বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা

দেশে পট-পরিবর্তনের পর মিশনগুলোতে আগের সরকারের সময়ে নানা উপায়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে এক ধরনের অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারাই মূলত যতটা পারছেন গা বাচিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছেন।

মনির হোসেন
Printed Edition
Foreign-Ministry

বিদেশের বাংলাদেশ মিশনগুলোর কর্মকাণ্ডে এখনও এক রকম স্থবিরতা বিরাজ করছে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের মধ্যে গাছাড়া ভাব লক্ষ্য করছেন সেবা নিতে যাওয়া নানা পেশার প্রবাসীরা। এর মধ্যে কোনো কোনো কর্মকর্তা কর্মচারী তাদের কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রবাসী বাংলাদেশীরা কাক্সিক্ষত সেবা না পেয়েই ফিরে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

তবে হাইকমিশন ও দূতাবাস সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার এমপি-মন্ত্রীদের দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং দেশে পট-পরিবর্তনের পর মিশনগুলোতে নানা উপায়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে এক ধরনের অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারাই মূলত যতটা পারছেন গা বাচিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছেন। আর এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমানো এবং ব্যবসা বাণিজ্যে জড়িত প্রবাসী বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের সেবার উপর। বিশেষ করে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কুয়েত, কাতার, জাপান এবং ইউরোপের দেশ ইতালি, রোমানিয়াসহ বেশ কয়েকটি মিশনের বিরুদ্ধে প্রবাসীদের ক্ষোভ, অভিমানের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। এর মধ্যে কোনো কোনো মিশনে সমস্যা সমাধানে টেলিফোন করলেও সাড়া মিলছে না। এর পর বাধ্য হয়ে তারা এসব মিশনের দায়িত্বরত কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মনের যত ক্ষোভ রয়েছে তা প্রকাশ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্বে বাংলাদেশের যতগুলো শ্রমবাজার রয়েছে তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে সৌদি আরব। এই মুহূর্তে দেশটিতে ২৫ লাখেরও বেশি বাংলাদেশী শ্রমিক অবস্থান করছেন। তবে এদের মধ্যে কতজন শ্রমিক বৈধভাবে যাওয়ার পর আনডকুমেন্ট অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান সৌদি আরবের রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাস এবং জেদ্দার কনসাল জেনারেল অফিস বা ঢাকার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে নেই। শুধু তাই নয়, কতজন শ্রমিক দেশটিতে যাওয়ার পর এখনো বেকার রয়েছেন এবং আউটপাস না পেয়ে কতজন শ্রমিক দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন তারও কোনো সঠিক হিসাব নেই।

রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে শেখ তুষার নামের একজন শ্রমিক বলেন, আপনাদের মাধ্যমে অনেকেই ৭ মাস আগে এক্সিটের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু অদ্যাবধি কোনো মেসেজ আসে নাই। হুরুরে যারা থাকে তারা আপনাদের দিকে তাকিয়ে থাকে বৈধ হওয়ার জন্য। এমন অসংখ্য অভিযোগ আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এভাবে আমাদেরকে আশ্বাস না দিয়ে প্রতিটি কাজ কনফার্ম করলে আমাদের জন্য সুবিধা হতো। কিন্তু একই কাজ দালালকে দিলে তারা ৫ দিনের ভেতরে করে দিচ্ছে। আশা করছি আপনারা সুবিধা দিতে এসে আমাদেরকে হতাশ করবেন না, চিন্তায় ফেলবেন না। দয়া করে এই বিষয় নিয়ে কমেন্ট করে উত্তর দিয়ে যাবেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

