শেকড়ে ফেরার গল্প : ড. মাহবুব হাসান

আমাদের ফিরে যেতে হবে শেকড়ে। তার মানে নগরকে গ্রাম বানাবো না আমরা। আবার গ্রামের আকরণকে নগরে পরিণত করবো না। এ-দু’টি আকরণকে মেশাবো। মিশিয়ে নতুন নগর স্ট্রাকচার নির্মাণ করবো যাতে মানুষ বাঁতে পারে প্রাকৃতিক ভাবে

Printed Edition

মায়ের কথা দিয়ে শুরু করা যাক বাংলাদেশের লোকশিল্পের বর্ণনা। আমারই যুবকবেলায় আমার মা একটি নকশীকাঁথা সেলাই করেছিলেন। সেই কাঁথা আমি বহুদিন গায়ে দিয়েছি। এটা কেবল স্মৃতিতন্তু নয়, এর পেছনে আছে ভালোবাসা, আছে দেশপ্রেম, আছে লোকশিল্পের প্রতি অকৃত্রিম ভাবনারাজি, নিত্যবাস্তব জীবন যাপন।

মা এঁকেছিলেন নকশীকাঁথা। আর তার বিষয় ছিল মুক্তিযুদ্ধ। কিভাবে শত্রুদের গুলি করে মারছে স্বাধীনতা সংগ্রামী গাঁয়ের যুবকরা, হাতি ঘোড়ার পাশাপাশি তিনি জুড়ে দিয়েছিলেন তার রাজনৈতিক আশা-আকাক্সক্ষা। আমাদের লোক বাংলার ঘরে ঘরে প্রতিজন ঘরণী প্রায় প্রতি বছরই বিভিন্ন রকম কাঁথা সেলাই করতেন পুরনো পরনের শাড়ি দিয়ে। কেউ কেউ নতুন কাপড়ে বুনতেন নকশী। সেগুলো সাধারণত শাদা ধুতি দিয়েই হতো। ধুতির পাড় বলতে গেলে থাকেই না। খুবই চিকন-পেড়ে ধুতি আমি আমার মাকেও কিনে দিয়েছি, মনে পড়ছে। কী অপূর্ব মমতায় তিনি নকশীকাঁথা গাঁথতেন মনে মনে, আর তারই চিন্তাতন্তু ধরে ফুটে উঠতো নকশীকাঁথায় পরিবেশ-প্রতিবেশ, জনজীবন।

‘বাগেশ্বরী শিল্প বক্তৃতায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন কায়া অতিক্রম করেছে মায়া দিয়ে আপনার বাধা রূপ। মায়া সে উন্মুক্ত করেছে উপযুক্ত কায়া দিয়ে নিজেকে। সেই মনের মায়ার মোহিনীতে ছবির কায়া বাহিরের কায়াকে যুগে যুগে ছেড়ে গেছে।’ (জসীমউদ্দীন/ পূর্ববঙ্গের নকশীকাঁথা ও শাড়ি)

অবনীন্দ্রের কায়া ও মায়ার আথে আমার মায়ের নকশীকাঁথা রচনার মিল-মহব্বত পাওয়া যায়। মায়া-মমতাই তো চিন্তাতন্তু, আসলের গোড়া রচনার ফল্গু। গ্রাম বাংলার প্রতিটি মায়ের চিন্তাতন্তু যেন এভাবেই ভাব ও কর্মের মর্মে ঢুকে বসে আছে। একে আমরা বলি পরম্পরা। পরম্পরা এক দিনে, এক বছরে, এক যুগে সৃষ্টি হয় না, তা যুগে যুগে পরিবাহিত হয়, যুগ অতিক্রম করে তা বয়ে চলে যেন প্রাকৃতিক প্রবাহ। আপনার ছন্দে, আপন মনে তা বয়ে চলে।

২.

রোজার ক্লজি তার ভিশন এবং ডিজাইন (নকশা) বইয়ে বলেছেন বন্যজাতির (যে গোষ্ঠী এখনো বন ছেড়ে গ্রামে আসেনি/ওই রকম একটি দোটানা অবস্থার মধ্যে আছে) শিল্পকথা নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন ‘আমাদের আদিম শিল্পের নকশাগুলোর সাথে শিশুদের অঙ্কনপদ্ধতির অনেকখানি মিল রয়েছে। শিশুদের অঙ্কনে আমরা কতকগুলো নকশা পাই, তার সাথে বাস্তরের যোগ খুব কমই আছে। কিন্তু কোনো বস্তু শিশুর মনে যে প্রভাব বিস্তার করে তার পুঙ্খনুপুঙ্খ ভাব বিন্যাস রূপ পায় সেই নকশাগুলোর মধ্যে। (জসীমউদ্দীন/প্রাগুক্ত)

একটি শিশু যখন রঙপেন্সিল নিয়ে আঁকিবুকি করে তা দেখে আমরা কিছু বুঝতে চাই না বা চেষ্টা করি না। কিন্তু ওই শিশু কি আঁকতে চেয়েছে, তা ওখানেই প্রকাশ পেয়েছে। আমরা পারি না, কারণ আমরা ওই চিন্তাতন্তু থেকে নিজেদের বের করে এনেছি। ওই কথিত শিশুও একদিন তার শিশুচিন্তার জগত থেকে বেরিয়ে আসবে। তখন সে আমাদের মতোই বস্তুতান্ত্রিক/ রিআলিস্টিক চিন্তার আকর নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। সে তার অতীত হারিয়ে ফেলবে। যেমনটা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আমি ভুলে গেছি আমার মায়ের সৃষ্টিশীলতার রূপারূপ। গ্রামীণ জীবনের গ্রামনকশা, বাড়ি নির্মাণের নকশা হারিয়ে গেছে নগরের প্রাচুর্য সম্ভারের চাপে আর বিল্ডিং নকশার প্রাদুর্ভাবে। আমরা এখন গ্রামেও বিল্ডিং বানাতে চাই। বানিয়ে নিয়েছি। কিন্তু আমাদের শেকড় রক্ষা করিনি।

৩.

