স্কুল-কলেজ কমিটিতে রাজনীতিবিদদের সম্পৃক্ততা নিয়ে রুল
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
বেসরকারি স্কুল-কলেজের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটিতে রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত বা দলীয় পদধারী ব্যক্তিদের অযোগ্য ঘোষণার প্রশ্নে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষার মানোন্নয়ন, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পরিচালনা কমিটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি।
হাইকোর্টের বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ সোমবার জনস্বার্থে করা এক রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে এ রুল জারি করেন। আদালত জানতে চেয়েছেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটিতে রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত কিংবা দলীয় পদে থাকা ব্যক্তিদের নির্বাচন, মনোনয়ন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করে বিদ্যমান প্রবিধান সংশোধন অথবা নতুন বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না।
স্থানীয়ভাবে স্বীকৃত শিক্ষানুরাগী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, বিশিষ্ট সমাজসেবক, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, চিকিৎসক এবং অন্যান্য গ্রহণযোগ্য নাগরিকদের এসব কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় বিধান ও বিচারিক নির্দেশনা (জুডিশিয়াল গাইডলাইন) জারির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেও আদালত ব্যাখ্যা চেয়েছেন।
আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মো: নাদির খান ও অ্যাডভোকেট মো: সোহেল রানা। গত ৭ জুন রুবেল মিয়া নামে এক অভিভাবকের পক্ষে রিটটি করা হয়। আবেদনে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা, ২০২৪-এর ৭ নম্বর বিধি সংশোধন অথবা দেশের সব শিক্ষা বোর্ডের জন্য সমন্বিত নতুন বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা চাওয়া হয়।
রিটে বলা হয়, রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত বা দলীয় পদধারী ব্যক্তিদের পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক সুশাসন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করছে। তাই শিক্ষার মানোন্নয়ন ও নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করতে গ্রহণযোগ্য, সৎ ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ দিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা নিয়ে শিক্ষা অঙ্গনেও অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির মূল দায়িত্ব শিক্ষার মানোন্নয়ন, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করছে। ফলে শিক্ষক নিয়োগ, বদলি, শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা, অবকাঠামো উন্নয়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অযাচিত হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের নির্দেশনায় পরিচালনা কমিটিতে অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, আইন অনুযায়ী কমিটি গঠনের বিধান থাকলেও স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য অনেক সময় সেই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।
বিভিন্ন জেলার শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কমিটির সভাপতি বা প্রভাবশালী সদস্যের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অনেক প্রধান শিক্ষক স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। অভিভাবকদের অভিযোগ- কমিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনেক স্থানে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং কোথাও কোথাও বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এতে দীর্ঘ সময় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব বাড়লে শিক্ষার মূল লক্ষ্য থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো সরে যায়। শিক্ষা পরিকল্পনার পরিবর্তে স্থানীয় প্রভাব, ক্ষমতার ভারসাম্য ও ব্যক্তিস্বার্থ গুরুত্ব পায়। এতে শিক্ষকদের পেশাগত স্বাধীনতা ক্ষুণœ হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক শিক্ষার পরিবেশও বাধাগ্রস্ত হয়।
শিক্ষা প্রশাসনের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, রাজনৈতিক পরিচয় থাকা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ না হলেও দলীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর। তাদের মতে, পরিচালনা কমিটির সদস্য নির্বাচনে শিক্ষা, সমাজসেবা ও প্রশাসনিক দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং স্বার্থের সঙ্ঘাত এড়াতে আরো কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন।
শিক্ষাবিদদের ভাষ্য, উন্নত দেশগুলোতে বিদ্যালয় পরিচালনা বোর্ডে অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও স্থানীয় সমাজের প্রতিনিধিরা থাকলেও দলীয় রাজনৈতিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেয়া হয় না। দেশেও পরিচালনা কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া আরো স্বচ্ছ করা, সদস্যদের আচরণবিধি প্রণয়ন, আর্থিক সিদ্ধান্তের বাধ্যতামূলক নিরীক্ষা, নিয়মিত কার্যক্রম মূল্যায়ন এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নয় বরং শিক্ষার্থকেন্দ্রিক সুশাসনের নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।