‘দক্ষ জনশক্তি-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ গড়তে উন্নয়ন পরিকল্পনা - ২
শিল্পের সাথে সংযুক্তি রেখে কর্মদক্ষতা বাড়ানোর চিন্তা
দেশ এবং বিদেশের আধুনিক শিল্পের সাথে সংযুক্তি রেখে আমাদের দেশের শিক্ষিত তরুণদের কর্মদক্ষতা বাড়ানোর ওপরও অধিকতর জোর দেয়া হচ্ছে।
Printed Edition
দেশে শিক্ষার হার বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না দক্ষ কর্মীর সংখ্যা। ফলে দেশে এখন শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অবস্থার উত্তরণে শিক্ষা কাঠামোর সব স্তরে কর্মমুখী শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করারও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে মাধ্যমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মমুখী শিক্ষার নানা বিষয় যুক্ত করার বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়েছে। একইসাথে শুধু স্কুল কলেজেই নয় মাদরাসা শিক্ষার্থীদের জন্যও তাদের সিলেবাসে কর্মমুখী তথা টেকনিক্যাল শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। সর্বোপরি দেশ এবং বিদেশের আধুনিক শিল্পের সাথে সংযুক্তি রেখে আমাদের দেশের শিক্ষিত তরুণদের কর্মদক্ষতা বাড়ানোর ওপরও অধিকতর জোর দেয়া হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের সম্ভাবনা ও করণীয় বিষয়ে কারিগরি বিভাগ থেকে যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে সেখানে দেশের এবং বিদেশের চাহিদা বিবেচনায় কারিগরি শিক্ষার বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জ উত্তরণে করণীয় বিষয়ে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। সূত্র জানায়, আমাদের দেশের শিক্ষিত তরুণদের যুগের সাথে সম্পৃক্ত রেখে তাদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে বিদ্যমান কারিকুলাম হালনাগাদেরও পরামর্শ দেয়া হয়েছে বিশেষ করে বৈদেশিক শ্রমবাজারের চাহিদার নিরীখে দক্ষ ও উপযুক্ত জনবল তৈরির জন্য বেশ কিছু সমস্যা ও সমাধানেরও পথ চিহ্নিত করা হয়েছে। অবশ্য এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কারিগরি বিভাগ একাধিক সেমিনার আয়োজনের ব্যবস্থা করেছে। গত ২৮ এপ্রিল এই ধরনের একটি ব্যতিক্রমী সেমিনার ঢাকায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে (আমাইতে) অনুষ্ঠিত হয়েছে।
চলতি মাসের ২৯ তারিখে আরো একটি কর্মশালা আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি বিভাগ। এসব সেমিনারে সংশ্লিষ্ট সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তা, কারিগরি শিক্ষা সেক্টরের অংশীজন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী এবং প্রতিনিধিগণের অংশগ্রহণে আমাদের তরুণদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, আমাদের দেশের তরুণদের কর্মদক্ষতা আরো বাড়াতে ইতোমধ্যে সরকারের অর্থায়নে (মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে চার হাজার তিন শ’ কোটি টাকা) Accelerating and Strengthening Skills for Economic Transformation (ASSET) নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি বিভাগের সূত্র জানায়, আধুনিক বিশ্বের সাথে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প বা কর্মক্ষেত্রেও তাল মেলাতে পারছে না আমাদের শিক্ষার্থীরা। তাই অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সাথে কোলাবোরেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কোর্স কালিকুলাম যুগোপযোগী করণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে গত ২৬ মে অস্ট্রেলিয়ার সরকারি এক প্রতিনিধিদল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলামের সাথে এ বিষয়ে বৈঠক করেছেন।
এর আগে কোর্স কারিকুলাম বিষয়ে ইন্দোনেশিয়ার একটি প্রতিনিধিদলের সাথেও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সূত্র আরো জানায়, সিঙ্গাপুরের বিখ্যাত নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির আদলে বাংলাদেশেও একটি মডেল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন কারিগরি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দেশের ভেতরে এবং বাইরে ১০টি স্তরে যোগ্যতা কাঠামো নির্ধারণের জন্য Bangladesh National Qualification Framework (BNQF) এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। এর পলিসি আকারে চূড়ান্তকরণের জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)-এর সাথে একাধিক সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এ দিকে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাম্প্রতিক জাপান সফরে গিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষিত বেকার তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের বড় একটি সুখবর নিয়ে এসেছেন। জাপান সরকার বাংলাদেশ থেকে এক লাখ জনবল নিতে আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।
শুধু মাত্র আমাদের উদ্যমী ও মেধাবী তরুণদের জাপানের ভাষাজ্ঞান দেয়ার মাধ্যমেই বাংলাদেশ এই বিশাল সুুযোগটি গ্রহণ করতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে পূর্ব দিকেও আমাদের শ্রমবাজার প্রশস্ত হওয়ার বড় একটি সুযোগ তৈরি হবে।
আমাদের দেশের তরুণদের শিক্ষার পাশাপাশি তাদেরকে আরো বেশি দক্ষ করে তুলতে বর্তমান সরকারের নানামুখী পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের সচিব ড. খ ম কবিরুল ইমলাম। তিনি নয়া দিগন্তের এই প্রতিবেদককে জানান, দেশে কিংবা বিদেশে কোথাও আমরা বেসরকারি শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি জোগান দিতে পারছি না।
যদিও দেশে এই মুহূর্তে শিক্ষিত বেকার লোকের অভাব নেই। কিন্তু দক্ষ জনশক্তির অভাব দিনকে দিন আরো প্রকট হচ্ছে। তাই এই মুহূর্তে আমাদের অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর মধ্যে বেশি জোর দেয়া হচ্ছে তরুণদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপরে।
তিনি জানান, আমাদের তরুণদের দক্ষতা বাড়াতে ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়াসহ আরো কিছু দেশের সাথে অ্যালাইন্স করা হচ্ছে।
তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, এই সময়ে আমরা সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স অর্জন করছি শুধুমাত্র ভাষাজ্ঞান এবং আরো কিছু ছোট ছোট বিষয়ে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব হলেই এই রেমিট্যান্স তিন গুণ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হবে। আমরা সব বিষয়গুলো নিয়েই কাজ শুরু করছি। আশা করছি খুব শিগগিরই এর সুফলও আসবে।