র্যাম্পের অভাবে চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সুফল বঞ্চিত নগরবাসী
সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে গাড়ি চলে লক্ষ্যমাত্রার ২০ শতাংশ
Printed Edition
আরফাত বিপ্লব চট্টগ্রাম ব্যুরো
ঢাকঢোল পিটিয়ে যাত্রা শুরুর দুই বছর পার হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি চট্টগ্রামের একমাত্র এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। চার হাজার ২৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পের সুফল পরিপূর্ণভাবে ভোগ করতে পারছে না নগরবাসী। নগরীর লালখান বাজার থেকে দীর্ঘ ১৫ কিলোমিটারের এই উড়াল সড়ক পতেঙ্গা পর্যন্ত বিস্তৃত; কিন্তু র্যাম্পগুলোর পরিপূর্ণ কাজ শেষ না হওয়ায় মধ্যপথে উড়াল সড়কটিতে নির্বিঘেœ গাড়ি ওঠানামা করতে পারে না।
বিগত ২০২৪ সালে উড়াল সড়কটিতে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয় যান চলাচল। পরে ২০২৫ সালের ৪ জানুয়ারি পতেঙ্গা প্রান্তে টোল আদায়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক যান চলাচল শুরু হয়। তবে উড়াল সড়কে ওঠানামার জন্য বিভিন্ন স্থানে ৯টি র্যাম্প নির্মাণ করার কাজ শুরু হলেও তা দুই বছরেও পূর্ণতা লাভ করেনি। বর্তমানে শুধু টাইগারপাসে র্যাম্পের কাজ শেষ হয়েছে। সেটিতেও এখনো যান চলাচল শুরু করা যায়নি। আরো দুইটি র্যাম্পের কাজ শেষ হলেও নানা প্রতিবন্ধকতায় আটকে আছে কাজের সমাপ্তি।
জানা গেছে, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, বিগত বছর উড়াল সড়কে প্রতিদিন গড়ে যান চলাচল করার কথা ছিল ৩৯ হাজার ৩৮৮টি। অথচ ওই বছর প্রতিদিন যান চলেছে মাত্র আট হাজার ১২১, যা লক্ষ্যমাত্রার ২০ শতাংশ।
এ দিকে নগরীর জিইসি মোড় থেকে ওঠার র্যাম্পে কাজ শুরু হলেও শেষ করা যাচ্ছে না। কারণ র্যাম্পটির মুখে পিডিবির খুঁটি রয়েছে। সেই খুঁটি সরাতে ২০২২ সালের শেষের দিকে উদ্যোগ নেয় সিডিএ। সে সময় সাত কোটি ২৪ লাখ টাকা পিডিবিকে দেয় সিডিএ; কিন্তু অদৃশ্য কারণে সবগুলো খুঁটি সরেনি তিন বছরের অধিক সময়েও।
এ বিষয়ে পিডিবি বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ জানায়, সিডিএ’র চাহিদা অনুযায়ী খুঁটি সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ওই এলাকায় বিদ্যুতের তার মাটির নিচে নেয়ার জন্য জায়গা নির্ধারণ করে দেয়ার কথা ছিল সিডিএ’র। তারা সেটি করে না দেয়ায় বাকি খুঁটি সরানো যায়নি।
টাইগারপাস এলাকায় উড়াল সড়ক থেকে নামার র্যাম্পের মুখে সংযোগ সড়ক সম্প্রসারণ ও আগ্রাবাদ থেকে ওঠার র্যাম্প নির্মাণ করতে ২০২৪ সালে ১২ হাজার ৭৮৯ বর্গফুট জমি চাওয়া হয়। তবে এখনো জমি বুঝে পায়নি সিডিএ। এ বিষয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে ‘ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য সিডিএ’কে চিঠি দেয়া হয়েছে। ক্ষতিপূরণের টাকা পেলে ব্যবসায়ীরা সেখান থেকে উঠে যাবেন এবং জায়গাটি সিডিএ’কে বুঝিয়ে দেয়া হবে।
আবার নগরীর ফকিরহাটে নামার র্যাম্পের মুখে সিএমপি বন্দর থানার ফাঁড়ি রয়েছে; কিন্তু সিএমপি ফাঁড়ির একতলা ভবনটি সরিয়ে না নেয়ায় র্যাম্প নির্মাণকাজ শেষ করা যাচ্ছে না। সে বিষয়ে সদুত্তর মেলেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
গার্মেন্টস শিল্প এলাকা সিইপিজেডে ওঠানামার জন্য দু’টি র্যাম্প রয়েছে। এতে সড়কের পাশের নালাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নগরের প্রধান সড়কও বেহাল। সূত্র বলছে, নালা সংস্কারের জন্য সিটি করপোরেশনকে গত বছরের জুনে প্রায় তিন কোটি টাকা দিয়েছে সিডিএ। সাত মাস পার হতে চললেও নালা সংস্কার করেনি সিটি করপোরেশন, যার কারণে ইপিজেড এলাকার সড়কও সংস্কার করতে পারছে না সিডিএ; আটকে আছে র্যাম্প নির্মাণের কাজও। জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা কমান্ডার ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, সংস্কারের কাজটি করছে নৌবাহিনী। ইতোমধ্যে দাফতরিক সব প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে কাজ শুরু হবে। কর্ণফুলী ইপিজেড এলাকায় ওঠার র্যাম্প নির্মাণ আটকা পড়েছে ভিন্ন কারণে। এখানে অন্তরায় স্থানীয় লোকজন। ব্যক্তিমালিকানাধীন স্থাপনা উচ্ছেদ করেই র্যাম্প নির্মাণ করতে হবে; কিন্তু প্রকল্পটির অর্থছাড় বন্ধ থাকায় এখনো ক্ষতিপূরণের তালিকা তৈরি করতে পারেনি সিডিএ।
যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প পরিচালক ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী মো: মাহফুজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, এত বড় প্রকল্পের সুফল চট্টগ্রাম নগরবাসী পাচ্ছে না এটা সত্য। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করি। বিশেষ করে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে আমরা চিঠি দিয়ে জানিয়েছি, আমরা ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনকে ক্ষতিপূরণ দিতে প্রস্তুত। আপনারা তালিকা দিন; কিন্তু তারা তালিকাও দিচ্ছেন না আবার তাদেরকে উচ্ছেদও করছেন না। এমনকি চলতি মাসের ৬ তারিখ তালিকা দেয়ার কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে তারা দেয়নি। এ সময় কিছুটা ক্ষোভের সাথে তিনি বলেন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালির কারণে বিশাল জনগোষ্ঠী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে রেলওয়ে বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা খোরশেদ আলম চৌধুরীর নির্ধারিত ফোন নাম্বারে বারবার যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া জিইসি মোড়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার আরসিসির পিট আছে। এটি সরিয়ে নিতে গত বছরের ৩০ জুন তিন কোটি ১৭ লাখ টাকা ওয়াসাকে দেয়া হয়। বারবার তাগাদাপত্র দিলেও পিটটি সরিয়ে নেয়নি ওয়াসা। ওয়াসা কর্তৃপক্ষ কেন পিট সরিয়ে নিচ্ছেন না তা তিনি জানেন না। তিনি বলেন, আমরা কোহিনূর পর্যন্ত কাজ করেছি; কিন্তু ওয়াসা কর্তৃপক্ষ পিটটি সরিয়ে না নেয়াতে এটার কাজও কমপ্লিট করতে পারছি না।
তবে সংশ্লিষ্ট দু’টি সংস্থা আন্তরিক হলে আগামী চার/পাঁচ মাসের মধ্যে সবগুলো র্যাম্পের কাজ শেষ হবে এবং নগরবাসী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন বলে আশা করেন তিনি। নগর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্প পাসের ব্যবস্থাতে গলদ রয়ে গেছে। যেনতেনভাবে প্রকল্প পাস করা হয়। পরে অংশীজন নানাবিধ বাধার মুখে পড়ে। প্রকল্প একনেকে যাওয়ার আগে সব সেবা সংস্থার সাথে বসে যদি কোথায় কার লাইন আছে সেগুলো কিভাবে সরানো হবে তা নির্ধারণ করা হতো, তাহলে এ সমস্যা তৈরি হতো না। সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পের সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করতে পারত নগরবাসী। নতুন সরকারের আমলে সামনে বন্দরনগরীতে আরো বেশ কয়েকটি প্রকল্প যাত্রা শুরু করতে পারে। সেগুলোতে বিষয়টি বিবেচনা করলে চট্টগ্রামবাসী উপকৃত হবে।