গাজায় আরো ইসরাইলি হামলা শিশুসহ নিহত ২১

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • রাফাহ সীমান্তে ইসরাইলের বাধায় গাজার রোগীরা
  • অন্যান্য সীমান্ত খোলার আহ্বান জাতিসঙ্ঘের

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চললেও গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর হামলা অব্যাহত রয়েছে। এতে গতকাল বুধবার গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে কয়েকজন শিশুও রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র। ফিলিস্তিনের সরকারি বার্তা সংস্থা ওয়াফা স্বাস্থ্য সূত্রের বরাতে জানায়, মঙ্গলবার সকালে ইসরাইলি বাহিনী পূর্ব গাজা সিটি ও দক্ষিণ খান ইউনিসে গোলাবর্ষণ চালায়। গাজা সিটির জেইতুন ও তুফফাহ এলাকায় বেসামরিক তাঁবু ও বসতবাড়িতে গোলাবর্ষণে ১৪ জন নিহত হন, আহত হন আরো অনেকে। খান ইউনিসের কিজান রাশওয়ান এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের তাঁবুতে হামলায় প্রাণ হারান চারজন, যাদের মধ্যে একটি শিশু রয়েছে। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানায়, মাওয়াসি এলাকায় পৃথক হামলায় দু’জন নিহত ও ১০ জন আহত হন। নিহতদের একজন ছিলেন স্বাস্থ্যকর্মী হুসেইন আল-সামিরি। সংস্থাটি আরো জানায়, যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও বেসামরিক ও চিকিৎসাকর্মীরা প্রতিনিয়ত হামলার শিকার হচ্ছেন, যা মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলের চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭১ হাজার ৮০০ জনের বেশি নিহত এবং এক লাখ ৭১ হাজার ৫৭৫ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাবে জানানো হয়।

রাফাহ সীমান্তে ইসরাইলের বাধায় গাজার রোগীরা

গাজার রাফাহ সীমান্ত দিয়ে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ফিলিস্তিনিদের বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার মাত্র ১৬ জন ফিলিস্তিনি রোগী মিসরে যেতে পেরেছেন, যা প্রতিদিন উভয় দিকে ৫০ জন যাতায়াতের ঘোষিত কোটা থেকে অনেক কম। এর আগের দিনে মাত্র ৫ জন রোগী গাজা ছাড়তে পেরেছিলেন, বিপরীতে ১২ জন ফেরত প্রবেশের অনুমতি পান। মিসরীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, সোমবার প্রায় ১৫০ জন গাজা ছাড়বে এবং ৫০ জন প্রবেশ করবে, কিন্তু বাস্তবে সেই সংখ্যা পূরণ হয়নি।

খান ইউনিস থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক হিন্দ খোদারি জানান, রাফাহ সীমান্তে দীর্ঘসূত্রতা ও অকারণ বিলম্ব চলছে। কেন এই বিলম্ব, সে বিষয়ে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যাখ্যা দিচ্ছে না। পুরো প্রক্রিয়াটি অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রাফাহ সীমান্ত গাজার একমাত্র প্রবেশপথ, যা ইসরাইলের ভেতর দিয়ে যায় না। ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরাইলি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর থেকে সীমান্তটি কার্যত বন্ধ ছিল। বর্তমানে সীমিতভাবে চালু হলেও এর সুফল পাচ্ছেন না গুরুতর অসুস্থ রোগীরা। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০ হাজার রোগী বিদেশে জরুরি চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে, এই বিলম্ব অব্যাহত থাকলে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু আরো বাড়বে।

