ৯৩৫ ভোট। ওই নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার গঠন করে।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এটি ছিল চট্টগ্রাম-৮ সংসদীয় আসন। এই আসনে আওয়ামী লীগের নুরুল ইসলাম বিএসসি এক লাখ ৪০ হাজার ৪১১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের মোহাম্মদ শামসুল আলম পেয়েছিলেন এক লাখ ৯ হাজার ৪৮৪ ভোট।

সৈয়দশাহ রোড এলাকার ভোটার আবদুর রহীম নয়া দিগন্তকে বলেন, ভোটের ক্ষেত্রে আগের অবস্থা এখন নেই। ভোটাররা প্রার্থীদের যোগ্যতা-সততা সম্পর্কে এখন খুঁটিনাটি পর্যন্ত খোঁজ নিচ্ছেন এবং সে অনুযায়ী ভোট দেবেন। মূলত মানুষ চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আসনটির ভোটার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলামের মতে চাঁদাবাজি ও ছিনতাই ও দখলবাজি থেকে পরিত্রাণ চায় আসনটির ভোটাররা। তাই তারা ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে এসব বিষয় মাথায় রাখবেন।

বাকলিয়া এলাকার ব্যবসায়ী দিদারুল আলম বলেন, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে যে প্রার্থী কঠোর থাকতে পারবেন এবং পৃষ্ঠপোষকতা দেবেন না সে ধরনের প্রার্থীকেই ভোটাররা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

চট্টগ্রাম-৯ সংসদীয় আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ডা: এ কে এম ফজলুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। অতীতে নানা প্রকল্পের নামে দুর্নীতি ও অপরিকল্পিত ‘উন্নয়নের’ নামে দেশকে পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। পরিকল্পিত নগরায়নের উপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বস্তিবাসীর জীবনমান উন্নয়ন, নগরীর যানজট নিরসনে উন্নত বিশ্বের আদলে হকারদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান।

তিনি বলেন, আমি বাকলিয়াকে একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও মানবিক জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। যেখানে মানুষ শান্তিতে বসবাস করবে, তরুণরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে এবং নাগরিক সেবা হবে সহজ ও দুর্নীতিমুক্ত।

তিনি আরো বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাকলিয়া নানা সমস্যায় জর্জরিত। অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাবদ্ধতা, মাদক ও কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নির্বাচিত হলে তিনি এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা যাতে নিরাপদে ব্যবসা করতে পারেন সেই পদক্ষেপ নেয়া হবে। আমরা কাউকে চাঁদাবাজি করতে দেবো না এমন ঘোষণা দেন তিনি। তিনি নগরীর সবগুলো ওয়ার্ডে একটি করে প্রাইমারি হেলথ কেয়ার এবং ২৫০ শয্যার দু’টি বৃহৎ হাসপাতাল গড়ার উদ্যোগ নেবেন বলে জানান। ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ সেøাগানে আমরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। এটি চট্টগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন। এখানেই চট্টগ্রামের বড় বড় সরকারি অবকাঠামো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ব্যবসা বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্রও এটি। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও এখানকার কাক্সিক্ষত উন্নয়ন হয়নি। এখানকার এমপিরা মন্ত্রীও হয়েছেন। কিন্তু কাক্সিক্ষত উন্নয়ন হয়নি। বিশেষ করে রাস্তা-ঘাট, অবকাঠামোগত উন্নয়নে অনেক পিছিয়ে রয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। জলাবদ্ধতা সমস্যাও প্রকট। এসব সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন বলে তিনি জানান।

বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা চাচ্ছি জনগণ ভোট কেন্দ্রে যাবে, বাধাহীনভাবে ভোট দিয়ে আনন্দঘন পরিবেশে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়ে নিরাপদে ঘরে ফিরে যাবে। ভোটের প্রদত্ত রেজাল্ট বের হবে এটাইতো আমাদের প্রত্যাশা। তিনি বলেন, আওয়ামী দুঃশাসনের সময় নির্বাচনের নামে প্রহসন ছিল। এখন আমরা যথার্থই একটি নির্বাচনের প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে আছি।

নির্বাচনে কোনো চ্যালেঞ্জ আছে বলে মনে করেন কি না এমন প্রশ্নে এই বিএনপি নেতা বলেন- চারদিকে কিছু কানাঘুসা থাকলেও বাস্তবিকপক্ষে কোনো ঝুঁকি আছে বলে আমি মনে করি না। জনগণ ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারবে এটাই প্রত্যাশা করি। মানুষ বিভিন্নভাবে তো বাজারে কথা ছড়ায় এই হবে, সেই হবে। তবে এসবের কোনো ভিত্তি আছে বলে আমি মনে করি না।

ভোটারদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে ভালোই সাড়া দেখা যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ভোট কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি খুবই ভালো হবে। নির্বাচনে প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীই জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী থাকেন জানিয়ে তিনি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী বলে জানান। নির্বাচিত হলে নিজের অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, সংসদ সদস্যের কাজ তো আসলে আইন প্রণয়ন। তার পরও এলাকার ভোটারদের কিছু প্রত্যাশা থাকে। এখানে জলাবদ্ধতার সমস্যা আছে, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির সমস্যা আছে, ইভটিজিং সমস্যা আছে, কিশোর গ্যাং সমস্যা আছে, মাদকের সমস্যা আছে। এসব নিয়ে প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে কাজ করবেন বলে জানান তিনি। এর বাইরে মানুষের চাহিদা মতো উন্নয়ন করে বাসযোগ্য নিরাপদ নগরী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নির্বাচিত হলে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করবো।