টিটিসির কার্যক্রম এখন পর্যবেক্ষণ করবে মাঠ প্রশাসন

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো থেকে ১১০ অধ্যক্ষকে চিঠি

মনির হোসেন
Printed Edition

দেশের প্রতিটি জেলা এবং উপজেলার কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সার্বিক কার্যক্রম এখন থেকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। পরিদর্শন করার সময় এসব কর্মকর্তাদের সব ধরনের সহযোগিতা দেয়ার জন্য জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো থেকে সব কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষকে নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। একই সাথে এর অনুলিপি দেয়া হয়েছে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার একান্ত সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো: মাসুদ রানা স্বাক্ষরিত গত সপ্তাহের এক চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কর্তৃক বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় পরিচালিত কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর (টিটিসি) কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং এসব কেন্দ্রের ট্রেনিং প্রক্রিয়া, অবকাঠামো, উপকরণ ব্যবহারের অবস্থা এবং প্রশিক্ষণার্থীদের অংশগ্রহণের বিষয়ে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের (বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার) দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, দেশের বেশ কয়েকটি জেলা এবং উপজেলায় টিটিসির অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি চলছে। আবার কোথাও কোথাও জাল জালিয়াতির ঘটনাও ঘটছে। এমন তথ্য উল্লেখ করে সম্প্রতি নয়া দিগন্তে সরজমিন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

সংশ্লিষ্টদের দেয়া সূত্র মোতাবেক, ওই প্রতিবেদনে দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহীসহ কয়েকটি টিটিসির অভ্যন্তরে কিভাবে অনিয়ম দুর্নীতি হচ্ছে এবং এর সাথে কারা জড়িত সেগুলোর কিছু চিত্র তুলে ধরা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সদ্য নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্লা ভূঁইয়ার নির্দেশনায় জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক সালেহ আহমদ মোজাফফর দিনাজপুর টিটিসির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাসুদ রানা ছাড়াও বেশকিছু জেলার অধ্যক্ষ, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, চিফ ইনস্ট্রাক্টর, ইনস্ট্রাক্টরসহ ১৯ জন কর্মকর্তাকে নতুন জায়গায় পদায়ন করে বদলির নির্দেশ দেন।

গতকাল রোববার সন্ধ্যার আগে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের ডিজি সালেহ আহমদ মোজাফফর স্যার নতুন করে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। এরপর তিনি বিদেশগামী কর্মীদের বহির্গমন ছাড়পত্র দেয়ার জন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে আমূল পরিবর্তন আনেন। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেন অতিরিক্ত মহাপরিচালক এম এ হাই (কর্মসংস্থান)। পাশাপাশি দেশের জেলা-উপজেলার কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর ওপরও ডিজি স্যার বিশেষভাবে নজরদারি শুরু করেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, কোনো কোনো টিটিসিতে বিদেশগামী প্রশিক্ষণার্থীদের কী ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে সে ব্যাপারে প্রতিনিয়ত তিনি খোঁজখবর নিচ্ছেন। শুধু তাই, কোনো প্রশিক্ষণার্থী যাতে (বিগত দিনে ট্রেনিং ছাড়াই হাজার হাজার ভুয়া সার্টিফিকেট টাকার বিনিময়ে পাওয়া যেত) সার্টিফিকেট নিতে না পারেন সে ব্যাপারেও অধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।

সিলেট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, বিদেশগামী কর্মীদের তিন দিনের ট্রেনিং নেয়া বাধ্যতামূলক। এই ট্রেনিং তারা সঠিকভাবে নিচ্ছে কি না সে ব্যাপারে ডিজি স্যারের নির্দেশনায় বুকের মধ্যে ভিডিও ক্যামেরা লাগিয়ে প্রশিক্ষণ করানোর নির্দেশনা রয়েছে। এতে বিদেশগামীদের উপস্থিতি এবং প্রশিক্ষণ না নিয়ে সার্টিফিকেট নেয়ার প্রবণতা কমেছে। একমাত্র সিলেট টিটিসিতেই রান্নাবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে এবং অনেকে আগ্রহ নিয়ে ট্রেনিংয়ে অংশ নিচ্ছেন।

কক্সবাজার রামু উপজেলায় স্থাপিত টিটিসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, টিটিসিগুলোকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম দুর্নীতি হচ্ছে এমনটা আমরা শুনছি। তবে আমাদের এখানে কোনো অনিয়ম দুর্নীতির সুযোগ নেই। এখানে যারা ট্রেনিং নিতে ভর্তি হচ্ছেন তাদের সবাইকে স্বচ্ছ এবং দক্ষ প্রশিক্ষক দিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

অবশ্য গতকাল উত্তরবঙ্গের একটি জেলার এক অভিজ্ঞ অধ্যক্ষ নিজের নাম না প্রকাশের শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, কিছু টিটিসির অভ্যন্তরে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উঠার পরই আমাদের ডিজি স্যার সেখানকার কোথায় কোথায় এবং কারা দুর্নীতি করছে তাদের খুঁজে বের করতে নিজস্ব সোর্স দিয়ে বের করার চেষ্টা করছেন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে সময় মতো ঠিকই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে অভিযোগের সূত্র ধরে ১৯ কর্মকর্তাকে তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে বদলি করেছেন। যদিও দিনাজপুর টিটিসির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাসুদ রানাকে সরিয়ে যাকে সেখানে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তার বিরুদ্ধেও ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। আবার যেসব অভিজ্ঞ অধ্যক্ষ এবং চিফ ইনস্ট্রাক্টররা বিদেশগামী কর্মীদের জন্য নির্বিঘেœ সেবা দিচ্ছেন, তাদেরকে কিছু কর্মকর্তারা রাজনৈতিক বিবেচনায় দূরে সরিয়ে রাখতে পছন্দ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্টদের কাছে ভুক্তভোগীরা দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, শুধুমাত্র সঠিক ট্রেনিংয়ের অভাবের কারণেই দেশের টিটিসিগুলো থেকে দক্ষ কর্মী বের হচ্ছে না। যা নতুন করে পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পাওয়া মাঠ প্রশাসনের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কর্মকর্তারা অনুসন্ধান করলেই খুঁজে পাবেন বলে মনে করছেন বঞ্চিতরা।