রাফায় ফিরতে গিয়ে নির্যাতনের

শিকার ফিলিস্তিনি নারীরা

রাফাহ সীমান্ত দিয়ে গাজায় ফেরার সময় ইসরাইলি বাহিনীর হাতে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন ফিলিস্তিনি নারীরা। আলজাজিরা ও রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষ্যে তারা এই অভিজ্ঞতাকে ‘ভয়ের যাত্রা’ ও ‘মানসিক নির্যাতন’ বলে বর্ণনা করেছেন। সোমবার মাত্র ১২ জনের মধ্যে তিন নারী ও ৯ শিশু গাজায় প্রবেশের অনুমতি পান, যদিও তালিকায় ছিল ৫০ জন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সীমান্ত পার হওয়ার পর ইসরাইলি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় নারীদের শিশুদের থেকে আলাদা করা হয়, চোখ বেঁধে ও হাতকড়া পরিয়ে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রোটানা আল-রাকাব নামে এক নারী জানান, তাকে ও তার মাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটক রেখে রাজনৈতিক প্রশ্ন করা হয় এবং সন্তানদের কেড়ে নেয়ার হুমকি দেয়া হয়। তিনি বলেন, ইসরাইলি সেনারা তাদের গাজা ছাড়তে বাধ্য করার মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। অন্য নারীরাও জানিয়েছেন, খাবার, পানীয় ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র জব্দ করা হয়। এমনকি কয়েকজনের অভিযোগ, তাদের গুপ্তচর হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই আচরণ আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী এবং এটি গাজায় ফিরে আসা নিরুৎসাহিত করার একটি কৌশল।

অন্যান্য সীমান্ত খোলার আহ্বান জাতিসঙ্ঘের

গাজায় পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে রাফাহ সীমান্তের পাশাপাশি অন্যান্য সীমান্ত ক্রসিং খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘ। জাতিসঙ্ঘের মানবিক বিষয়ক সংস্থা ইউএনওসিএইচএর মুখপাত্র জেন্স লারকে বলেন, সীমিত পরিসরে রাফাহ খোলা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও এটি পর্যাপ্ত নয়। আনাদোলু এজেন্সিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে লারকে জানান, এখনো মিসর থেকে গাজায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশ করতে দেখা যায়নি। তিনি বলেন, গাজায় তীব্র শীতের কারণে আশ্রয়ের অভাবে অন্তত ১১টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। তার ভাষায়, মানবিক সঙ্কট মোকাবেলায় রাফাহসহ সব বন্ধ সীমান্ত খুলে ত্রাণ প্রবাহ বহুগুণ বাড়াতে হবে। লারকে জোর দিয়ে বলেন, ত্রাণের পরিমাণই প্রকৃত সূচক, শুধু সীমান্ত খোলাই যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক এনজিও, রেড ক্রস ও জাতিসঙ্ঘের সহায়তা নির্বিঘেœ পৌঁছানো নিশ্চিত করতে সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি।

রোগী স্থানান্তর স্থগিতে উদ্বেগ রেড ক্রিসেন্টের

ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, রাফাহ সীমান্ত দিয়ে রোগী ও আহতদের তৃতীয় দফার স্থানান্তর আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। সংস্থাটির মুখপাত্র রায়েদ আল-নিমস জানান, খান ইউনিসের রিহ্যাবিলিটেশন হাসপাতাল থেকে রোগীদের সরিয়ে নেয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন থাকলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পক্ষ থেকে শেষ মুহূর্তে স্থগিতের তথ্য জানানো হয়। খবর আনাদোলুর। তিনি বলেন, স্থানান্তর স্থগিতের কোনো সুস্পষ্ট কারণ জানানো হয়নি। অন্য দিকে ইসরাইলি সামরিক সংস্থা কোগাট দাবি করেছে, প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের তথ্য না পাওয়ায় এই বিলম্ব হয়েছে। রেড ক্রিসেন্ট অভিযোগ করে জানায়, ইসরাইল রাফাহ সীমান্তে কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। প্রবেশকারীদের কেবল একটি ব্যাগ, মোবাইল ফোন ও সীমিত নগদ অর্থ বহনের অনুমতি দেয়া হচ্ছে। খেলনা, পানি ও অন্যান্যসামগ্রী জব্দ করা হচ্ছে। সীমিত সংখ্যক মানুষকে পারাপারের অনুমতি দেয়ায় চিকিৎসা ও মানবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে সংস্থাটি সতর্ক করেছে।

