১৫ বছরে সাংবাদিকদের ভূমিকা মূল্যায়নে জাতিসঙ্ঘের সহায়তা চাওয়া হবে : প্রেস সচিব
Printed Edition
গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সাংবাদিকদের ভূমিকা মূল্যায়ন করে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়ে জাতিসঙ্ঘের সহায়তা চাওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, জাতিসঙ্ঘকে অনুরোধ করা হবে বিশেষজ্ঞ একটি প্যানেল করে গত ১৫ বছরের তিনটি নির্বাচন, আইসিটির রায়ে ফাঁসি, মাওলানা সাঈদীর মামলার রায়ের পর সারা দেশে সংঘটিত ঘটনায় প্রাণহানি, শাপলা চত্বর ট্র্যাজেডিসহ সব বড় বড় ঘটনাগুলোতে কেমন সাংবাদিকতা হয়েছে, সাংবাদিকদের ভূমিকা কেমন ছিল, তা অনুসন্ধান করে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে।
গতকাল শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের জুলাই বিপ্লব স্মৃতি হলে আয়োজিত জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশ : গণমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন ।
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিএমইউজে) আয়োজিত উক্ত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির সদস্যসচিব জাহিদুল করিম কচি। সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন, মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী। ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন প্রধান উপদেষ্টার ডেপুটি প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার।
প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, জাতিসঙ্ঘ জুলাই গণহত্যা নিয়ে একটি চমৎকার প্রতিবেদন দিয়েছে। সেখানে আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রী কে কোথায়, কী ভূমিকা রেখেছিল, সেগুলো উল্লেখ করা আছে। এ রকম একটি প্রতিবেদন যেন গত ১৫ বছরের সাংবাদিকতা নিয়ে করা হয়, সে বিষয় জাতিসঙ্ঘের সহায়তার জন্য লিখব। দেখি তারা কী বলে।
জুলাই আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামের কতিপয় সাংবাদিক কর্তৃক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পুলিশে ধরিয়ে দেয়ার বিষয়টি বারবার উঠে আসে আলোচনা সভায়। বিষয়টি গুরুতর অভিযোগ উল্লেখ করে প্রেস সচিব বলেন, এ ঘটনার তদন্ত হওয়া উচিত। সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রেস ক্লাবের উচিত একজন বিচারক, পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি তদন্ত করা। এটি বহু আগেই করা প্রয়োজন ছিল। যারা এগুলো করেছে তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত। আন্দোলন ব্যর্থ হলে এই সাংবাদিকরা ছাত্রদের কী করত, আপনারা দেখতেন।
অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে দেশের মানুষ বর্তমানে সবচেয়ে বেশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করছেন উল্লেখ করে শফিকুল আলম বলেন, এখন মানুষ মন খুলে লিখছেন, সমালোচনা করছেন, গালিও দিচ্ছেন। কাউকে কিছু বলা হচ্ছে না। অনেকে আবার বলছেন, স্বৈরাচারের দোসরদের প্রতি সফট হচ্ছি। কিন্তু আমরা তো আইনের বাইরে গিয়ে কিছু করতে পারি না। আমরা কোনো কলম ভেঙ্গে দেইনি, কোনো প্রেসে তালা দেইনি। কোনো গণমাধ্যম যদি, তার কর্মীকে চাকরিচ্যুত করে, আপনারা সেই গণমাধ্যম অফিসের সামনে গিয়ে প্রতিবাদ করুন। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর প্রধান উপদেষ্টা সম্পাদকদের সাথে বৈঠক করে বলেছেন, আপনারা লিখুন, মন খুলে লিখুন।
তিনি বলেন, প্রত্যেকটি মিডিয়ারই ফ্যাক্ট চেকিং সেল থাকা দরকার। এটি শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। সামনে নির্বাচন, প্রত্যেকটি মিডিয়াকে প্রস্তুত হতে হবে বিপ্লবোত্তর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়।
বিদেশী, বিশেষ করে ভারতের মিডিয়া ও আওয়ামী লীগ অপতথ্য ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষ এখন ভিডিও দেখেন বেশি, নিউজ পড়েন কম। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মিথ্যা ছড়ানো হচ্ছে। আওয়ামী লীগের পান্ডারা একটি ভিডিও দিয়ে ছড়াচ্ছিল একটা ছেলেকে জবাই করছে জামায়াতের নেতাকর্মীরা। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, ল্যাটিন আমেরিকায় ড্রাগ নিয়ে এ ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এগুলো মানুষ তো বিশ্বাস করছে।
প্রধান উপদেষ্টার ডেপুটি প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, বিগত দিনে সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছিল ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মাধ্যমে। আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল কিছু মানুষকে নিরাপত্তা দিতে। কিন্তু বিগত সরকার সাংবাদিকদের হাত-পা বাঁধতে এই আইন ব্যবহার করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার মুক্ত সাংবাদিকতায় বদ্ধপরিকর, এই আইন বাতিল হবে।
