ইরানি বন্দরে অবরোধ ট্রাম্পের ঝুঁকিতে বিশ্ব অর্থনীতি
শান্তি আলোচনা বানচালের নেপথ্যে নেতানিয়াহু
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
পাকিস্তানে কোনো সমঝোতা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা শেষ হওয়ার পর তেহরানের ওপর চরম চাপ তৈরির ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। ইরানের সব বন্দরে অবরোধ কার্যকর করার হুমকি দিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
গত রোববার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়, সোমবার পূর্বাঞ্চলীয় সময় সকাল ১০টা বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা থেকে ইরানের বন্দরে প্রবেশকারী এবং সেখান থেকে ছেড়ে যাওয়া সব ধরনের নৌযানের ক্ষেত্রে এই অবরোধ প্রযোজ্য হবে। বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, যেকোনো দেশের নৌযানই ইরানের বন্দর বা উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করলে এই নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়বে। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরে চলাচলকারী সব জাহাজই এই কঠোর অবরোধের আওতাভুক্ত থাকবে। তবে সেন্টকম বলেছে, ‘হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী যেসব জাহাজ ইরানের বাইরের কোনো বন্দর থেকে আসছে বা সেখানে যাচ্ছে, তাদের নৌ চলাচলের স্বাধীনতায় মার্কিন বাহিনী কোনো বাধা দেবে না।’ সেন্টকমের ঘোষণাটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের দেয়া হুমকি থেকে কিছুটা সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর আগে ট্রাম্প পুরো হরমুজ প্রণালী অবরোধ এবং ইরানকে টোল দেয়া জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছিলেন।
ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আলজাজিরার সংবাদকর্মী হেইডি ঝৌ-কাস্ত্রো বলেছেন, ‘এখানে অনেক প্রশ্ন রয়েছে।’ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা ‘সাংঘর্ষিক তথ্যের’ দিকেও ইঙ্গিত করেছেন। হেইডি ঝৌ-কাস্ত্রো বলেন, ‘ট্রাম্প বলেছিলেন, এই অবরোধ হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রবেশ বা বের হওয়া সব জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করবে। কিন্তু সেন্টকম বলছে, এটি শুধু ইরানি বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোকেই নিশানা করবে।’ ইরানের বন্দরগুলোতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পিত নৌ-অবরোধ আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলকে আরো পঙ্গু করে দিতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিতে চলমান জ্বালানি সঙ্কটকে আরো ভয়াবহ করে তুলবে।
গতকাল সোমবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালী অবরোধ করবে এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় যেসব জাহাজ ইরানকে টোল দিয়ে চলাচল করে, সেগুলোকে বাধা দেবে। এই ঘোষণার পরপরই তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ট্রাম্প লেখেন, ইরানকে এই অবৈধ চাঁদাবাজি থেকে কোনোভাবেই লাভবান হতে দেয়া হবে না। তবে মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্বরত মার্কিন সামরিক কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই অবরোধ শুধু ইরানি বন্দর দিয়ে আসা-যাওয়া করা জাহাজগুলোর ওপর কার্যকর হবে। এটি মূলত ট্রাম্পের পুরো প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার হুমকির কিছুটা নমনীয় রূপ।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ত্রিতা পার্সি আলজাজিরাকে বলেন, মার্কিন এই অবরোধের প্রভাব পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়বে। বাজার থেকে তেল কমে যাওয়ার ফলে দাম বেড়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে গ্যাসের দামে। পার্সি আরো সতর্ক করেন যে, এই অবরোধের প্রতিক্রিয়ায় ইয়েমেনের হাউছিরা যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তবে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্তকারী এই প্রণালীটি উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রফতানির বিকল্প পথ। ইরানের আয় বন্ধ করতে এই অবরোধের সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের আগের নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। গত মাসেই ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সঙ্কট কমাতে ইরানি তেল রফতানির ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছিল।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ আনাস আলহাজ্জি জানান, মার্কিন সেনাবাহিনী নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেও বীমার প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় অন্যান্য দেশের জাহাজগুলো এই পথ এড়িয়ে চলবে। এ ছাড়া ইরানের পক্ষ থেকে পাল্টা হামলার ভয়ও থাকবে। ফলে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ কার্যকরভাবে পুরো হরমুজ প্রণালীতেই অবরোধ তৈরির সমান। বিশ্লেষকরা বলছেন, তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে রাসায়নিক, সার এবং প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামালের দামও বেড়ে যাবে। সাংহাইভিত্তিক বিশেষজ্ঞ ক্যামেরন জনসন মনে করেন, অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কাঁচামালের দাম আকাশচুম্বী হবে। সিঙ্গাপুরের হিনরিচ ফাউন্ডেশনের ডেবোরা এলমস বলেন, এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থা আরো খারাপ হবে। কাপড়ের দাম থেকে শুরু করে ওষুধের প্যাকেট বা নিত্যপণ্যের মোড়ক- সব কিছুর ওপর এর প্রভাব পড়বে। এমনকি সারের অভাবে আগামী বছরে খাদ্য উৎপাদনেও বিপর্যয় আসতে পারে।
অবরোধে যোগ দেবে না ব্রিটেন : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত হরমুজ প্রণালী অবরোধের সিদ্ধান্তে ব্রিটেন অংশ নেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। আলজাজিরার প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, গতকাল সোমবার বিবিসি রেডিওকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেন যে, ব্রিটেন এই অবরোধ সমর্থন করে না। প্রধানমন্ত্রী স্টারমার আরো বলেন, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কোনো যুদ্ধেও যুক্তরাজ্য জড়াবে না। হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত এবং সম্পূর্ণ সচল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি জানান, গত কয়েক দিন ধরে ব্রিটিশ সরকার এ লক্ষ্যেই কাজ করছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে। হরমুজ প্রণালী ঘিরে ইরানের বন্দরগুলোতেও মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অবরোধে যুক্তরাজ্য অংশগ্রহণ করবে না বলে জানিয়েছে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজ এবং সেনাদের ইরানের বন্দর অবরোধ করার কাজে ব্যবহার করা হবে না বলে জানিয়েছেন স্টারমার।
নেতানিয়াহুর এক ফোনেই বানচাল শান্তি আলোচনা : টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আয়োজিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যকার শান্তি আলোচনা একটি মাত্র ফোনের কারণেই বানচাল হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। তিনি জানান, আলোচনা চলাকালে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের কাছে হঠাৎ ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ফোন আসে এবং এর পরই পুরো পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে আরাকচি লেখেন, ‘বৈঠকের সময় ভ্যান্সের কাছে আসা নেতানিয়াহুর ফোন আলোচনার মনোযোগ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দিক থেকে সরিয়ে ইসরাইলের স্বার্থের দিকে নিয়ে যায়।’ তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের মাধ্যমে যা অর্জন করতে পারেনি, তা আলোচনার টেবিলে পাওয়ার চেষ্টা করেছিল, যার ফলে এই আলোচনা ব্যর্থ হয়।