গাজা পুনর্গঠনের আগে কঠোর শর্ত আরোপ নেতানিয়াহুর

গাজা উপত্যকার পুনর্গঠন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের কাছে কঠোর শর্ত তুলে ধরেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরাইলি দৈনিক মারিভ-এর খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জেরুসালেমে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নেতানিয়াহু স্পষ্ট বার্তা দেন যে, হামাসকে নিরস্ত্র ও গাজাকে পুরোপুরি সামরিকীকরণমুক্ত না করা পর্যন্ত কোনো পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু করা যাবে না। খবর মিডলিস্ট মনিটরের। বৈঠকে মোসাদের প্রধান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধানসহ শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন, যা ইসরাইলের কাছে বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরে। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাথে নতুন করে যোগাযোগ স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করছে।

মারিভ জানায়, ইসরাইল এই পর্যায়কে অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে মনে করছে এবং আগেভাগেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে কোনো চুক্তির পর প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থায় পড়তে না হয়। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানায়, নেতানিয়াহু উইটকফকে জানিয়েছেন, হামাস নিরস্ত্রীকরণ ও গাজার পূর্ণ সামরিক অবসানই পুনর্গঠনের পূর্বশর্ত।

ইসরাইলি নিরাপত্তা শর্তে ঝুঁকিতে ত্রাণকর্মীরা : এমএসএফ

ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ) জানিয়েছে, তারা তাদের কর্মীদের বিস্তারিত তথ্য ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের সাথে আর ভাগ করবে না। সংস্থাটি বলছে, ইসরাইল নিরাপত্তার কোনো নির্ভরযোগ্য নিশ্চয়তা দেয়নি, ফলে ত্রাণকর্মীদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে। খবর মিডলিস্ট মনিটরের। এম এস এফের বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন ইসরাইলের নিরাপত্তা বয়ানকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন ত্রাণকর্মীরাই হয়ে ওঠে সহিংসতার শিকার। গাজায় যুদ্ধ চলাকালে বহু ত্রাণকর্মী নিহত হলেও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ছিল সীমিত। সংস্থাটি আরো জানায়, মানবিক সহায়তাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা মানবিক নীতির পরিপন্থী। একাধিক ত্রাণ সংস্থা ইসরাইলের আরোপিত শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানালেও এর দায় তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে। এমএসএফ সতর্ক করে বলেছে, মানবিক সহায়তা কোনোভাবেই সহিংসতা ও দখলদারিত্বের আড়াল হতে পারে না এবং ত্রাণকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব।

হামাসকে নিরস্ত্র হতে দুই মাস সময় দেবে ট্রাম্পের ‘শান্তি বোর্ড’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গঠিত ‘শান্তি বোর্ড’ ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী সংগঠন হামাসকে নিরস্ত্র হতে দুই মাসের আলটিমেটাম দেবে বলে জানিয়েছেন ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ। সোমবার স্থানীয় সংবাদপত্র মাকর রিশোনে তিনি একথা বলেন। তিনি আরো বলেন, হামাস ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করবে না ইসরাইল। খবর মিডলিস্ট মনিটরের। ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী স্মোট্রিচ বলেন, ‘গাজায় হামাসের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। সেটি সামরিক, বেসামরিক কিংবা সরকারি- কোনোভাবেই নয়। আমরা অঙ্গিকার করেছি এবং এটিই যুদ্ধের মূল লক্ষ্য।’ তবে স্মোট্রিচের এ বক্তব্যের বিষয়ে ট্রাম্পের শান্তি বোর্ডের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তিনি দাবি করেন, ইসরাইলের সেনাবাহিনী গাজায় অর্ধেকের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সবকিছুর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আছে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ হলো নিরস্ত্রীকরণ। দুর্ভাগ্যবশত আমরা এটি তিন মাস আগে শুরু করিনি।’