বিএফইউজে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন বলেন, জুলাই বিপ্লবের পর রাষ্ট্রকাঠামোয় যে পরিবর্তন হয়েছে তার সাথে অনেকেই এখনো খাপখাইয়ে নিতে পারেনি। যেকোনো বিপ্লবের পর পরাজিত শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে কমপক্ষে ২০ বছর সময় নেয়। কিন্তু আমাদের এখানে ফ্যাসিবাদ পতনের বছর না গড়াতেই তাদের সহযোগী শক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে। চট্টগ্রামে মিছিল করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতায় না হলেও নীরবতায় তারা এই সাহস পেয়েছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বসহকারে দেখার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাই।
বিএফইউজে মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেন, পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনা ভারত থেকে যখন দেশে ফিরেছিলেন তখন সংবাদ সম্মেলনে যা ঘটেছিল তা ইতিহাসের নিকৃষ্টতম দালালি। এরচেয়ে নিকৃষ্টতম দলদাসগিরি আর হতে পারে না। প্রশ্ন করার কথা ছিল যেসব চুক্তি হয়েছে তা নিয়ে। কিন্তু আমরা দেখলাম বলা হচ্ছে হাসিনা আন্তর্জাতিক নেত্রী। তার নোবেল পাওয়া উচিত। ভবিষ্যতে কেউ যাতে গণমাধ্যমকে এমন নিচু স্তরে নামাতে না পারে তার ব্যবস্থা নিতে হবে।
সিএমইউজে সেক্রেটারি সালেহ নোমান ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের অন্তর্বর্তী কমিটির সদস্য গোলাম মাওলা মুরাদের সঞ্চালনায় এতে আরো বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ শাহনওয়াজ, পিপলস ভিউ সম্পাদক ওসমান গণি মনসুর, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক নসরুল কদির, বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ চট্টগ্রামের সদস্য সচিব ডা: খুরশীদ জামিল, অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি প্রকৌশলী জানে আলম সেলিম, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুস সাত্তার, চট্টগ্রাম বিশ্বিবদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শহীদুল হক প্রমুখ।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আগামী সাত মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
বাসস জানায়, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আগামী সাত মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ছয় গুণ বাড়ানোর একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তিনি আজ তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে লেখেন ‘অধ্যাপক ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিষয়টির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন। তারা চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ছয় গুণ বাড়িয়ে ৭.৮৬ মিলিয়ন টিইইউতে উন্নীত করার একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা উন্মোচন করেছে।’
শফিকুল আলম বলেন, শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক বন্দর পরিচালকদের সাথে অংশীদারিত্ব ছাড়া এটি সম্ভব নয়। সফল হলে, এমন অংশীদারিত্ব আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের কাছে একটি শক্ত বার্তা পৌঁছে দেবে : বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত। ‘আগামী সাত মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়টা বাংলাদেশকে গড়ে তুলতেও পারে, আবার ব্যর্থ করতেও পারে’ তিনি যোগ করেন।
বিশ্বের বৃহত্তম রফতানিনির্ভর অর্থনীতি প্রসঙ্গে প্রেস সচিব বলেন, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নাল বা ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস পড়লেই বোঝা যায় : ব্রেটন উডস চুক্তির পর যে পুরনো অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা গড়ে উঠেছিল এবং যা ডব্লিউটিও দ্বারা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল, তা এখন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সেই যুগের সবচেয়ে বড় বিজয়ীরা ছিল জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া- যারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজারমুখী রফতানিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলে সমৃদ্ধ হয়েছে।
শফিকুল আলম আরো বলেন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনও ধীরে ধীরে এই পথে অগ্রসর হয়েছে। তবে দক্ষিণ এশিয়া পিছিয়ে ছিল। ‘এখন হয়তো অবশেষে বাংলাদেশের সময় এসেছে। আমরা কি এই মুহূর্তকে কাজে লাগাতে পারব?’ তিনি প্রশ্ন তোলেন।
রাজনীতি এখানে একটি মূল ভূমিকা রাখবে উল্লেখ করে প্রেস সচিব বলেন, আশাব্যঞ্জকভাবে, এমনকি ইসলামপন্থীরাও এখন ব্যবসাবান্ধব হওয়ার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে শুরু করেছে। তবে তিনি বলেন, লজিস্টিক সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জই হতে পারে সবচেয়ে বড় বাধা। ‘বৃহৎ পরিমাণ পণ্য দ্রুত ও কার্যকরভাবে পরিবহনের সক্ষমতা শিগগিরই পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ যে একটি উৎপাদনশীল শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়, সে আকাক্সক্ষা মুখ থুবড়ে পড়বে’ তিনি বলেন।