ইরানি হামলায় হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি গোপন করছে তেলআবিব
Printed Edition
গত শুক্রবার রাত থেকে ইরানের ইতিহাসে ইসরাইলের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কেঁপে উঠেছে দেশটি। এ আগ্রাসনের পাল্টা জবাবে ইসরাইলের সামরিক অবকাঠামো, কৌশলগত কেন্দ্র আর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। ইরানের এ হামলায় নিহত ও আহত হয়েছে বহু ইসরাইলি। এ বাস্তবতাকে গোপন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে তেলআবিব প্রশাসন।
ইসরাইলের এ গোপনীয়তা নিছক দুর্ঘটনাজনিত নয়, বরং এক সচেতন কৌশল। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের হামলায় যে বিশাল পরিমাণে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেটি ইসরাইলি সমাজে যুদ্ধবিরোধী ক্ষোভ ও সমালোচনার জন্ম দিতে পারে। তাই ভিতরে ভিতরে কাঁপতে থাকা ইসরাইলি শাসক গোষ্ঠী জনগণের মনোবল ভেঙে পড়া ঠেকাতে তথ্য গোপনের আশ্রয় নিয়েছে।
তাসনিম বার্তা সংস্থার তথ্য অনুসারে, হামলার পর থেকেই ইসরাইলের ভেতরকার হিব্রু ভাষার গণমাধ্যম ও বিভিন্ন বিশ্লেষণমূলক খবরে বার বার এক কথা বলা হচ্ছে, সরকার ও সেনাবাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তথ্য গোপন করছে।
এ চুপ থাকার পেছনে রয়েছে যুদ্ধকালীন আইন। এ আইন অনুসারে, জরুরি অবস্থায় শাসক গোষ্ঠী তাদের শাসনাধীন ভূমির নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে এমন যেকোনো তথ্য গোপন রাখতে পারে। কিন্তু এ আইনের অজুহাতেই তেল আবিব সেখানকার জনতার চোখে ধুলো দিচ্ছে, এমন অভিযোগ তুলেছেন বহু বিশ্লেষক।
ইসরাইল স্টাডিজ প্রোগ্রামের পরিচালক আমতানেস শেহাদেহ আলজাজিরাকে বলেন, যখন কোনো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র বেসামরিক এলাকায় পড়ে, তখন সেটা সাথে সাথে প্রচার করে ইসরাইলি মিডিয়া। কিন্তু যখন সেই হামলা কোনো সামরিক বা কৌশলগত কেন্দ্রে আঘাত হানে, তখন সম্পূর্ণ নীরব থাকে। তিনি আরো বলেন, ইসরাইলি সেনাবাহিনীর নিজস্ব একটি ‘সেন্সরশিপ ইনস্টিটিউট’ আছে, যার মূল কাজই হলো সংবাদমাধ্যমকে নির্দিষ্ট তথ্য প্রচার করতে না দেয়া। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম নিজেরাও সেই সেন্সরশিপের নির্দেশ মেনে চলে।
রাজনৈতিক গবেষক মুহাম্মাদ গাজি আল জামাল বলেন, এ গোপনীয়তা নতুন কিছু নয়। গাজা যুদ্ধসহ আগের অনেক সংঘর্ষেই ইসরাইলি শাসক সত্য গোপন করেছে। পরবর্তীতে জানা গেছে, তেলআবিবের হিসাবের চেয়ে বহু গুণ বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। তার মতে, এ সংঘর্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু কতজন নিহত হলো তা নয়, বরং ইরান যেসব স্থাপনায় হামলা করেছে তা যেমন শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র ও বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন ‘ওয়েইজম্যান বিজ্ঞান কেন্দ্র’, যা ইসরাইলের প্রযুক্তি ও গবেষণার প্রাণকেন্দ্র, সেখানেও হামলা করেছে ইরান।
এ কৌশলগত আঘাত আসলে গোটা শাসকগোষ্ঠীকে বিপর্যস্ত করতে ইরানের সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইসরাইলি বিষয়ের বিশ্লেষক মুহান্নাদ মুস্তাফা বলেন, ইসরাইলি সমাজ আজ অভূতপূর্ব এক চোটের মধ্যে পড়েছে। ইরানে হামলার পর প্রথমে যারা উল্লসিত হয়েছিল, তারা এখন যুদ্ধের বাস্তব চেহারা দেখছে। দেখছে এক ভয়ানক দুঃস্বপ্ন।
তিনি বলেন, ইসরাইলের অভ্যন্তরে আগে কখনো এত বড় ধ্বংস দেখা যায়নি। ইসরাইল বরাবর যুদ্ধ করেছে অন্যের ভূমিতে। গাজা, লেবানন কিংবা সিরিয়ায় তারা যুদ্ধ করেছে, নিজের আঙিনায় নয়। কিন্তু ইরান যেভাবে তাদের নিজস্ব মাটিতে ধ্বংসের স্বাদ দিচ্ছে, তা ইসরাইলি জনগণের কাছে ভীতিকর।
এ বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধের খরচ ইসরাইলি সমাজ বহন করতে পারছে না। তারা ক্রমেই প্রশ্ন তুলছে এ যুদ্ধ কবে শেষ হবে? কিসের জন্য এ রক্তপাত? সরকার তাদের কতটা প্রতারণা করেছে? তিনি বলেন, আমরা আজ ইসরাইলি সমাজে যে আওয়াজ শুনছি, তা প্রমাণ করে, ক্যাবিনেট ও সেনাবাহিনী জনগণকে ভুল তথ্য দিয়ে যুদ্ধের খরচ আড়াল করতে চেয়েছিল এবং এখনো সেই প্রতারণা চলছে।
তথ্য যুদ্ধের আরেকটি অস্ত্র। কখনো তা গোলার চেয়ে বেশি কার্যকর। আজ ইসরাইল সে তথ্য অস্ত্রই ব্যবহার করছে নিজেদের জনগণের বিরুদ্ধে। কারণ তারা জানে, সত্য প্রকাশ পেলে কেবল তাদের সেনাঘঁাঁটি নয়, ভেঙে পড়বে শাসকের পুরো কাঠামোও।
ইরানের এ পরিকল্পিত হামলা শুধু একটি সামরিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং তথ্য ও মনস্তত্ত্বের যুদ্ধও বটে, যেখানে ইসরাইল ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে।