নয়া দিগন্তকে চিফ প্রসিকিউটর
কারফিউ ও ইন্টারনেট শাটডাউন ছিল ইনুর ট্রাম্প কার্ড
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ছয়জনকে হত্যাসহ দেশজুড়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্র, উসকানি ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতার মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি এবং ১৪-দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করা হবে আজ।
আজ মঙ্গলবার বেলা দেড়টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন। এর আগে গত ১৪ মে মামলার আইনি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয় এবং ২২ জুন ট্রাইব্যুনাল রায়ের জন্য ৩০ জুন দিন ধার্য করেন। মামলার একমাত্র আসামি হাসানুল হক ইনু বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং রায় ঘোষণার সময় তাকে আদালতে হাজির করা হবে।
ঐতিহাসিক এই রায়কে সামনে রেখে গতকাল সোমবার ‘নয়া দিগন্ত’-কে এক বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। তিনি হাসানুল হক ইনুর অপরাধের ধরন, অডিও রেকর্ড ও তদন্তে প্রাপ্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক উসকানিমূলক অডিওবার্তা নিয়ে ট্রাইব্যুনালের আইনি অবস্থান বিস্তারিত তুলে ধরেন।
সাক্ষাৎকারে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘হাসানুল হক ইনু এ দেশের একজন শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। দেশের ক্রান্তিকালে যেখানে আন্দোলনকারীদের জীবন রক্ষা করা তার রাজনৈতিক দায়িত্ব ছিল, তিনি তা না করে উল্টো তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্র্যাকডাউনের নিষ্ঠুর সব কৌশল বাতলে দিয়েছিলেন। তদন্তে এবং আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় ১৪ তারিখের পর তিনি পরপর দুই দিন শেখ হাসিনাকে নিজে টেলিফোন করেন। তিনি পরামর্শ দেন চলমান ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে বিশ্ববাসীর কাছে ‘জঙ্গি আন্দোলন’ হিসেবে আখ্যা দিতে হবে এবং জামায়াত-বিএনপিকে জঙ্গি সাজিয়ে বহির্বিশ্বে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। তিনি শেখ হাসিনাকে কৌশলগত পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, ‘দেশে কারফিউ জারি করুন, এই কারফিউ হবে আমাদের ট্রাম্প কার্ড।’ ইনুর বাতলে দেয়া সেই ‘ট্রাম্প কার্ডের’ সূত্র ধরেই পরবর্তীতে দেশে কারফিউ জারি করা হয়, সম্পূর্ণ ইন্টারনেট শাটডাউন ও ব্ল্যাকআউট করে দেশজুড়ে ইতিহাসের নিকৃষ্টতম গণহত্যা ও ম্যাসাকার চালানো হয়। এই ব্যাপক মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় একজন শীর্ষ নেতা হিসেবে কোনোভাবেই হাসানুল হক ইনু এড়াতে পারেন না।’
কুষ্টিয়া গণহত্যার বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘শেখ হাসিনার সাথে কথোপকথনের এক পর্যায়ে ইনু নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, কুষ্টিয়ার স্থানীয় এসপির সাথে তার কথা হয়েছে। আমাদের তদন্তে ও সাক্ষ্য-প্রমাণে সুনির্দিষ্টভাবে বেরিয়ে এসেছে যে, হাসানুল হক ইনু কুষ্টিয়াতে স্থানীয় পর্যায়ে বৈঠক করেছেন এবং কুষ্টিয়ার তৎকালীন এসপিকে আন্দোলনকারীদের নামের তালিকা ধরে ধরে ব্যবস্থা নেয়ার ও গুলি করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তার এই প্রত্যক্ষ উসকানি ও নির্দেশনার পরই কুষ্টিয়াতে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।’
আইনি ধারা উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর ধারা ৩(২)(এইচ) এবং ৪(১), ৪(২) অনুযায়ী কোনো শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আদেশ বা ভূমিকার কারণে যদি কোনো গণহত্যা বা ক্যাজুয়ালিটি ঘটে, তবে তার ওপর সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব বা ব্যক্তিগত দায়) বর্তায়। জনাব ইনুর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দায় ও সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির অধীনে আমরা তিনটি সুনির্দিষ্ট চার্জ (অভিযোগ) গঠন করেছিলাম এবং তার সপক্ষে শক্তিশালী সাক্ষী ও অডিও-ভিডিও প্রমাণ উপস্থাপন করেছি। আদালতে যুক্তিতর্কের সময় ইনুর বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবীও স্বীকার করেছেন যে, আন্দোলনকারীদের ‘টেরোরিস্ট’ বা জঙ্গি আখ্যা দিয়ে এই দমন-পীড়নকে তারা জাস্টিফাই (বৈধতা দেয়ার) করার চেষ্টা করেছিলেন। আমরা বিশ্বাস করি, আদালতে তার অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে এবং ট্রাইব্যুনাল তাকে উপযুক্ত ও সর্বোচ্চ শাস্তি দেবেন। আমরা পূর্ণ ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছি।’
