যুদ্ধবিরতি চুক্তির সম্ভাবনায় ইতিবাচক আচরণ পুঁজিবাজারে
বাজার আচরণ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ঢাকা শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
নতুন করে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধবিরতি চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের পুঁজিবাজারে। গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে সূচকের পাশাপাশি উন্নতি ঘটেছে লেনদেনেরও। গতকাল মঙ্গলবার সকালে লেনদেনের শুরুতেই সূচকে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যায় দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই)। লেনদেনের মাঝামাঝি পর্যায়ে বিক্রয়চাপের মুখে সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও সূচকের উন্নতি ধরে রেখেই দিন শেষ করে পুঁজিবাজারটি। তবে একই সময় চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে ছিল সূচকের মিশ্র প্রবণতা।
গতকাল বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কর্তৃক যুদ্ধবিরতি চুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক বক্তব্য প্রকাশিত হলে আরো একবার আশাবাদী হয়ে ওঠে বিশ^। এরই ফলশ্রুতিতে সারা বিশে^র স্টক মার্কেটে ইতিবাচক ধারা বজায় ছিল। এশিয়ার জাপান, হংকং ও ভারতের পুঁজিবাজারেই সূচকের বড় ধরনের উন্নতি রেকর্ড করা হয়। বেলা ২টা পর্যন্ত জাপানের নিকি ৫৭২ দশমিক ৫৮, হংকংয়ের হেংসেং ১২৩ দশমিক ০৪ ও সেনসেক্স ৬৭৫ দশমিক ৫২ বৃদ্ধি পায়, যা দীর্ঘদিন পর এ অঞ্চলের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের নতুন করে আশাবাদী করে তোলে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ২৪ দশমিক ৯২ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। ৫ হাজার ২৩২ দশমিক ৪৯ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ২৫৭ দশমিক ৪১ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৪ দশমিক ১৬ ও ২ দশমিক ৯৫ পয়েন্ট। অপর দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচকের ছিল মিশ্র আচরণ। এখানে সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ও সিএসসিএক্স সূচকটি যথাক্রমে ৬ দশমিক ৭৩ ও ৬ দশমিক ৩২ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখলেও সিএসসিএক্স সূচকটি ৩৩ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট হারায়।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই দেশের মধ্যে এর আগেও একবার যুদ্ধবিরতি নিয়ে বৈঠক হলেও তা সফলতার মুখ দেখেনি। কিন্তু এবার যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিছু নেতিবাচক বক্তব্য দেয়া হলেও চুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। এটাই বিশ^কে নতুন করে আশাবাদী করে তুলেছে। একই কারণে আশাবাদী হয়েছেন আমাদের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা।
সূচকের পাশাপাশি এদিন লেনদেনেরও উন্নতি ঘটে। ডিএসই ৯২৯ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা, আগের দিন অপেক্ষা ১০৫ কোটি টাকা বেশি। সোমবার বাজারটির লেনদেন ছিল ৮২৪ কোটি টাকা। ডিএসইর লেনদেনের মধ্যে মাত্র ৩০ কোটি টাকা ছিল ব্লক মার্কেটের। বাকিটা সাধারণ মার্কেটের। তবে লেনদেন কিছুটা কমেছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। সিএসইতে গতকাল ৩৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়। আগের দিন বাজারটির লেনদেন ছিল ৩৪ কোটি টাকা।
দিনের বাজার আচরণ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ঢাকা শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা। গতকাল মতিঝিলে ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরগুলোতে বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারীর সাথে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বললে তারা তাদের মনোভাবের কথা জানান। নয়া দিগন্তকে তারা বলেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাজারে কিছুটা গুমোটভাব থাকলেও আমরা বাজারের সাথেই রয়েছি। কারণ মনে হচ্ছে যুদ্ধ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটলেই পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক আচরণে ফিরবে। এ আশাবাদ থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা গত কিছুদিন থেকে বাজারে কমবেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। দিনের লেনদেন ও সূচকের উন্নতি তারই প্রমাণ।
নয়া দিগন্তকে তারা আরো জানান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিয়েও সংশ্লিষ্ট সবার মাঝে এক ধরনের দোটানা ভাব রয়েছে। বাজারের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি বড় অংশই চায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতে পরিবর্তন আসুক। সরকারও এ ব্যাপারে ইতিবাচক। যদি আদৌ পরিবর্তন ঘটে থাকে, তাহলে যত দ্রুত সম্ভব তা করা দরকার। আর যদি কোনো পরিবর্তন না ঘটে তাও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সবার কাছে স্পষ্ট করা হোক। তা হলে বিনিয়োগকারীদেরও সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে। তা ছাড়া নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ডিএসই বা বিএসইসিকে অবশ্যই আমলে নেয়া উচিত বাজারে যাতে কোনো ধরনের কারসাজি না হয়। অতীতে যখনই বাজার ভালো আচরণের দিকে গেছে তখনই কারসাজিকারীরা বাজারে সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের বাজার বিমুখ করে তোলে। ফলে বাজার স্বাভাবিক গতি হারায়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে ছিল সিটি ব্যাংক। ২৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৮৫ লাখ ৩৬ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকায় ৮৬ লাখ ৬৪ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল একমি পেস্টিসাইডস। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস, রানার অটোমোবাইলস, লাভেলো আইসক্রিম ও শাহজিবাজার পাওয়ার।
ডিএসইতে দিনের মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল প্রকৌশল খাতের কোম্পানি বিডি ল্যাম্প। গতকাল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে কোম্পানিটির।
৯ দশমিক ৯১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে একই খাতের নাহি অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেল ছিল এ তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে অগ্নি সিস্টেমস, সমতা লেদার, এপেক্স স্পিনিং, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, পিপলস ইন্স্যুরেন্স, এপেক্স ফুডস, ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স ও ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং।
দরপতনের শীর্ষে গতকালও প্রাধান্য ছিল ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এ তালিকার শীর্ষে ছিল ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। গতকাল ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। ৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ দর পতনের শিকার হওয়া প্রিমিয়ার লিজিং ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর দরপতনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এফএএস ফিন্যান্স, পিপলস লিজিং, আইএফআইসি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, জিএসপি ফিন্যান্স, ফারইস্ট ফিন্যান্স, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, একমি পেস্টিসাইডস ও সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ।