রাজসিক প্রত্যাবর্তন খালেদা জিয়ার

পথে পথে উচ্ছ্বাস, জনস্রোত

মঈন উদ্দিন খান
Printed Edition
1st-1
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাসভবনে ফেরার পথে বেগম খালেদা জিয়াকে সড়কে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী অভিনন্দন জানান : নাসিম সিকদার

অসুস্থ খালেদা জিয়াকে গত সাত বছর কম নিপীড়ন সহ্য করতে হয়নি। ছিলেন কারাবন্দী। চরম অসুস্থতা তাকে নিদারুণ ভুগিয়েছে। যথাযথ চিকিৎসা হয়নি, জীবন ছিল সঙ্কটাপন্ন। কিন্তু তার দীর্ঘ আপসহীনতা আর দৃঢ়চেতা মনোবল সেই মলিন অধ্যায়কে যেন আরো একবার পেছনে ফেলে দিয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পলায়নের পর মুক্ত বাতাসের স্বাদ পান তিনি। এরপর বিদেশে উন্নত চিকিৎসা শেষে গতকাল আবারো দেশের মাটিতে রাজসিক প্রত্যাবর্তন ঘটেছে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর। রাজপথে নেমে এসে উচ্ছ্বসিত জনতা তাকে বরণ করে নেন প্রাণখোলা ভালোবাসায়।

1st-1.2

বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে আসার পথে বেগম খালেদা জিয়া : নয়া দিগন্ত

উন্নত চিকিৎসার অভাবে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা দিনকে দিন অবনতির দিকে যাচ্ছিল। এই হাসপাতাল-এই বাসা, এভাবেই কেটেছে গত তিন বছর। লিভারে রক্তক্ষরণ হওয়ায় ২০২৩ সালে তিনি একবার বাসায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। উন্নত চিকিৎসার দাবি বারবার করা হলেও কর্ণপাত করেনি পতিত স্বৈরাচার। অবশেষে গত ৭ জানুয়ারি তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। সেখানে চার মাসের চিকিৎসা শেষে শারীরিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গতকাল ভিন্ন এক মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা নিয়ে দেশে ফেরেন বেগম জিয়া।

সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে বিএনপি চেয়ারপারসনকে বহনকারী কাতারের আমিরের দেয়া এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করে। অন্যদের মধ্যে এ সময় তার সাথে ছিলেন দুই পুত্রবধূ ডা: জুবাইদা রহমান ও সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথি। বিমানবন্দরে খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহেমদসহ অন্যরা। এরপর বেলা সোয়া ১১টার দিকে খালেদা জিয়াকে বহনকারী সাদা রঙের গাড়ি বিমানবন্দর থেকে রওনা দিয়ে খিলক্ষেত, কুর্মিটোলা, নৌসদর দফতর হয়ে গুলশানের ফিরোজায় পৌঁছায়। বিমানবন্দর থেকে কিলো দশেকের এই পথে হাজার হাজার নেতাকর্মীর সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করে তার বাসায় পৌঁছতে লেগে যায় ২ ঘণ্টারও বেশি। বিএনপি নেত্রী সাধারণত গাড়ির সামনে না বসলেও গতকাল তিনি ছিলেন সামনের আসনে। গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কে ফিরোজায় পৌঁছার পর বেগম জিয়া ধীরে ধীরে হেঁটে বাসার ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় তাকে সহায়তা করেন দুই পুত্রবধূ।

ফিরোজায় খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানান তার মেজো বোন সেলিমা ইসলাম, ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার, শামীমের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা, জোবাইদা রহমানের বড় বোন শাহীনা জামান বিন্দু এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা। খালেদা জিয়ার জন্য ‘ফিরোজা’ পুরোপুরি প্রস্তুত করে রাখা ছিল আগে থেকেই।

লন্ডনে চার মাস : ৭৯ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন থেকে লিভার সিরোসিস, কিডনি, হার্ট, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিসসহ নানা শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির পাঠানো রাজকীয় বহরের বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে গত ৭ জানুয়ারি লন্ডনে যান। সেখানে লন্ডন ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক প্যাট্রিক কেনেডি ও অধ্যাপক জেনিফার ক্রসের তত্ত্বাবধায়নে চিকিৎসাধীন ছিলেন। টানা ১৭ দিন ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি ২৫ জানুয়ারি থেকে ছেলে তারেক রহমানের বাসায় ছিলেন। গত ৪ মার্চ বেগম জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছিলেন, ‘ম্যাডাম মোটামুটি আগের চেয়ে অনেকটা সুস্থ বোধ করছেন। মানসিক প্রশান্তি উনার শারীরিক সুস্থতার পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।’ দেশে ফেরার জন্য সোমবার দুপুরে খালেদা জিয়া লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হন। তার বড় ছেলে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই গাড়ি চালিয়ে মাকে বিমানবন্দরে নিয়ে যান। তারেকের মেয়ে জায়মা রহমানও তাদের সাথে ছিলেন।

বিএনপি চেয়ারপারসনকে বিদায় জানাতে দলটির প্রবাসী নেতাকর্মীরাও হিথ্রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভিড় করেন। বিদায় বেলায় টার্মিনালে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। হুইল চেয়ারে বসা খালেদা জিয়াকে জড়িয়ে ধরেন ছেলে তারেক ও নাতনী জায়মা। ছেলেকে দেখিয়ে বিমানবন্দরে উপস্থিত বিএনপি কর্মীদের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, ‘ভাইয়াকে দেখে রেখো।’

রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ নেয় ফেরা : ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে যেদিন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়, সেদিনই বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তারেক রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়। এরপর সোয়া সাত বছর ধরে লন্ডন থেকে তিনি দল চালাচ্ছেন। আর দেশে সকল ঝড়-ঝাপটা সামলে বিএনপিকে টিকিয়ে রেখেছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতা। ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার খালেদা জিয়াকে নির্বাহী আদেশে সাময়িক মুক্তি দেয়। কিন্তু দুই শর্তের কারণে তিনি কার্যত বন্দী ছিলেন বাসা আর হাসপাতালের জীবনে। রাজনৈতিক কোনো কর্মকাণ্ডে তাকে আর দেখা যায়নি। ৫ আগস্ট ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি সাজা মওকুফ করে খালেদা জিয়াকে পুরোপুরি মুক্তি দেন। কিন্তু ৭৯ বছর বয়সে নানা অসুস্থতা নিয়ে দলের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তার সরাসরি অংশ নেয়া হয়নি। চিকিৎসা নিয়ে লন্ডন থেকে তার এই ফেরার যাত্রা কার্যত রাজনৈতিক কর্মসূচিতেই রূপ নেয়।

লন্ডনের স্থানীয় সময় সোমবার বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে খালেদা জিয়াকে নিয়ে হিথ্রো বিমানবন্দর ত্যাগ করে কাতারের আমিরের এয়ার অ্যাম্বুলেন্স। পথে দোহায় যাত্রা বিরতি দিয়ে উড়োজাহাজটি ঢাকায় পৌঁছায় সকালে।

ফেরার পথে দুই পুত্রবধূ ছাড়াও তার সঙ্গী হয়েছেন ১৩ জন। সফরসঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন তার মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান শাহাবুদ্দিন তালুকদার, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এ জেড এম জাহিদ হোসেন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য এনামুল হক চৌধুরী, নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল, লন্ডন বিএনপির সভাপতি এম এ মালেক ও সাধারণ সম্পাদক কয়ছর এম আহমেদ।

জনস্রোত, উচ্ছ্বাস : প্রিয় নেত্রীকে বরণ করে নিতে ভোরের আলো ফোটার পর থেকেই থেকেই ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বিমানবন্দর সড়কে জড়ো হতে শুরু করেন। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী তারা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের খিলক্ষেত, কুর্মিটোলা, বনানী, কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ে অবস্থান নেন। পিকআপ কিংবা বাসে করে গান বাজাতে বাজাতে তারা দলের পতাকা, দেশের পতাকা নিয়ে উপস্থিত হন সড়কে। কেউ কেউ মাথায় দলের পতাকা লাগিয়ে আসেন। কারো হাতে শোভা পায় দলীয় ব্যানার, ফেস্টুন। কোনো কোনো গ্রুপ আসেন ব্যান্ডপার্টি নিয়ে। এয়ারপোর্ট থেকে বাসা পর্যন্ত বেগম জিয়ার গাড়ির সামনে-পেছনে স্লোগানমুখর ছিলেন হাজার হাজার নেতাকর্মী। বেগম জিয়া এ সময় হাত নেড়ে নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। জনস্রোত ঠেলে বেগম জিয়ার গাড়ি সামনে এগোতে রীতিমতো বেগ পেতে হয়। বাসার পথে ১০ কিলোমিটার পথ তিনি পাড়ি দেন দুই ঘণ্টায়। বিএনপি প্রধানকে শুভেচ্ছা জানাতে দলের সিনিয়র নেতারাও এ সময় ছিলেন বিভিন্ন সড়কের ফুটপাথে।

খালেদা জিয়া সুস্থ আছেন : বেগম জিয়া বাসায় প্রবেশ করার পর ‘ফিরোজা’র সামনে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘চিকিৎসার পর তিনি অনেকটুকু সুস্থ আছেন এবং মানসিকভাবেও উনি স্ট্যাবল (শক্ত) আছেন। যদিও ১৪ ঘণ্টার ভ্রমণের কারণে তিনি কিছুটা অবসন্ন। আমরা তার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই।’ বিএনপি চেয়ারপারসন সবাইকে শুভেচ্ছা, সালাম ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বলে জানান ডা: জাহিদ হোসেন। খালেদা জিয়ার জন্য কাতারের পক্ষ থেকে বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স দেয়ায় দেশটির সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, কাতার সরকার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এটি দিয়েছে। এ সহায়তার মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের সাথে তাদের যে সম্পর্ক, তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদার, অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিক, অধ্যাপক নুর উদ্দিন আহমেদ, ডা: জাফর ইকবাল, ডা: আবদুল্লাহ আল মামুন, বিএনপির আহমেদ আজম খান, আসাদুজ্জামান রিপন, আমান উল্লাহ আমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, শাম্মী আখতার, নিলোফার চৌধুরী মনি, সাইফ আলী খান, আতিকুর রহমান রুমন, শায়রুল কবির খান, শামসুদ্দিন দিদার, আবদুল মোনায়েম মুন্না, নুরুল ইসলাম নয়ন, এস এম জিলানী, লন্ডন বিএনপির সভাপতি এম এ মালেক, সাধারণ সম্পাদক কয়ছর এম আহমেদসহ কেন্দ্রীয় ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

এরপর চেয়ারপারসনের বাসভবনের সামনে ভিড় না করতে নেতাকর্মীদের প্রতি অনুরোধ জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকেরা বেগম জিয়াকে কমপক্ষে আট ঘণ্টা সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাই কেউ এখানে স্লোগান দেবেন না, ভিড় করবেন না। দয়া করে আপনারা সবাই এখন যার যার বাড়িতে ফিরে যান। পরে সময় হলে আপনাদের সাথে তিনি কথা বলবেন।’

কড়া নিরাপত্তা : খালেদা জিয়ার দেশে ফেরা উপলক্ষে নেতাকর্মীদের ভিড় সামলাতে ঢাকা মহানগর পুলিশও বিমানবন্দর সড়কে যানচলাচল নিয়ন্ত্রণ করার কথা জানায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচলের সুযোগ রাখা হয় গতকাল। ঢাকা সেনানিবাসের রাস্তায় হালকা যানবাহন চলাচলের সুযোগও থাকে। নেতাকর্মীদের অবস্থান ঘিরে সড়কে ও বিমানবন্দর এলাকায় বিপুলসংখ্যক সেনাসদস্য, পুলিশ, র‌্যাব, এপিবিএন ও আনসার সদস্যকে অবস্থান নিতে দেখা যায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরা ঘিরে ঢাকার সড়কে যানজট হতে পারে, এমন শঙ্কায় বিদেশগামী যাত্রীদের বিমানবন্দরে যেতে হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে বের হওয়ার অনুরোধ করে এয়ারলাইন্সগুলো। বিমানবন্দর এলাকায় নেয়া হয় কড়া নিরাপত্তা।