পুরাতন ব্যবস্থা চলতে পারে না, গণভোটের রায় মেনে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকেন
১১ দলীয় ঐক্যের বিক্ষোভ ও গণমিছিলে এ টি এম আজহারুল ইসলাম
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জ্বালানি সঙ্কট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ জনদুর্ভোগ লাঘবের দাবিতে রাজধানীতে ১১ দলীয় ঐক্যের সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম এমপি বলেন, দলীয় পেটুয়া বাহিনী দিয়ে জনগণকে দমিয়ে রাখা যায় না, যাবে না। সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না। ক্ষমতায় টিকে থাকতে প্রয়োজন জনসমর্থন। গতকাল বিকেলে রাজধানীর বিজয়নগরে এই বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
তিনি সরকারকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, জনগণের বিপক্ষে গিয়ে আওয়ামী লীগও ক্ষমতায় টিকতে পারেনি। গণভোটের রায় মেনে না নিয়ে আপনারাও জনগণের বিপক্ষে গেলে ক্ষমতায় টিকতে পারবেন না। জনগণ যদি রাজপথে নামে তবে রক্ষা পাওয়া যাবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও বিএনপি মানতে রাজি হয়নি, পরবর্তীতে আন্দোলনের মুখে বাধ্য হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মেনে নিয়েছে। জুলাই সনদও বিএনপি মানতে চাচ্ছে না, তবে আন্দোলনের মুখে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাধ্য হতে হবে।
সরকার মব সৃষ্টিতে উসকানি ও সমর্থন দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার যেই সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে, সেই সংবিধানে কি মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই? যদি থাকে তবে কেন জাগপার মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধানের বাসায় মব সৃষ্টি করা হয়েছে?
কোন সংবিধানের মতাবলে সরকার গঠন করেছেন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, সংবিধানের কিছু অংশ মানবেন কিছু অংশ মানবেন না- তা হতে দেয়া হবে না। জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে। নতুন ব্যবস্থার জন্য দ্রুত গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে অধিবেশন ডাকতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।
সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর গণতন্ত্রের পরিবর্তে জিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় বসেই রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠান দলীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে দখল করে নিয়েছে। মানুষকে তেলের জন্য সরকার সিরিয়ালে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু জ্বালানিমন্ত্রী বলছেন, তেলের সঙ্কট নাই। জিয়াতন্ত্র দিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে না, গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, দলীয়করণ বন্ধ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না হলে বাঙ্কারে ঢুকেও রক্ষা পাওয়া যাবে না।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সরকারের আচরণে মনে হয় না, নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। হাসিনার সরকারের মতোই বর্তমান সরকার গণবিরোধী ভূমিকায় আবির্ভুত হয়েছে। সরকার সংসদে সংবিধান-সংবিধান বলে জিকির করে। কিন্তু সেই সংবিধানে রয়েছে নাগরিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হবে; কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে মব সৃষ্টি করে তাদের বাড়িঘরে হামলা চালানো হচ্ছে।
খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী বলেন, জুলাই যোদ্ধারা ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে রক্ত দিয়েছেন। কিন্তু যারা আজ ক্ষমতায় বসেছেন, তারা জনগণের সাথে গাদ্দারি করে নব্য ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার দিকে ছুটছে। জনগণের বিপক্ষে গিয়ে হাসিনা যেমন রান্না করা খাবার খাওয়ার সময় পায়নি, আপনারাও পাবেন না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সেবাদাস সরকার এদেশের জনগণ মেনে নেবে না।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুফতি মুসা বিন ইযহার বলেন, বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে আমরা এখনো আওয়ামী লীগের যুগে আছি। বিএনপি ফ্যাসিবাদের আমদানি শুরু করেছে। তবে নতুন বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদ আমদানি করতে দেয়া হবে না।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির মহাসচিব খন্দকার মিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা এমন একটা সময়ে দাঁড়িয়ে আছি আমরা প্রধানমন্ত্রীর মতো চুপ করে থাকতে পারি না। আজকে কৃত্রিম জ্বালানি সঙ্কট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ অতিষ্ঠ। জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে রাজপথে নেমে আসার আগে সময় থাকতে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যা সমাধনের উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।
জাতীয় গণতন্ত্রী পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বলেন, গ্রামাঞ্চলে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের ভোগান্তি, তেলের সঙ্কট। কিন্তু সরকারের জ্বালানিমন্ত্রী দাবি করছেন, দেশে তেলের কোনো ঘাটতি নাই। তাহলে সেই তেল কোথায় রাখা হয়েছে। নতুন করে হাওয়া ভবন তৈরি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা এনামুল হক বলেন, ৫ আগস্টের আগে যেমনি এদেশের মানুষ ভালো ছিল না, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পরও ভালো নেই। জনরায় মেনে নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের ভালো থাকা কেড়ে নিলে সরকারও ভালো থাকতে পারবে না।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মো: বিল্লাল হোসেন মিয়াজী বলেন, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী গণভোটে হ্যাঁ ভোট চেয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের পর তিনি জনরায় উপেক্ষা করে ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করে বলেন, মনে রাখবেন জনগণের বিপক্ষে গিয়ে হাসিনাও ক্ষমতায় টিকতে পারেনি, আপনিও পারবেন না।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগে বলেছেন ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। নির্বাচনের পর গণভোটের রায় মেনে না নেয়ায়ই কী তার প্ল্যান ছিল? জনরায় উপেক্ষা করে বেশি দিন ক্ষমতায় টিকতে পারবেন না।
বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির মো: নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি উপস্থিত সর্বসাধারণকে গণমিছিলে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, আজকের গণমিছিল হবে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে। এখান থেকে সরকারকে আমরা বার্তা দিতে চাই- শান্তিপূর্ণভাবে জনরায় মেনে নিন। দেশকে সঙ্কট ও সংঘর্ষের দিকে ঠেলে না দিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
পরে এক বিশাল গণমিছিল বিজয়নগর-কাকরাইল- নাইটেঙ্গেল মোড় হয়ে শান্তিনগর গিয়ে শেষ হয়। এ সময় ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।