অভিযোগ আছে সৌদি আরবে যাওয়া শ্রমিকদের বেশির ভাগ যারা বিপদের মধ্যে আছেন তাদের অনেকেই ৩ মাসের ফ্রি ভিসায় গিয়ে বিপদে পড়েছেন। তারা এখন সেখানে যাওয়ার পর একদিকে যেমন কাজ পাচ্ছেন না, তেমনি আকামা না থাকায় পুলিশের ভয়ে পালিয়ে জীবন যাপনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে দেশে ফেরা শ্রমিকদের কাছ থেকে অভিযোগ রয়েছে। দেশে ফেরা শ্রমিকদের কেউ কেউ বলছেন, দূতাবাস ও কনসাল জেনারেল অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীরা এখন প্রবাসীদের সঠিক সেবা না দিয়ে নানাভাবে হয়রানির চেষ্টা করছেন। এদের অনেকেই আওয়ামী আমলের রিক্রুট হওয়ায় তাদের মধ্যে আবার কেউ কেউ গা ছাড়া ভাব দিয়ে কাজ করছেন।

শুধু সৌদি আরব নয়, আরেক গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার কুয়েতের বাংলাদেশ দূতাবাসেও অনেকটা স্থবিরতা বিরাজ করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া মিনিস্টার লেবার আবুল হোসেন, কাউন্সিলর ও দূতালয় প্রধান মনিরুজ্জামান ছাড়া স্থানীয়ভাবে নিয়োগ পাওয়া ফরিদ, তৌহিদ, জসিম, আনোয়ারসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা কর্মচারী প্রবাসীদের সেবার পরিবর্তে হয়রানি করছেন। তবে এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার পাসপোর্ট, নবায়ন করানোসহ নানাভাবে প্রবাসীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ আছে, পাসপোর্ট নবায়নের সিন্ডিকেট বেশি হয়রানি করছে প্রবাসীদের। আবার দূতাবাসের কেউ কেউ আওয়ামী ট্যাগ থাকায় তারা কাজে ফাঁকি দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকার চেষ্টা করছেন।

গতকাল বাংলাদেশের দ্বিতীয় শ্রমবাজার মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে জনৈক ব্যবসায়ী নয়া দিগন্তকে নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশনে অনেকটা স্থবিরতা বিরাজ করছে। এই অবস্থায় হাইকমিশনার শামীম আহসান একজন দক্ষ কূটনৈতিক হওয়ার পরও নীরবে সময় পার করার চেষ্টা করছেন। এই সুযোগে মিনিস্টার লেবার বিভাগের কোনো কর্মকর্তা পরিবার নিয়ে ছুটিতে আবার কোনো কর্মকর্তা পিএইচডি ক্লাস করে সময় পার করছেন। অভিযোগ আছে, হাইকমিশনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী আওয়ামী আমলে নিয়োগ পাওয়া। তারা অভ্যুত্থানের পর থেকেই অনেকটা নিষ্ক্রিয়।

কুয়ালালামপুর ক্লানতান এলাকার একটি কোম্পানির কর্মচারী সোলেমান কলিং ভিসায় গেলেও অন্যত্র কাজ করছেন কন্ট্রাক্টে। কিন্তু কাজ করানোর পরও ৩-৪ মাস ধরে তাকে বেতন দিচ্ছে না। তিনি এমন অভিযোগ জানাতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গেলে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের না পেয়ে ফিরে যান। শুধু সোলেমান নয়, অনেক প্রবাসী হাইকমিশনে গিয়ে সেবা পাচ্ছেন না। আবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অধীনস্থ কর্মকর্তা কর্মচারীরা প্রবাসীদের পাসপোর্ট, ট্রাভেল পাসসহ অন্যান্য সেবা দেয়ার সুযোগ থাকলেও স্যারদের পারমিশন না থাকার কথা বলে তারাও করছেন না। এমন স্থবিরতার কারণে ১৫ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশীর দেশে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে তারা প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। তবে কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যারা পাসপোর্ট নবায়ন থেকে শুরু করে অন্যান্য সেবা নিতে আসছেন তাদের কাজ দ্রুত হয়ে যাচ্ছে। তাই বিদেশের বাংলাদেশ মিশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের উপর পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নজরদারি আরো জোরদার করার পাশাপাশি যোগ্য কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়ে সেবা নেয়ার সুযোগ দেয়ার জন্য প্রবাসী বাংলাদেশীদের পক্ষ থেকে জোর দাবি জানানো হয়েছে।