সাবেক মানবাধিকার কমিশনারদের খোলা চিঠি

অধ্যাদেশ বাতিলে আইনি শূন্যতায় উদ্বেগে রয়েছে ভুক্তভোগীরা

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

সাবেক পাঁচ মানবাধিকার কমিশনার এক খোলা চিঠিতে বলেছেন- সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাস না হওয়ায় দেশে গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ভুক্তভোগীদের মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

মানবাধিকার সুরক্ষায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে ভুক্তভোগীদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তারা এই বক্তব্য তুলে ধরেছেন বলে উল্লেখ করে তারা চিঠিতে তিনটি মূল বিষয় তুলে ধরেন যেখানে রয়েছে- সংসদে উপস্থাপিত তথ্যের অসঙ্গতি, সরকারের প্রকৃত আপত্তি এবং ভবিষ্যৎ আইনের গুণগত মান নির্ধারণের প্রস্তাবনা।

সংসদে উপস্থাপিত তথ্য নিয়ে প্রশ্ন

চিঠিতে দাবি করা হয়, অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে সংসদে বেশ কিছু ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, গুমের সর্বোচ্চ সাজা মাত্র ১০ বছর- এমন বক্তব্য সঠিক নয়; বরং সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে।

এ ছাড়া তদন্তের সময়সীমা ও জরিমানা নির্ধারণের বিধান নেই- এমন দাবিও প্রত্যাখ্যান করা হয়। কমিশনাররা জানান, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশে তদন্তের নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং জরিমানা আদায়ের স্পষ্ট প্রক্রিয়া উল্লেখ আছে, যা ২০০৯ সালের আইনে অনুপস্থিত।

আইসিটি আইনকে যথেষ্ট বলে যে দাবি করা হয়েছে, তা নিয়েও আপত্তি তোলা হয়েছে। তাদের মতে, এই আইন কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে পারে, বিচ্ছিন্ন গুমের ঘটনা এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে নতুন গুমের ঘটনায় আইনি প্রতিকার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

‘জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা’ নিয়েও সংশয়

সংসদে জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষার দাবি করা হলেও, কমিশনারদের মতে বাস্তবে তা নিশ্চিত হয়নি। কারণ নতুন ব্যবস্থায় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা কমিশনের হাতে নেই। এতে করে তদন্ত প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। চিঠিতে বলা হয়, সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে সরকারের আপত্তিগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা সীমিত করা। কমিশনকে মন্ত্রণালয়ের অধীন রাখা, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করা এবং বাছাই কমিটিতে সরকারি প্রভাব বাড়ানোর প্রস্তাবকে তারা স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছেন।

আইনের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ

কমিশনাররা মনে করেন, সরকারের অবস্থানে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। একদিকে শক্তিশালী আইন প্রণয়নের কথা বলা হলেও, অন্য দিকে এমন আপত্তি তোলা হচ্ছে যা কার্যকর আইন প্রণয়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তারা উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ প্রণয়নের আগে ৬০০-র বেশি অংশীজনের মতামত নেয়া হয়েছিল। ফলে অধ্যাদেশ বাতিল না করেও পরবর্তী সময়ে সংশোধনের সুযোগ ছিল।

আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার প্রসঙ্গ

চিঠিতে আন্তর্জাতিক সনদের প্রসঙ্গ তুলে বলা হয়, গুমকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা। তাই ভবিষ্যতে নতুন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সেটি কতটা কার্যকর ও শক্তিশালী হবে, সে বিষয়েই নজর রাখবেন ভুক্তভোগীরা।

চিঠির শেষাংশে কমিশনাররা বলেন, ‘যে পরিবারগুলো এখনো দরজায় কান পেতে আছে, তারা বহু আশ্বাস শুনেছে। ‘এখন আমাদের কী হবে?’- এই প্রশ্নের উত্তর কথায় নয়, কার্যকর আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই দিতে হবে।” খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন, বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, মো: নূর খান, ইলিরা দেয়ান, অধ্যাপক মো: শরীফুল ইসলাম ও ড. নাবিলা ইদ্রিস।