বয়সের ভারে ন্যুব্জ লেক উন্নয়ন প্রকল্প

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition

সরকার পরিবর্তন হয়, যুগ চলে যায় উন্নয়ন প্রকল্প চলছেই তো চলছে। এখন বয়সের ভাড়ে ন্যুয়ে পড়েছে গুলশান-বানানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন প্রকল্পটি। তিন বছরের প্রকল্পটি পাঁচবার সময় বাড়িয়ে সাড়ে ১৬ বছরে উপনীত। তাও সমাপ্ত হবে কিনা সন্দেহ। খরচও বেড়েছে ১৪৫ কোটি টাকার বেশি বা ৩৫.৩৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে একটি টাকাও খরচ করতে পারেনি প্রকল্প বাস্তবায়নকারীরা। গত ১৬ বছরে প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৮২ শতাংশ। চলতি বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি সমাপ্ত করতে চায়, অথচ এখনো জমি অধিগ্রহণের কাজই সমাপ্ত হয়নি বলে পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন থেকে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প দলিল সংশোধনী প্রস্তাবনা, পরিকল্পনা কমিশন ও রাজউক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা ও জৈব মাটি জমা হওয়াতে লেকের পানির ধারণক্ষমতা ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে। অবৈধ দখল থেকে লেক উদ্ধার, উন্নয়ন ও সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য ২০১০ সালের ৬ জুলাই ৪১০ কোটি ২৫ লাখ ৬২ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয় একনেক থেকে। যা ২০১৩ সালের জুনে তিন বছরে শেষ করার কথা। তা না হওয়ায় সময় বাড়ানো হয় আরো তিন বছর অর্থাৎ গত ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত। বর্ধিত সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ করতে পারেনি বাস্তবায়নকারী সংস্থা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। চারবারে প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তাতেও প্রকল্প সমাপ্তির মুখ দেখে না। খরচ ১৪৫ কোটি টাকার বেশি বাড়িয়ে ৫৫৫ কোটি ৩১ লাখ ১৪ হাজার টাকায় উন্নীত করে ২০২৬ সালের ডিসেম্বও পর্যন্ত সাড়ে ১৬ বছর মেয়াদ অনুদোন দেয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৬১ সালে তদানীন্তন ডিআইটি (বর্তমানে রাজউক) গুলশান মডেল টাউন প্রকল্প নামে বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু করে। একই সময়ে প্রায় এক হাজার একর জমি (বনানী-বারিধারা) আবাসিক ব্যবহারের জন্য উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৯২ সাল নাগাদ গুলশান মডেল টাউন এবং আংশিক বানানী ও বারিধারা আবাসিক কার্যক্রম এক হাজার একর ভূমি উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় শেষ হয়। তবে ২০০ একর এলাকাজুড়ে বিদ্যমান বনানী মডেল ও গুলশান মডেল টাউনের মধ্যে একটি লেক এবং গুলশান মডেল টাউন ও বারিধারা মডেল টাউনের মধ্যে একটি লেকের উন্নয়ন কাজ আজ পর্যন্ত হয়নি। এ প্রকল্পের আওতায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় অবৈধ দখল হতে লেক পুনরুদ্ধার, লেকের পানির ধারণ ও সংরক্ষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে ঢাকা শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি, লেক এলাকায় বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা ও সংলগ্ন এলাকার পরিবেশ উন্নয়ন এবং পানির গুণগত মান রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।

অর্থবছরের ১১ মাসে একটি টাকাও খরচ হয়নি

গত ৩ জুন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা সভা সূত্রের তথ্য বলছে, প্রকল্প পরিচালক সভাকে জানান, প্রকল্পের অনুকূলে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে ৬৬ কোটি ৯৯ লক্ষ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। ওই বরাদ্দের বিপরীতে মে ২০২৬ পর্যন্ত কোন অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। মে ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৬ বছরে ৩০৬ কোটি ১৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা বা মোট খরচের ৫৫.১৩ শতাংশ। বিপরীতে কাজের অগ্রগতি ১৬ বছরে অগ্রগতি ৮২ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় ১০.৭৫ একর ভূমি অধিগ্রহণের কাজ এল এ কেস নং ১৬/২০১০-১১ এর মাধ্যমে চলমান রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট জেলা প্রশাসক কার্যালয় হতে যৌথ জরিপের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে যৌথ তদন্ত তালিকা প্রস্তুতকরণ চলমান রয়েছে।