শেকড় ফিরিয়ে আনাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। অন্তত শিল্পেআকরণ হিসেবে লোকবাংলার দুয়ারে / উঠোনে ফিরে যাওয়া উচিত। কেন উচিত? ফিরে গেলে সেই সৃষ্টিশীল কবি/শিল্পী ফিরে পারে তার প্রকৃত শিল্পজগত, শিল্প-আকরণ, তার ভাবনাবৃত্ত, তার অপটু হাতের কাঁপা কাঁপা নকশার মর্ম।

কিছু কিছু কাজ যে হচ্ছে না তা নয়, সেই কাজগুলো ঐতিহ্যের, পরম্পরার তবে তা কমার্শিয়ালও। বাণিজ্যিকি-করণের ফলে লোকশিল্পের যে কায়া তা যেমন পাল্টে গিয়ে একটি শীলিত ভাব ও ভঙ্গি এসেছে, তেমনি পরিশীলনে নগরের ছাপ এসে যুক্ত হয়েছে। পরিশীলনে এটা হবেই, কেন না তা বিক্রিযোগ্য ডিজাইনের অংশ। নগরে বাস করেন যেসব মানুষ, তাদের রূপ গ্রাম থেকে সৃষ্টি হলেও, তারাও পরিশীলনের চাপে ক্ষুদ্র বাসার প্যাটার্নের সাথে মানায় এমন সব আকার সৃষ্টি করেন। যেমন বামন গাছ। গাছকে এমন এক প্রকৃয়ায় বামন বানানো হয়, যা তার রূপকে ঠিক রেখে একটি প্রাকৃতিক জীবনের অংশকে নগরের খোঁপের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া। এই যে বামন গাছ সৃষ্টি করে তা বসার ঘরে সাজিয়ে রাখা, এই মনন ও মানসিকতা নাগরিক কৈবল্যের অংশ। নগর ও গ্রামের ভেতরে মেলবন্ধন এটা। সেই নাগরিক গ্রামীণ জীবনের শ্বাস-নাল ছাড়তে পারেননি, তাই বামন গাছ সৃষ্টি করে বা কিনে এনে যেন লোকজীবনের শ্বাস নেয়ার সুযোগ করেছেন।

অক্সিজেন ফ্যাক্টরি বলি আমি গাছপালাকে। এই মহানগরেও প্রয়োজন রয়েছে গাছের। এ-জন্য নগর পরিকল্পকরা একটি মহানগরে ২৫ শতাংশ গাছ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। পার্কগুলো তো বটেই প্রত্যেক সড়কের দু’পাশে গাছের শোভা প্রকৃতির রূপকে অপরূপ করে তোলে। এটাও গ্রামীণ সভ্যতারই অঙ্গন থেকে নগর পরিকল্পকরা পেয়েছেন।

৪.

আমাদের ফিরে যেতে হবে শেকড়ে। তার মানে নগরকে গ্রাম বানাবো না আমরা। আবার গ্রামের আকরণকে নগরে পরিণত করবো না। এ-দু’টি আকরণকে মেশাবো। মিশিয়ে নতুন নগর স্ট্রাকচার নির্মাণ করবো যাতে মানুষ বাঁতে পারে প্রাকৃতিক ভাবে। শিল্প বাঁচতে পারে শিল্পের মর্ম নিয়ে। কায়া আর ছায়ার মধ্যে মিল-মহব্বত সৃষ্টি হয়।

নিউ ইয়র্কে থাকতে আমি একটি মিউজিয়ামে এক স্কালচার প্রদর্শনী দেখতে গেছিলাম। তিনি ইতালিয়ান শিল্পী/ ভাস্কর জিয়াকোমিত্তির। তার ভাস্কর্য দেখে অবাক হয়েছিলাম। তিনি নির্মাণ করেছিলেন আমাদের সাভারের লোকপুতুলের মতো এবড়ো-খেবড়ো শিল্প। কেন তিনি নগরের পরিশীলন ছেড়ে অপরিশিলীত স্ট্রাকচারে গেলেন? আমার ধারণা তিনি ইতালিয়ান চেতনার লোকজ সম্ভারকেই পুনর্নির্মাণের ভেতর দিয়ে নতুন চিন্তাতন্তু সৃজন করেছেন। একে আমি ফিরে যাওয়া বলি। আমাদের শিল্পীদের ফিরে যেতে বলি বৃহত্তর লোকজ বাংলার আতুরঘরে। সেখানেই লুকিয়ে আছে সৃষ্টির উপাদান-উপকরণ, তাকে পুনর্নির্মাণের আয়োজন করতে হবে।