মামলার নথি অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালে হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মূলত আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচারকাজ চালানো হয়েছে: ১. ১৮ জুলাই, ২০২৪: ভারতের মুম্বাইভিত্তিক গণমাধ্যম ‘মিরর নাউ’-এ সাক্ষাৎকার দিয়ে আন্দোলনকারীদের ‘জঙ্গি ও সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং বলপ্রয়োগের উসকানি দেয়া। ২. ১৯ জুলাই, ২০২৪: গণভবনে ১৪-দলের সভায় উপস্থিত থেকে দেশব্যাপী সেনা মোতায়েন এবং আন্দোলনকারীদের ‘দেখামাত্র গুলি’ (শুট অন সাইট) করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সরাসরি প্ররোচনা দেয়া। ৩. ২০ জুলাই, ২০২৪: নিজ জেলা কুষ্টিয়ার পুলিশ স্পিকারকে ফোন করে ছবি দেখে আন্দোলনকারীদের তালিকা তৈরি ও কঠোর দমনের নির্দেশ।
৪. সার্বক্ষণিক ষড়যন্ত্র: শেখ হাসিনাকে মারণাস্ত্র ব্যবহার, ছত্রীসেনা নামানো এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে হত্যার পরিকল্পনা ও নীতিগত পরামর্শ প্রদান। ৫. ২৭ জুলাই, ২০২৪: ‘নিউজ টোয়েন্টিফোর’ চ্যানেলে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান এবং কারফিউ ও মারণাস্ত্র ব্যবহারকে কৌশলে সমর্থন। ৬. ২৯ জুলাই, ২০২৪: ১৪-দলের সভায় জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের হত্যাকাণ্ডকে আইনি বৈধতা দেয়ার চেষ্টা। ৭. ৪ আগস্ট, ২০২৪: শেখ হাসিনার সাথে টেলিফোনে কারফিউ ও গুলিবর্ষণের পদক্ষেপের অনুমোদন এবং জাসদ ক্যাডারদের মাঠে নামার নির্দেশ। ৮. ৫ আগস্ট, ২০২৪: শেখ হাসিনা, হাসানুল হক ইনু ও আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবউল আলম হানিফের যৌথ পরিকল্পনায় কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও আওয়ামী ক্যাডারদের গুলিবর্ষণে আশরাফুল, সুরুজ, মুস্তাকিন, উসামা, বাবলু ও ইউসুফসহ ছয়জনকে নির্মমভাবে হত্যা।
সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উসকানিমূলক অডিওবার্তা এবং ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে দেয়া বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘শেখ হাসিনা একজন দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। ট্রাইব্যুনালের রায়ে ইতোমধ্যে তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে এবং তিনি ভারতে পালিয়ে গেছেন। ভারত সরকার একজন সাজাপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক অপরাধীকে তাদের দেশে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। ভারতের কিছু গণমাধ্যম এবং অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা শেখ হাসিনার কিছু ভুয়া বা আসল ভয়েস রেকর্ড এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) দ্বারা তৈরি করে অথবা উসকানিমূলক বক্তব্য আকারে প্রচার করছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। দেশের ভেতরে নতুন করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার জন্য এটি শেখ হাসিনার একটি সস্তা রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি এবং অহেতুক আস্ফালন ছাড়া আর কিছুই নয়। বাংলাদেশের মানুষ এখন ঐক্যবদ্ধ এবং জুলাই বিপ্লবের পর স্বাধীনতার পরিপূর্ণ স্বাদ ভোগ করছে। এই শান্ত পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার ক্ষমতা কারো নেই।’
শেখ হাসিনার ট্রাইব্যুনালের রায়কে চ্যালেঞ্জ করা প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমাদের ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী, রায় ঘোষণার পর থেকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সেই নির্দিষ্ট ৬০ দিন অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। তিনি নির্ধারিত সময়ে আপিল ফাইল করেননি। এখন তিনি পলাতক থেকে রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি করছেন। বর্তমানে তিনি দেশে ফিরে এসে আপিল করতে চাইলে আদালত বা দেশের সর্বোচ্চ সুপ্রিম কোর্ট তা গ্রহণ করবেন কী করবেন না সেটি সম্পূর্ণ সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব এখতিয়ার। আইন অনুযায়ী তার আপিলের সময়সীমা ইতোমধ্যে তামাদি (পার) হয়ে গেছে।’
চিফ প্রসিকিউটর আরো মনে করিয়ে দেন যে, আইনগতভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বর্তমানে নিষিদ্ধ। ফলে পলাতক থেকে দলটির ব্যানারে বা শেখ হাসিনার নামে যে ধরনের উসকানিমূলক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তা দেশের ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’ অনুযায়ী আরেকটি গুরুতর ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যদি শেখ হাসিনার ন্যূনতম সাহস থাকে, তবে তার উচিত মুখে বড় বড় কথা না বলে বাংলাদেশে এসে আইনগতভাবে আদালতের দণ্ড মোকাবেলা করা।