জমি অধিগ্রহণের বেড়াজালে প্রকল্প

সভায় প্রকল্প পরিচালক জানান, প্রকল্পের আওতায় গুলশান-বাড্ডা লিংক রোড হতে শাহজাদপুর (মরিয়ম টাওয়ার-২) পর্যন্ত লেকের পাড় বরাবর লেকড্রাইভ সড়ক ও ওয়াকওয়ে নির্মাণের লক্ষ্যে ৩.২৯ একর ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়ে ২০২৫ সালের অক্টোবরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় হতে প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া যায়। আর একই বছর নভেম্বরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় হতে ভূমি মন্ত্রণালয়ে ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাবটি প্রেরণ করা হয়। কেন্দ্রীয় ভূমি বরাদ্দ কমিটিতে প্রেরণের লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয় হতে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রেরণ-করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত স্থানে রাস্তা নির্মিত হয়েছে

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ১১ মার্চ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের চিঠির আলোকে প্রস্তাবিত ভূমি অধিগ্রহণের নকশাটির স্কেল সংশোধন করা হয়।

এতে বিভিন্ন দাগে প্রস্তাবিত জমির পরিমাণে তারতম্য হয় এবং মোট জমির পরিমাণ ৩.২৯ একর এর স্থলে ৩.২৮১৫ একর বিবেচনা করা হয়। এতে মোট জমির পরিমাণ ৩.২৮১৫ একর বিবেচনা করে প্রস্তাবিত ভূমি অধিগ্রহণের দাগসূচি হালনাগাদ করা হয়। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ২১ এপ্রিল এক চিঠির আলোকে প্রস্তাবিত ৩.২৮১৫ একর ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়ে সংশোধিত প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য ২৩ এপ্রিল গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পত্র প্রেরণ করা হয়। ভূমি অধিগ্রহণের জন্য প্রস্তাবিত স্থানে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে এবং তা জনসাধারণ কর্তৃক ব্যবহৃত হচ্ছে। কাজেই এ পর্যায়ে এ স্থান অধিগ্রহণপূর্বক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা সমীচীন হবে না। এ প্রেক্ষিতে প্রকল্পের আওতায় গুলশান-বাড্ডা লিংক রোড হতে শাহজাদপুর (মরিয়ম টাওয়ার-২) পর্যন্ত লেকের পাড় বরাবর লেকড্রাইভ সড়ক ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ৩.২৯ একর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করা যাবে না বলে সবাই একমত পোষণ করেন। প্রকল্পটি ডিসেম্বর ২০২৬ এ সমাপ্ত হবে।

পরিকল্পনা কমিশন যা বলল

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সংশ্লিষ্ট উইং কর্মকর্তাদের সাথে কথা হলে তারা বলেন, এখন যে ব্যয় বাড়ানো হলো, ভবিষ্যতে তা আরো বাড়ার আশঙ্কা আছে। পরিকল্পনা করার সময় ও বাস্তবায়নের সময়ের মধ্যে অনেক ফারাক হয়। কাজেই এই প্রকল্প এখন সমাপ্ত ঘোষণা করে নতুন সম্ভাব্যতা যাচাই করে নতুনভাবে প্রকল্প নেয়াই যুক্তিযুক্ত হতো। তারা বলেন, সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্পটি নেয়া হয়। আর জমি অধিগ্রহণ যেখানে সংশ্লিষ্ট সেখানে আগে অধিগ্রহণের কাজ না করে প্রকল্প নেয়াটা যুক্তিযুক্ত হয়নি। যার কারণে বছরের পর বছর প্রকল্পটি চলছে।

প্রকল্পের এত ধীরগতি কেন তা জানার জন্য বাস্তÍবায়নকারী সংস্থা রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী, জনসংযোগ কর্মকর্তার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তারা কোনো কথা বলতে চাননি। এমনকি প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরাও ফোন ধরেননি। শেষে চেয়ারম্যানকে ফোন করেও পাওয়া যায়নি।